Bartaman Logo
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বর্ণশিল্পকে সংকটে ফেলে অর্থনীতি বাঁচবে?

সোনা কিনতে বারণ করছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। একবার নয়, মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে দু’বার

স্বর্ণশিল্পকে সংকটে ফেলে অর্থনীতি বাঁচবে?
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: সোনা কিনতে বারণ করছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। একবার নয়, মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে দু’বার। প্রথমবার মে মাসে, তারপর চলতি মাসের শুরুতে কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেকের মাটি থেকে। বিগত মে মাসেও স্বর্ণশিল্পকে চূড়ান্ত হতাশ করার অব্যবহিত পরেই তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও ইউরোপের একাধিক দেশ সফরে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, অর্থনীতির স্বার্থেই সোনা কেনা কমানো এবং বিদেশযাত্রায় রাশ টানা সময়ের দাবি। ওতে অযথা ডলার খরচ বাড়ে, দুর্বল হয় অর্থনীতির ভিত। আমির লোকেদের বিদেশে গিয়ে বিয়েতেও আপত্তি জানিয়েছেন মোদিজি। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও’ আপ্তবাক্যে আজকালকার নেতানেত্রীরা বিশেষ আমল দেন না। সেই কারণেই পদের গরিমায় এবং আর্ন্তজাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার তাগিদে চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ১৬ বার বিদেশ সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নিঃসন্দেহে বলা যায় চলতি বছরে দেশের রাজনৈতিক কুশীলবদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশিবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁকে সম্মান জানিয়েই সবিনয়ে বলি, মধ্যবিত্ত সোনা কিনলে ডলার খরচের দায়ে ভিলেন। আর আট মাসে প্রায় দেড় ডজন দেশঘুরে রাষ্ট্রনেতা জনগণের নয়নের মণি! রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি এবং অর্থনীতি একসুরে বাঁধা থাকলেও ‘রাষ্ট্রবাদী’ এই দেশে খেলা থেকে রকেট উৎক্ষেপণ, সাহিত্য, সিনেমা সব ব্যাপারেই শেষ কথা বলেন রাজনীতির লোকেরাই। এটাই স্বাধীনতার ৮০ বছরে এদেশের জনগণের অদৃষ্টের অদ্ভুত লিখন!

