শান্তনু দত্তগুপ্ত: আম জনমত পার্টি বলে কোনো দলের নাম শুনেছেন। পড়তে ভুল করবেন না... আম আদমি নয় কিন্তু! আম জনমত পার্টি। সে আপনি না শুনতেই পারেন। কিন্তু পার্টি আছে। পুরোদস্তুর আছে। ঠিক যেমন মাস দুয়েক আগেও এনসিপিআই বলে কোনো দল আছে বলে আপনি জানতেনই না। তাও তো সে ছিল! বিলক্ষণ ছিল। তৃণমূলের বিদ্রোহী এমপিরা সেখানে যাওয়ার পর বাজারে নাম ফেটেছে। ফুলেফেঁপে উঠেছে। আম জনমত পার্টির ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো বিদ্রোহী জমায়েত করেনি। তাদের শিরোনামে আসার কারণ হল, অনুদানের অঙ্ক। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই পার্টি অনুদান বা চাঁদা পেয়েছিল ৬২০ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকার! বিজেপির নিরিখে দেখতে গেলে হয়তো অঙ্কটা কিছুই নয়। কারণ ওই অর্থবর্ষে বিজেপির প্রাপ্তির ঝুলিতে ছিল সব মিলিয়ে ২ হাজার ২৪৩ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ওই অর্থবর্ষে অনুদান পেয়েছিল কত? ২৮১ কোটি টাকা। তাহলে কোন অঙ্কে বা জনপ্রিয়তায় আম জনতা পার্টি ৬২০ কোটি টাকা অনুদান পেল এক বছরে? বিরাট রহস্য বটে। তবে শুধু এই একটি গোত্রহীন দল নয়, এমন আরও পাঁচটি পার্টির নাম পাওয়া যাচ্ছে, যারা ওই অর্থবর্ষে অনুদানের নামে দেদার কামিয়েছে। সত্যবাদী রক্ষক পার্টি নামে তাদের মধ্যে একটি তো ঝুলিতে ভরেছে ৩৩০ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, এর অঙ্কটাও কংগ্রেসের থেকে বেশি। ছ’টি দল মিলিয়ে হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে ১৭০০ কোটি টাকায়। ভারতের প্রথম সারির বহু দল মিলেও ওই অঙ্কে পৌঁছাতে পারেনি। তাহলে এরা পেল কেন?
কয়েকটা ‘ফ্যাক্ট’ বা বাস্তব চিত্র দেখা যাক। প্রথমত, এই ছ’টি দলই গুজরাতের। এর রাজ্য বা তার রাজ্য বলে মিল খুঁজতে যাবেন না যেন। আমি কিন্তু খুঁজিনি। স্রেফ বলেছি, দলগুলির নথিভুক্ত ঠিকানা গুজরাতের। এর মধ্যে চারটি আবার আমেদাবাদের নারোদা এলাকাতেই। মজাদার এবং কাকতালীয় ব্যাপার, তাই না? সবাই স্বীকৃতিহীন রেজিস্টার্ড দল। আর গত দু’টি লোকসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের দলগুলিই দেদার অনুদান পেয়েছিল। বেশিরভাগই ‘কাগুজে’। অস্তিত্ব খুঁজতে বেরলে খাবি খেতে হবে। কিন্তু এরা টাকা পেয়েছে। তারপর তা কোথায় গিয়েছে? খরচ কি হয়েছে? হলে কোথায়? ভোটে তো হতে পারে না। কারণ এই দলগুলির মধ্যে বেশিরভাগই নির্বাচনে প্রার্থী দেয় না। দিলেও খান ১০-১৫। তাতে নিশ্চয়ই ৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়নি! তাহলে কি অন্য কোনো খাতে, বা অন্য কোনো দলের অ্যাকাউন্টে ‘ট্রান্সফার’ হয়ে যায় এই টাকা? প্রশ্নটা তোলা থাক। আর একটা ‘ফ্যাক্ট’ দেখি। আম জনমত পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তথা প্রথম জাতীয় সভাপতির নাম ছিল অনামিকা পাসোয়ান। তিনি দল প্রতিষ্ঠা করলেন, চাঁদা-টাদা পেলেন, তারপর বিজেপিতে চলে গেলেন। আবার বিহার বিজেপির প্রদেশ উপাধ্যক্ষও হলেন। তাহলে আমরা কী বুঝলাম? ওই ৬২০ কোটি টাকা বিজেপির কথা ভেবেই দিয়েছিল ‘দাতা’রা? অনামিকাদেবী অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর