Bartaman Logo
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বামী তুরীয়ানন্দ

স্বামী তুরীয়ানন্দ বহুলোকের সমাগমে প্রতিষ্ঠান-গঠনাদি অপেক্ষা মুষ্টিমেয় লোকের ব্যক্তিগত জীবনগঠনের অধিক পক্ষপাতী। তিনি বলিতেন, “বক্তৃতাবলী জনসাধারণকে আকৃষ্ট করবার জন্য।

স্বামী তুরীয়ানন্দ
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বামী তুরীয়ানন্দ বহুলোকের সমাগমে প্রতিষ্ঠান-গঠনাদি অপেক্ষা মুষ্টিমেয় লোকের ব্যক্তিগত জীবনগঠনের অধিক পক্ষপাতী। তিনি বলিতেন, “বক্তৃতাবলী জনসাধারণকে আকৃষ্ট করবার জন্য। কিন্তু প্রকৃত কাজ হয় কেবলমাত্র ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সংস্পর্শ দ্বারা। উভয়ই আবশ্যক। প্রত্যেকের কর্মধারা পৃথক্‌। আমাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব প্রণালী অনুসরণ করতে হবে। স্বামী অভেদানন্দ বক্তৃতাবলীর দ্বারা বহু লোককে আকৃষ্ট করবেন। কিন্তু সে পথ আমার নহে। আমি স্বামীজীর বিশেষ নির্দ্দেশ পেয়েছি। আমি খুব বক্তৃতাদি দিই এটা স্বামীজী চান না। এখানে পাঠাবার পূর্বে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার মত কি তুমি বক্তৃতাদি দিতে পারবে?’ আমি বলিলাম, ‘নিশ্চয় না, স্বামীজী। আপনি কি বলছেন?’ তিনি বললেন, ‘বেশ। তা’হলে বক্তৃতাদির জন্য ব্যস্ত হয়ো না। তুমি ওখানে আদর্শ সন্ন্যাসীর জীবন যাপন কর। তাদের জীবন্ত উদাহরণ দেখাও। তারা দেখুক, সন্ন্যাসীরা কেমন জীবন যাপন করে।’ সুতরাং দেখ, আমি কেবল স্বামীজীর নির্দেশ পালন করছি।”

Advertisement

কিন্তু স্বামী তুরীয়ানন্দ বক্তৃতা একেবারে এড়াইতে পারেন নাই। স্বামী অভেদানন্দের অনুপস্থিতিতে নিউইয়র্ক বেদান্ত সমিতির সম্পূর্ণ ভার তাঁহার উপর পড়িত। তখন তাঁহাকে বক্তৃতা দিতে হইত। সাধারণতঃ তাঁহার বক্তৃতাবলী সংক্ষিপ্ত অথচ সারবান হইত। বেদান্ত সমিতিতে ক্ষুদ্র শ্রোতৃমণ্ডলীর সমক্ষে তাঁহাকে বক্তৃতা দিতে হইত বলিয়া তিনি স্বীয় প্রণালী অনুসরণ করিতে পারিতেন। প্রথমে তিনি শ্রোতৃবর্গকে কিছুক্ষণ ধ্যান করিতে বলিতেন এবং ধ্যানের পরই তাঁহার প্রবচন আরক্ত হইত। সেইগুলিতে তিনি ধর্মের সাধনার দিকটায় বিশেষভাবে জোর দিতেন এবং মূল বিষয়গুলিকে পুরাণ ও অন্যান্য শাস্ত্র হইতে আখ্যায়িকা বর্ণনা করিয়া উদাহরণ দিয়া বুঝাইতেন।। এইরূপে তাঁহার ভাষণগুলি বেদান্তানুরাগীদের ধর্মজীবনের বিশেষ সহায়ক হইত। বক্তৃতার পর প্রশ্নোত্তরকালে তাঁহার উত্তরগুলি খুব শিক্ষাপ্রদ হইত।
বক্তৃতাদি করিলেও স্বামী তুরীয়ানন্দ অনুরাগী ভক্তগণের আধ্যাত্মিক জীবনগঠনে অধিক মনোযোগ দিতেন। ভাস্কর যেমন খানিকটা কাদা লইয়া সুন্দর মুর্তি গঠন করেন, স্বামী তুরীয়ানন্দ তন্ত্রপ তাঁহার অনুরাগী ছাত্রগণকে লইয়া তাহাদের ধর্মজীবনগঠনে ব্রতী হইলেন। এইরূপে লক্ষ্য স্থির করিয়া তিনি ঐ কর্মে প্রাণ ঢালিয়া দিলেন। ছাত্রছাত্রীগণের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মিশিয়া তাহাদের অজ্ঞাতসারে সকলের দৃষ্টিভঙ্গী বদলাইয়া দিতেন। উদ্দেশ্যের একতানতা, প্রণালীর স্বাভাবিকতা এবং হৃদয়ের একনিষ্টতাই ছিল তাঁহার বিশেষত্ব। তিনি তাহাদের সঙ্গে উচ্চ ধর্মজীবন সহজভাবে যাপন করিয়া যাইতেন এবং তন্মধ্যে নিহিত আধ্যাত্মিকতার অনন্ত প্রস্রবণ অগোচরে প্রবাহিত হইয়া নিকটবর্তী সকলকে দিব্যভাবে অনুপ্রাণিত করিত। তাঁহার ধর্মশিক্ষা স্বাভাবিক ছিল বলিয়া এত সফল, এত অমোঘ হইত। প্রাণহীন, প্রেরণারহিত হইলে ধর্মশিক্ষা কৃত্রিম ও কষ্টকর হয়। কিন্তু স্বামী তুরীয়ানন্দের প্রণালী ছিল প্রাণবন্ত ও প্রেরণাপূর্ণ।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দের ‘স্বামী তুরীয়ানন্দ’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