প্রীতম দাশগুপ্ত: বাজারে গিয়েছি। কেনাকেটার ফাঁকেই একজন অন্যজনকে বলল, দেখেছিস দেশের কী উন্নতি। জিডিপি কত বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, বল তো জিডিপি মানে কী? এবার আমতা আমতা করে প্রথমজন বলল, কী আর হবে, দেশ কীভাবে এগচ্ছে, সেটা বোঝা যাবে। এবার দ্বিতীয়জনের উত্তর, জিডিপি গায়ে দেয় না
মাথায় মাখে সেটাই জানিস না, তাও বলা চাই। কত করে বেগুন কিনলি? কেন ৮০ টাকা। আর
টম্যাটো? ৬০। খুব এগচ্ছে বল দেশ। পকেট ফাঁকা হচ্ছে না? তোর ছেলে তো গ্র্যাজুয়েট। ভালো কাজ পেয়েছে? আবার জিডিপি। পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনা শুনলাম। এটাই আম জনতা। জিডিপি ৭.৮ শতাংশ হল নাকি ২.৬ শতাংশ, সেটা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। তারা দেখে, দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব পড়ল। জিডিপি ৭.৮ শতাংশের জায়গায় ৭৮ শতাংশ হলেও কিছু যায় আসে না।
সম্প্রতি ভারত সরকার দেশের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল থেকে জুন) জিডিপি বৃদ্ধির হার ঘোষণা করেছে। রিজার্ভ ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল, এই সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হবে সাত শতাংশ। সেই প্রত্যাশা ছাপিয়ে গিয়েছে পরিসংখ্যান। বলা হয়েছে, বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ। কিন্তু বিতর্ক শুরু হয়েছে অন্য জায়গায়। মোদি সরকারের প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ দাবি করেছেন, এই তথ্য সঠিক নয়। তাঁর যুক্তি, বিগত অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসের মোট জিডিপি প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে (৮৬ লক্ষ কোটি থেকে ৮০ লক্ষ কোটি)। যদি সেটি না করা হতো, তবে নমিনাল জিডিপির ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার হতো ২.৬ শতাংশ। আর প্রকৃত জিডিপির ক্ষেত্রে তা শূন্য হয়ে যেত। পালটা বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, এটা হল আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা। কারণ দু’টি সিরিজ সম্পূর্ণ আলাদা। প্রশ্ন হল, জিডিপি কী? একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশে কত পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদিত হয়েছে এবং তার আর্থিক মূল্য কত। কিন্তু এর থেকে বোঝা যাবে না, সেই উৎপাদনের সুফল কার হাতে গেল। কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হল। প্রকৃত মজুরি কতটা বাড়ল কিংবা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য আদৌ কাটানো গেল কি না।
আমি অর্থনীতিবিদ নই। তবুও বলতে পারি, মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিলে যে জিডিপি পাওয়া যায়, তাকে রিয়েল বা প্রকৃত জিডিপি বলে। যেমন ধরুন, একটি বছরে জিডিপি ছিল ১০০ কোটি। পরের বছর সেটি হল ১১০ কোটি। তাহলে নমিনাল জিডিপি বাড়বে ১০ শতাংশ। কিন্তু ধরুন এই সময়ে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ হারে। তাহলে প্রকৃত জিডিপি কিন্তু অনেক কমে যাবে। কারণ সেখানে নমিনাল জিডিপিকে মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে ভাগ করতে হবে। ভারতে আবার এটাও বেশ কঠিনভাবে পরিমাপ করা হয়। এখানে মোট উৎপাদনকেও মাথায় রাখা হয়। বেস ইয়ার বা ভিত্তি বছর রাখতে হয়। সেই বছরের নিরিখেই দামের বৃদ্ধি দেখে রিয়েল জিডিপি পরিমাপ করা হয়। ব্যাপারটা বেশ জটিল। অন্তত আম জনতার কাছে তো বটেই। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, এই ডিফ্লেটর খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যবৃদ্ধির হিসাব যদি কম ধরা হয়, তাহলেই তো রিয়েল জিডিপি বেড়ে যাবে। তাঁদের মূল বক্তব্য, জিডিপি সিরিজে ব্যবহৃত মূল্যসূচক কি প্রকৃত অর্থেই বাস্তবকে প্রতিফলিত করছে? সরকার বলছে, কোনো ম্যানুপুলেশন নেই। আমরা ডবল ডিফ্লেটর ব্যবহার করি। মানে ইনপুট ও আউটপুটের আলাদা মূল্য। আর এটা সত্য যে সঙ্গত কারণেই ভিত্তি বছর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সরকারের হিসাবেই এমন কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে যে এই সংখ্যাকে যেমন ভুয়ো বলা যাচ্ছে না, তেমন প্রশ্নাতীত বলে মেনেও নেওয়া যাচ্ছে না। আসলে আমরা মানে আম আদমি ৭.৮ শতাংশ আমাদের জীবনে ‘ফিল’ করতে পারছি না।
তবুও সরকারের দাবি না হয় সত্যি বলে ধরে নিলাম। মোদিজির নেতৃত্বে দেশ বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু দেশের যুব সমাজের কর্মসংস্থান বা আয় কি এতে বাড়ল? গ্রামীণ ভারতের ক্রয়ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হল? আমাদের দেশের বেশিরভাগ এমএসএমই অর্থাৎ ক্ষুদ্র-মাঝারি ও অতি ক্ষুদ্র শিল্পের কি কোনো সুরাহা হল? শ্রমিকদের মজুরি কি বেড়ে গিয়েছে? গিগ শ্রমিকদের কোনো উন্নতি হবে? জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। এটা ঠিক যে, এই জমানায় প্রশ্ন করাটাই অন্যায়। কারণ প্রশ্ন করলেই তুমি রাষ্ট্রদ্রোহী।
তবু সেটাই করেছেন রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। এরপরই পীযূষ গোয়েল কটাক্ষ করে বলেছেন, কোনো কোনো ‘বেকার’ লোক আবার নিজেদের অর্থনীতিবিদ হিসাবে পরিচয় দিতে চায়। রাজনের প্রশ্ন ছিল, অর্থনীতির যদি এতই বাড়বাড়ন্ত, তবে দেশে শিল্প বিনিয়োগের জোয়ার নেই কেন? প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের গতি তো কমই। উলটে শেয়ার বাজার থেকে পোর্টফোলিও লগ্নি কেন তুলে নিচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা? আর তৃতীয় তথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটা তিনি করেছেন, সেটি হল, যুব সমাজের কর্মসংস্থান হচ্ছে কি?
