তন্ময় মল্লিক: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্যের চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের আরও ন’মাস বেতন
তন্ময় মল্লিক: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্যের চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের আরও ন’মাস বেতন
নিশ্চিত হয়েছে। ২০২৭ সালের মে মাস পর্যন্ত তাঁরা কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। অনেকে বলছেন, এই নির্দেশে চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? যাঁরা পুজোর আগেই পাকা চাকরির আশায় দিন গুনছিলেন তাঁরা কি আশাহত হলেন না? নিয়োগের সুপারিশপত্র হাতে পেয়েও চাকরিতে যাঁরা যোগ দিতে পারলেন না, এই রায় কি তাঁদের স্বস্তি দিল? এই রায়ে যদি কেউ স্বস্তি পেয়ে থাকে তাহলে রাজ্য সরকার। কারণ অতিরিক্ত ১৭/১৮ হাজার শিক্ষকের বেতন আপাতত গুনতে হবে না।
বাংলায় মাত্র দু’ বছরে বিজেপির ভোট প্রচুর বেড়েছে। ছাব্বিশের নির্বাচনে বিজেপি ভোট পেয়েছে প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে কত শতাংশ ভোট হিন্দু এবং কত মুসলিম, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু, এবার যে ছাত্র-যুবদের একটা বড়ো অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, তাতে কোনো সংশয় নেই। হিন্দুত্বের টান নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতাই বিজেপির দিকে যুবকদের ঠেলে দিয়েছে।
সামাজিক প্রকল্পের জোরে তৃণমূল একের পর এক নির্বাচন জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু বেকারদের থেকে তারা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল। সেই কারণেই ভোটে শহরাঞ্চলে নাস্তানাবুদ হচ্ছিল তৃণমূল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শহরাঞ্চলে পিছিয়ে পড়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিল। তারজন্য বহু পুরসভার চেয়ারম্যান ও টাউন সভাপতিকে সরিয়ে দিয়েছিল। সেটা ছিল তৃণমূলের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। তাতে বাইরে থেকে মাছ দেখা না গেলেও আঁশটে কটু গন্ধটা দিন দিন তীব্র হচ্ছিল।
নিয়োগ দুর্নীতির জেরে রাজ্যের ২৬ হাজার
শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি চলে যাওয়ায় তৃণমূল
সরকার চরম বিপাকে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ এবং সময় তারা পেয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষকদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। বেকারদের আস্থা ফেরাতে সরকার আরও ৯ হাজার নতুন পদ তৈরি করেছিল। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুও করেছিল।
প্রথম দিকে নিয়োগের বিষয়টি মমতা সরকার সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। হয়তো ভেবেছিল, সামাজিক প্রকল্পের জোরেই হবে কিস্তিমাত। কিন্তু চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের আন্দোলন দানা বাঁধতেই নড়েচড়ে বসেছিল সরকার। চাকরিহারাদের ক্ষোভ দূর করতে তাঁদের অভিজ্ঞতার জন্য অতিরিক্ত ১০ নম্বর
দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোয় অনেকটা সময় নষ্ট হয়। সেই পরিস্থিতিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য ঝাঁপিয়ে না পড়ে আরও
ছ’ মাস সময় চেয়েছিল। তাতেই চাকরি প্রার্থীদের মনে একই সঙ্গে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস জন্ম নেয়। তাঁরা মনে করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ফের ক্ষমতায় ফিরলে এভাবেই সময় নিতে থাকবে। বেকাররা চাকরি পাবে না। তাই ভালো বা মন্দ হোক সরকারটা পালটানো দরকার।
পরিস্থিতির পুরো ফায়দা তোলে বিজেপি। তারা মমতার সমালোচনার পাশাপাশি মানুষকে আশ্বস্ত করেছিল, বাংলায় বিজেপি সরকার গড়লে জট কাটিয়ে দ্রুত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ হবে। তারজন্য সময় বেঁধে দিয়েছিল। চাকরির আশায়
চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা বেকারদের কাছে বিজেপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিতেই তাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। যাঁরা সেদিন আস্থা রেখেছিলেন এখন তাঁদের অনেকেই এখন বেসুরো। তাঁদের মতে, দুই সরকার একই মুদ্রার দু’টি পিঠ।
একথা ঠিক, মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে
কোনো সরকার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তাদের আরও কিছুটা সময় দিতে হবে। তবে, সরকারি পদক্ষেপের জেরে সরকার ও প্রশাসন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটা ধারণা তৈরি হয়। সেই অনুমান ভুল বা ঠিক হতে পারে। সরকার পঞ্চায়েত, পুলিশ, পুরসভা সহ বিভিন্ন দপ্তরে লক্ষাধিক নিয়োগের কথা ঘোষণা করায় বেকারদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে ঠিকই। কিন্তু, আশ্বাস ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক দূর না হওয়া পর্যন্ত সরকার সম্পর্কে ধারণা বদলাবে না।
শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নতুন সরকারের কাছে যে তৎপরতা চাকরি প্রার্থীরা আশা করেছিলেন, তা এখনও পাননি। নির্বাচন মিটলেই থমকে থাকা
শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হবে, এমনটাই আশা করেছিলেন তাঁরা। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে যা হল তা তীরে এসে তরি ডোবার শামিল। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য প্রায়
১২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। তারজন্য ইন্টারভিউ, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশনের কাজ শেষ। প্রায় চার হাজার চাকরিপ্রার্থী স্কুলে যোগ দেওয়ার সুপারিশপত্রও পেয়েছেন। বাকিরা নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্য দিন গোনার মধ্যেই ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে রাজ্য সরকারের নয়া সিদ্ধান্তে নিয়োগ নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিজেপি সরকার ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করেছে। বাম আমলে ৭ শতাংশই ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘুদের মন পেতে ওবিসি সংরক্ষণের কোটা বাড়িয়ে ১৭ শতাংশ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সিদ্ধান্তে বহু সংখ্যালঘু চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগ আটকে যাবে। কিন্তু, জেনারেল ক্যাটাগরির ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবেন। ওবিসির জন্য সংরক্ষিত ১০ শতাংশ আসন জেনারেল ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেক্ষেত্রে জেনারেল ক্যাটাগরির আসন সংখ্যা বাড়বে। তাই জেনারেলে ‘কাট অফ’ মার্কসও নামবে। সেক্ষেত্রে অল্প নম্বরের জন্য যাঁরা ইন্টারভিউয়ে ডাক পাননি, তাঁরা সরকারের এই সিদ্ধান্তে নতুন করে আশা দেখছেন। ফলে জেনারেল ক্যাটাগরির ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
নবম ও দশম শ্রেণির জন্য শূন্য পদের সংখ্যা
প্রায় ২৩ হাজার। তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন হয়ে গিয়েছে। ইন্টারভিউ হয়নি।
লিখিত পরীক্ষায় সফল হাজার হাজার প্রার্থী
ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন
তাতে ভাটা পড়েছে। ফের নতুন করে সফলদের তালিকা তৈরি হবে। সেই তালিকায় যেমন নতুন নতুন নাম যুক্ত হবে, তেমনই অনেকের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে নতুন করে জটিলতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির ভয় থেকেই যাচ্ছে। এছাড়া একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য যাঁরা সুপারিশপত্র হাতে পেয়ে গিয়েছেন বা চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদেরও অনেকে বাদ যেতে পারেন। কেউ বাদ
গেলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
সেক্ষেত্রে তৈরি হতে পারে আইনি জটিলতা। তাই চাকরিহারাদের এক্সটেনশন নয়, দরকার নিয়োগ প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি।
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে অধিকাংশ নিয়োগ প্রক্রিয়াই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। শুনানি পর্বে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছিল যাতে সাধারণ মানুষ মনে করছিল, চাকরি প্রার্থীদের আদালতে যাওয়ার পথ খোলা রাখতেই ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলগুলো করা হয়েছিল। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। কারণ স্থায়ী পদে নিয়োগ পিছিয়ে গেলে লাভ সরকারেরই। বেতন বাবদ বিপুল টাকা সরকারের বেঁচে যাবে। তাই সরকার চাইছে, আদালতে মামলা হোক এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাক। তৃণমূল সরকার সম্পর্কে এমন একটা ধারণা বেকারদের মনে গেঁথে গিয়েছিল।
বিজেপি সরকারকে এব্যাপারে প্রথম থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। ওবিসি সংরক্ষণ ৭ শতাংশ করে দেওয়ায় শুভেন্দু অধিকারীর সরকারকে যতজন সমালোচনা করেছেন, তারচেয়ে অনেক বেশিজন প্রশংসা করেছেন। অনেকেই মনে করেন, ভাতা যেমন বেকারের জীবন পরিবর্তন করতে পারে না, সংরক্ষণও সামগ্রিক উন্নয়নের সহায়ক হতে পারে না। তাই জাতি, বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ বন্ধ হোক। সুবিধা দেওয়া হোক আর্থিকভাবে দুর্বলদের। চাকরি ও ডাক্তারির মতো প্রবেশিকা পরীক্ষায় বিচার্য হোক মেধা। এই বাংলার বিজেপি সরকার সংরক্ষণের পরিমাণ কমিয়ে পরোক্ষে সেই মতকেই সমর্থন করেছে। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই খুশি। তবে, ওবিসি সংরক্ষণের বিষয়টি যেন নিয়োগ আটকানোর হাতিয়ার না হয়। সেটা হলেই নতুন সরকারের দিকেও ধেয়ে আসবে পুরানো প্রবাদ, ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ।’