Advertisement

সোনা কেনায় রাশ টানার কথা বলার আগে প্রধানমন্ত্রী একবার ভেবে দেখেছেন আমাদের দেশে কত মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বর্ণশিল্পের উপর নির্ভরশীল? দেশজুড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এবং এই ক্ষেত্রটি এখনও ষোলোআনাই অসংগঠিত। যদি পরিবারের সদস্যদের ধরি তাহলে সংখ্যাটা সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দেশের যে প্রত্যন্ত গ্রামে একটাও পেট্রল পাম্প নেই, সেখানেও এক বা একাধিক স্বর্ণবিপণি আছে। গ্রামের অন্তত পাঁচ থেকে দশটা পরিবার কোনো না কোনোভাবে স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে জড়িত। বিয়ে পার্বণে, আনন্দ অনুষ্ঠানে মানুষ সেখানে ভিড় জমায়। তাই বেচাকেনা কমে স্বর্ণশিল্প ধাক্কা খেলে সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থাটাই ধাক্কা খেতে বাধ্য। তার প্রভাব শুধু অর্থনীতির পক্ষেই ভয়ংকর হবে না, মন্দার আঁচ সাধারণ মানুষের উপরও পড়তে বাধ্য। নিত্যপণ্যের বাজারে তার কম্পন সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে সহজ হবে না। এমনিতেই রুপো ও সোনার দাম আকাশছোঁয়া। হলুদ ধাতুর দশ গ্রামের দাম দেড় লক্ষের আশপাশে ওঠানামা করছে। ছোটো দোকানে কাজ কমছে। এর উপর মোদিজির কথায় যদি ব্যবসা থমকে যায় তার দায় নেবে কে? প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ একটাই, স্বর্ণশিল্প নিয়ে সরকারের অত্যন্ত সংযতভাবেই কথা বলা উচিত। অন্যথায় সংকটে পড়বে অর্থনীতিই।
মোরারজি দেশাই দেশের অর্থমন্ত্রী হয়েই বিতর্কিত ‘গোল্ড কন্ট্রোল’ আইন কার্যকর করেছিলেন। ২৪ আগস্ট ১৯৬৮ সালের কথা। আজ থেকে ৫৮ বছর আগে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবে প্রথম দশক কেটেছে। সেদিন দশ গ্রাম সোনার দাম ছিল ১৭৬ টাকা। মোরারজি দেশাইয়ের আনা নয়া আইনের পরিণাম অর্থনীতির পক্ষে মোটেই সেদিন সুখকর হয়নি। সরাসরি স্বর্ণশিল্পের উপর নির্ভরশীল পরিবারের সঙ্গেই অন্ধকার নেমে এসেছিল অর্থনীতিতেও। নতুন করে আজ তার পুনরাবৃত্তি আমরা কেউ চাই না। এটা ঠিক পেট্রলিয়াম ও সোনা আমদানিতেই আমাদের সর্বাধিক বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়। ডলারের দাম যত বাড়ছে এই খরচও পাল্লা দিয়ে বাড়তে বাধ্য। পাল্লা দিয়ে কমবে বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডারে জমা তহবিলও। বাকি রইল যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণ। এই তিনটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের উপর চাপ কমবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। একটা পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, তিন বছর আগে যেখানে ৩৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা আমদানি হতো, চলতি ২৬ সালে তা বেড়ে ৭৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধিটাকে অস্বীকার করলে জিডিপি’র বৃদ্ধিও তো অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পেট্রপণ্যের আমদানির খরচ? চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে লাফিয়ে বেড়েছে। বজ্রআঁটুনি সত্ত্বেও বেড়ে গিয়েছে প্রায় ৫৬-৫৭ শতাংশ। তাহলে স্বর্ণশিল্পের উপর আলাদা করে আঘাত নামিয়ে আনা কেন? এই মুহূর্তে তথ্য ও প্রযুক্তি শিল্পেও যুক্ত আছে ৫৮ লক্ষ ছেলেমেয়ে। কিন্তু পার্থক্য এটাই, বিশেষ প্রযুক্তি ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ঘরের অপেক্ষাকৃত কম লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা স্বর্ণশিল্পে কাজ শিখে স্বনির্ভর হয়। মাথা উঁচু করে বাঁচে। এখনও স্বর্ণশিল্প কম বিনিয়োগে বেশি মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা করে। এটাও মাথায় রাখা জরুরি।
গত এক সপ্তাহ ধরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে একটা মাত্র সরল সংখ্যা। ৭.৮। ওই একটা সরল সংখ্যায় তো আমার আপনার পেট ভরবে না, বেকারের চাকরি হবে না, বাজারে নিত্য পণ্যের দামও কমবে না। ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের সুদ বাড়বে না, কমবেও না। রুগ্ন সংস্থা চাঙ্গা হওয়ারও বিশেষ আশাও নেই। রাস্তাঘাট, সড়ক, ব্যবসা, বাণিজ্য, বিক্রিবাটা কমা বাড়ারও সম্পর্ক নেই। তাহলে ওই একটা সংখ্যা নিয়ে মিছিমিছি ছায়াযুদ্ধ কেন? আমরা সাধারণ মানুষ জিডিপি বুঝি না। পণ্ডিতে বলে ওটা নাকি বৃদ্ধির হার। আমাদের দেহে যেমন সুগার কোলেস্টেরল কিডনির অবস্থা দেখে ডাক্তাররা সুস্থ অসুস্থ ঠিক করেন তেমনি জিডিপি বৃদ্ধির হারের ওই একটা সংখ্যা দিয়ে দেশের অর্থনীতি কতটা সচল, বৃদ্ধি হচ্ছে না সংকুচিত হচ্ছে তার ইঙ্গিত মেলে। সেই হিসাবে ৭.৮ যথেষ্ট ইতিবাচক বৃদ্ধির হার বলতেই হবে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্নগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব। পালটা যাঁরা তোপ দেগেছেন তাঁরা যে সে লোক নন। একজন প্রাক্তন অর্থসচিব এবং মোদিজির প্রাক্তন আর্থিক উপদেষ্টা সুভাষ গর্গ এবং রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। এঁদের কারোকেই হেলাফেলা করা যায় না। গর্গের আরও গুরুতর অভিযোগ, বর্তমান মূল্যে (কারেন্ট প্রাইস) প্রকৃত বৃদ্ধি সর্বাধিক ২.৬ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বাদ দিলে বাস্তব বৃদ্ধি প্রায় শূন্য! সরকার বলছে, আগের ও বর্তমান হিসাবের ভিত্তিবর্ষ এবং পদ্ধতি এক নয়, নতুন হিসাবের কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সরাসরি এমন তুলনা নাকি বিভ্রান্তিকর। এই যুক্তি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি: কোন পদ্ধতিতে অঙ্ক তৈরি হল? পুরানো প্রথা সংশোধন করা হল কীভাবে? মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ গেল কোন জাদুতে? নাকি পুরোটাই ম্যানিপুলেশন। প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রশ্নগুলি আরও মৌলিক: অর্থনীতি যদি এতই শক্তিশালী, তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ছবিটা উজ্জ্বল নয় কেন? শিল্প বিনিয়োগের জোয়ার কোথায়? বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের গতি নিয়েই বা এত উৎকণ্ঠা কেন? এসব তো বিরোধী পক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ তো অর্থনীতির স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক পরীক্ষার ফল। ওই যে বললাম একটা সংখ্যার জাদুতে গরিবের ঘরে আলো জ্বলতে পারে না। হাতে কাজ, পাতে ভাত, আর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে না পারলে বৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের দ্যুতিও শুধু মুখের কথায় ছড়িয়ে পড়তে পারে না। জিডিপির পরিসংখ্যানে স্বর্ণশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সত্যটা ভুললে চলবে না। যে অর্থনীতি সাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির বদলে শুধুই পরিসংখ্যানের ভারে মানুষকে সম্মোহিত করতে চায় তার পরিণাম ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের পক্ষে ভালো হতে পারে না। ক্ষণিক চমক বনাম দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের এই লড়াই কোনোদিন থামার নয়। জিডিপি নিয়ে উৎসব করার আগে যে প্রশ্নগুলি সামনে আসা উচিত: এই বৃদ্ধি কার নিরিখে? মানুষের আয় কতটা বেড়েছে? কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ছবিটাই বা বাস্তবে ঠিক কেমন?
আপনার পরিসংখ্যান যতই অর্থনীতির সমৃদ্ধির সুখচিত্র তুলে ধরুক, মানুষ বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে না পারলে উচ্ছ্বসিত হতে পারবেন না। সব শাসকেরই এই সারসত্যটা মনে রেখেই সামনের দিকে এগনো উচিত। স্বর্ণশিল্পকে আঘাত করলে অর্থনীতি, রাজনীতি কোনোটাই বাঁচবে না। সরকারের উচিত এই শিল্পের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