এখানেই আসল সত্য লুকিয়ে আছে। জিডিপি অর্থনীতির একটি ফ্যাক্টর। কিন্তু এটাকেই যদি একমাত্র সাফল্য দেখিয়ে দু’হাত তুলে নাচতে থাকি, তবে সমূহ বিপদ। অক্সফামের রিপোর্ট বলছে, ভারতের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশের বেশি রয়েছে শীর্ষ এক শতাংশের হাতে। আর নীচের দিকে থাকা ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ সম্পদ। এখন জিডিপি বাড়লেই কি ওই ৫০ শতাংশের হাতে বেশি সম্পদ আসবে? উত্তরটা না বললে কমই বলা হবে। কারণ ফারাকটা ক্রমে বাড়ছে।
বাজারের কেনাকেটার ধরন দেখুন। সম্প্রতি একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে, বেশি দামের স্মার্ট ফোন বিক্রি কম-বেশি একই থাকছে। কিন্তু কমছে কম দামের স্মার্ট ফোন বিক্রি। বেশি দামি গাড়ি বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের চাহিদা মোটেও কমেনি। কমেছে মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাটের চাহিদা। এফএমসিজি প্রোডাক্ট কেনা। নীতি আয়োগের একটি রিপোর্ট বলছে, এক দশকে এক লক্ষ সরকারি স্কুল কমেছে। গত ২০ বছরে ২ কোটির বেশি পড়ুয়া হারিয়েছে সরকারি স্কুলগুলি। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ এখন বেশি করে বেসরকারি স্কুলে ঝুঁকছে। আর সেই সুযোগে ওই স্কুলগুলিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ফি। অথচ জিডিপির বৃদ্ধির সুফল আম জনতা পাচ্ছে না। তাই স্কুল ফি দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে। দুন, গুড শেফার্ড কিংবা আম্বানি-সিন্ধিয়াদের স্কুলের কথা বলছি না। বলছি সাধারণ বেসরকারি স্কুলের কথা। দিনের পর দিন বাড়ছে লোন শোধ করতে না পারার প্রবণতা। সবার তো বিশেষ কর্পোরেটের মতো সৌভাগ্য হয় না। আম জনতাকে লোন শোধ করতে ঘটি-বাটি বেচতে হয়। তাই এই শ্রেণির কাছে জিডিপি বাড়লেও কিছু এসে যায় না। এরপর ধরুন বিনিয়োগ। সরকার পরিকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ালেও বেসরকারি বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না। বিনিয়োগ যেটুকু হচ্ছে, তা মূলত নির্দিষ্ট মূলধননিবিড় ক্ষেত্রে, যেমন সেমি কনডাকটর, মোবাইল, ইস্পাত ইত্যাদিতে। নীতি আয়োগের রিপোর্ট বলছে, স্নাতক বেকারের সংখ্যা ১৩ শতাংশ। এরপর তো ধরতে হবে, যারা কাজ পেয়েছেন, তারা কেমন কাজ করছেন? তাদের মজুরি বা বেতন কত? সেটা যে আরও খারাপ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বিশেষজ্ঞদের একাংশ ভারতের এই অগ্রগতিকে ‘জবলেস গ্রোথ’ বলে চিহ্নিত করছেন।
জিডিপির প্রবক্তা সাইমন কুজনেৎস সেই ১৯৩৪ সালেই বলেছিলেন, একটি জাতির আয় বা জিডিপি দিয়ে সেই জাতির সামগ্রিক কল্যাণ পরিমাপ করা যায় না। তাই অনেক দেশই এখন অন্য সূচকে বিশ্বাস করছে। যেমন মানব উন্নয়ন সূচক বা সামাজিক অগ্রগতি সূচক। একটি দেশের উৎপাদন বাড়লেই যে তার নাগরিকরা ভালো আছেন, এমন সরল সিদ্ধান্তে আসা যায় না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, পরিবেশ, নিরাপদ কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা—এসব জিডিপির পরিমাপের বাইরে।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য কীভাবে পরিমাপ করা উচিত? নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে। কিন্তু কোটিপতিরা আরও কতটা ধনী হলেন, এটা দিয়ে কি দেশের অগ্রগতি মাপব? নাকি বলব একজন তরুণ-তরুণী সম্মানজনক কাজ পাচ্ছেন কি না, সেটা অর্থনীতির অগ্রগতির সূচক। কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না এবং দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হচ্ছে সেটা পরিমাপ করা দেশের অগ্রগতি। উৎপাদন কর্মসংস্থানমুখী কি না, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না, সেটা দেখাই বিকাশ। আমরা ‘কে ফ্যাক্টর’ থেকে বেরতে পারছি কি না, সেটাই বিকাশের চূড়ান্ত মাপকাঠি। ‘সবকা বিকাশ’ তো মুখে বললে হবে না। কাজে করে দেখাতে হবে।