বিজেপিতে যাওয়ার সঙ্গে আম জনমত পার্টির বা তাদের টাকা-পয়সা লেনদেনের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও অবশ্য বাজারে গুঞ্জন আছে। থাকবেও। কারণ, আম জনমত পার্টির ‘পারফরম্যান্স’। লোকসভা ভোটে একটিমাত্র আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তারা। সেটাও লোক দেখানো। শাসক দলের সঙ্গে জোট নেই, বিরোধী বলে স্বীকৃতি নেই... তা সত্ত্বেও অনুদান আছে। আর আছে প্রশ্ন, এমন সব কামানেওয়ালা ‘কাগুজে’ দলের ঠিকানা গুজরাতই কেন?
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য হল, কারা এদের চাঁদা দেয়, সেটাই আমরা জানতে পারি না। কিন্তু নজর করার মতো বিষয়, এই দলগুলিকে কেউ ২০ হাজার টাকার কম দেয়নি! গোত্রহীনদের বিনা স্বার্থে খয়রাতি করে যাবে, এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি আমাদের দেশে আছে? বোধহয় না। যে সব কোম্পানিই তাদের শত শত টাকা অ্যাকাউন্ট ভরতি করে দিয়ে থাকুক... স্বার্থ তো কিছু ছিলই। হয় তোষামোদ, না হলে ‘ইনভেস্টমেন্ট’। পরে কিছু ফেরত পাওয়া যাবে। কিংবা হয়তো এজেন্সি অভিযান থেকে বাঁচার ‘ফি’। বেশি খুঁজলেই আবার মুশকিল। এরা আবার সব রাষ্ট্রবাদী দল। যে খোঁচাখুঁচি করবে, তার গায়ে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা সেঁটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই তো ক’দিন আগেই এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিষম গুঁতো দিল পুলিশকে। কারণ তারা ফেক, মনগড়া অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আকৃতি চৌধুরীকে। দুর্গাপুরের মেয়ে। শুধু গ্রেপ্তার করে ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ... চাপিয়েছিল এনএসএ বা জাতীয় সুরক্ষা আইনের ধারা। অর্থাৎ, আকৃতি দেশদ্রোহী। তাঁর বেলায় না হয় ফাঁস হয়েছে প্ল্যান... ধরা পড়েছে, যে উসকানিমূলক মন্তব্যের দায়ে আকৃতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সেই ভাষণ তিনি আদৌ দেননি। বরং ঘটনাস্থলেই ছিলেন না তিনি। পুরো অভিযোগটাই ভুয়ো। কারণ, অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণই পেশ করতে পারেনি পুলিশ। আকৃতির ক্ষেত্রে ঝোলা থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়লেও অবশ্য তাঁর জেলমুক্তি হয়নি। একের পর এক মামলার বিপুল চাপে তিনি অন্ধকার কুঠুরিতেই আটকে। তাহলে আমাদের মতো ‘তৃণসম’ পাবলিকের সঙ্গে কী হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। আজকাল তো আবার রাষ্ট্রবাদী হওয়া সহজ। শুধু জাহির করতে হয়। আর তারা যাদের রাষ্ট্রদ্রোহী বলবে, তাদের উপরই চাপবে দেশবিরোধী আইনের ধারা। তাই শুধু প্রশ্ন করুন। উত্তর খুঁজবেন না। কেমন প্রশ্ন? কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১) কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য কি এই টাকা কাগুজে দলগুলির অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে? ২) ছ’টি মাত্র দল যে ১৭০০ কোটি টাকা পেয়েছিল, তা কোথায় গিয়েছে? ৩) আয়কর দপ্তর বা ইডি এদের ঘরে হানা দেয় না কেন? ৪) নির্বাচন কমিশন এদের নিয়ে কোনো শব্দ খরচ করতে চায় না কেন?
আমাদের দেশে এখন রাজনীতির থেকে কম লগ্নির ভালো ব্যবসা আর নেই। ডিগ্রি লাগে না, সৌজন্যেরও প্রয়োজন হয় না। শুধু খুঁটি ধরতে জানতে হয়, আর সময় মতো পালটি খেতে হয়। দিনের শেষে লোকে ভয়ও পাবে, আবার টাকাও দেবে। শর্ত? সে অবশ্য আছে—বেশি আদর্শবাদী হওয়া চলবে না। তারই ফল সত্যবাদী রক্ষক পার্টি, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টিরা। আমরা দেখব, শুনব, আর হাততালি দেব। কারণ, আমরা আম আদমি। সইফ আলি খানের ভাষায়, দ্য ম্যাঙ্গো পিপল। এইসব দল কেউ ৬০০ কোটি, কেউ ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে বসে থাকবে... আর আমরা হাতড়াব চিনির দাম। আতঙ্কে থাকব। গত মাসের তুলনায় ডালের দাম ১০ টাকা বেড়ে গিয়েছিল।
কাল গিয়ে কী দেখব? যে ওষুধ গত মাসে ৯০ টাকা পাতা কিনেছিলাম, নতুন মাসে সেটাই ১১২ টাকা হয়ে যাবে না তো? দাম বাড়ছে নিত্যপণ্যের।
কিন্তু বেতন বাড়ছে না। পেট্রল মহার্ঘ হচ্ছে, শ্রম নয়। অসুস্থ হতেও এখন ভয় হয়। বুকে ব্যথা
নিয়ে হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে ভরতি হলেই দেড়-দু’লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এভাবেই প্রতিদিন সমাজের মাটিতে মিশে যাচ্ছে। আরও যাবে। রাজনৈতিক দল এবং তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা আরও দূরে সরবে মানুষের থেকে। ‘অজানা উৎস’ থেকে অনুদানের পরিমাণ যত বাড়বে, ততই পাল্লা দেবে অবিশ্বাস। অনাস্থা। দুর্নীতি। রাজনীতির আঙিনায় ফুলেফেঁপে উঠবে অনিয়ম। ভোটের মঞ্চে ধুঁয়াধার নাটক অভিনীত হবে। পাবলিক যাদের ভোট দিয়ে জেতাবে, নির্বাচন শেষে তারা যোগ দেবে অন্য শিবিরে... যাদের সেই ভোটাররা ক্ষমতার কুর্সিতে দেখতেই চাননি। কারণ? টাকা। অনেক অনেক টাকা। সম্পত্তি। যা আছে, তা বাঁচাতে হবে। আর নতুন আরও অনেক অনেক বানাতে হবে। তাই ওই যে শর্ত—আদর্শবাদী হলে চলবে না... সেই গাছেই তেড়েফুঁড়ে সার-জল দিয়ে যাবেন রাজনীতির কুশীলবরা। দুর্নীতি বাড়বে। কিন্তু ধরা পড়বে না। সাধারণ মানুষ তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে... কিন্তু রাষ্ট্র ফিরেও দেখবে না। ‘নব নব আইনের ছলে ন্যায় সৃষ্টি’ করে যাবে তারা। আমরা অপেক্ষা করব। কবে ফিরে আসবে সেই ‘বুরে দিন’।