Bartaman Logo
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাগুজে উন্নয়নের স্বাদ

ভারতের অর্থনীতি নিয়ে দুদিন যাবৎ যে উচ্ছ্বাসের ঢাক পেটানো হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন—৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি সত্যিই কি অর্থনীতির শক্তির প্রতিচ্ছবি, নাকি পরিসংখ্যানের সৌন্দর্য?

কাগুজে উন্নয়নের স্বাদ
  • ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতের অর্থনীতি নিয়ে দুদিন যাবৎ যে উচ্ছ্বাসের ঢাক পেটানো হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন—৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি সত্যিই কি অর্থনীতির শক্তির প্রতিচ্ছবি, নাকি পরিসংখ্যানের সৌন্দর্য? প্রশ্নটি বিরোধীরা তুললেও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হল, প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন মোদি সরকারেরই প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রথমে ৭.৮ শতাংশ বলা হলেও পরে সংশোধন করে তা ৬.৯ শতাংশ করা হয়েছিল। একইভাবে, ওই ত্রৈমাসিকের মোট জিডিপি প্রথমে ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা দেখানো হলেও পরে তা নেমে আসে ৮০ লক্ষ কোটিতে। তাহলে এবারের ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির ভিত্তি যদি আগের বছরের সংশোধিত অঙ্ক হয়, তবে সাফল্যের এই বিপুল আতশবাজির ভিতটি কতটা মজবুত? গর্গের আরও গুরুতর অভিযোগ, কারেন্ট প্রাইসে প্রকৃত বৃদ্ধি সর্বাধিক ২.৬ শতাংশ এবং মূল্যস্তরের প্রভাব বাদ দিলে বাস্তব বৃদ্ধি প্রায় শূন্য! অর্থাৎ যে অর্থনীতির দৌড়ঝাঁপ কাগজের মসৃণ উপরিভাগে, চড়াই-উতরাই বাজারে-সংসারে সেই দৌড়ের পদশব্দ কোথায়? অবশ্যই এখানে একটি জরুরি সতর্কতা প্রয়োজন। সরকার বলছে, আগের ও বর্তমান হিসাবের ভিত্তিবর্ষ এবং পদ্ধতি এক নয়, নতুন জাতীয় হিসাবের কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সরাসরি তুলনা বিভ্রান্তিকর। এই যুক্তি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি: কোন পদ্ধতিতে অঙ্ক তৈরি হল? পুরানো সিরিজ সংশোধন করা হল কীভাবে? মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ গেল কোন জাদুতে? এছাড়া সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গেই-বা সেই অঙ্কের সম্পর্ক কোথায়! এই সংগত প্রশ্ন ও সংশয়গুলি দূর করার জন্য সরকার বাহাদুরের তরফে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রদান জরুরি।

Advertisement

সমস্যা হল, পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়া কিংবা জবাবে গ্রাহ্য তথ্যাদি বিশেষ মেলে না, উলটে জোটে প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য নিয়ে পালটা কিছু প্রশ্ন, যার বেশিরভাগই অবান্তর। গর্গের বিশ্লেষণকে ‘ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি’ বলেছে বিজেপি। স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল অভিযোগ তুলেছেন যে, বিরোধীরা নাকি টিভিতে বসে ‘বাজার গরম’ করতে নেমেছেন! আর এখানেই ভুল করছে সরকার। তারা ভুলে যাচ্ছে, অর্থনীতির পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক বাক্যবাণে প্রতিহত করা অসম্ভব হলে অধিক সন্দেহ ঘনীভূত হয়। রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রশ্নগুলি আরও মৌলিক: অর্থনীতি যদি এতই শক্তিশালী, তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ছবিটা উজ্জ্বল নয় কেন? শিল্প বিনিয়োগের জোয়ার কোথায়? বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) ফ্লো নিয়ে এত উৎকণ্ঠা কেন? এসব তো বিরোধী পক্ষের মতলবি প্রশ্ন নয়, অর্থনীতির স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক পরীক্ষার বিষয়। জিডিপি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু তা মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তির এক ও অদ্বিতীয় মাপকাঠি নয়। একটি দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে আয়বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে পারে। জিডিপি বৃদ্ধির বিপরীতে পরিবারের হাতে খরচ করার মতো টাকা কমতে পারে। তাই শহুরে মধ্যবিত্তের ভোগব্যয়, গ্রাম-ভারতের চাহিদা, ছোটো ব্যবসার লেনদেন, কর্মসংস্থান, মজুরি, বিনিয়োগ, টাকার ক্রয়ক্ষমতা প্রভৃতি সব কিছুকেই পাশাপাশি রেখে অর্থনীতির ছবি বিচার করা দরকার। শুধু একটি উজ্জ্বল শতাংশ তুলে ধরে ‘সব ভালো’ ঘোষণা করে দেওয়াটা সস্তা রাজনৈতিক প্রচার, তাতে অর্থনৈতিক বাস্তবতা যার পর নাই অনুপস্থিত যে!
সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে যদি সরকার পরিসংখ্যানকে সাফল্যের বিজ্ঞাপন বানিয়ে ফেলতে চায়। কারণ সংখ্যার সৌন্দর্য দিয়ে বাস্তবের অস্বস্তি, নির্মমতা প্রভৃতি সাময়িকভাবেই ঢাকা সম্ভব, দীর্ঘমেয়াদে নয়। ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির অহংকার দেখিয়ে বেকার যুবককে চাকরি দেওয়া যায় না, মূল্যবৃদ্ধিতে পীড়িত পরিবারের খালি থলে ভরে দেওয়া সম্ভব নয় জিডিপির গ্রাফ দেখিয়ে, সর্বোপরি হাজারো জোরালো স্লোগানও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কাটাতে অপারগ। সরকারের কাছে তাই বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগের জবাব দেওয়া নয়, আশু কর্তব্য হল, পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্নিশ্চিত করা। কোন সংখ্যা কেন বদলাল, কীসের ভিত্তিতে বদলাল, তার প্রভাব কী প্রভৃতি যাবতীয় তথ্য প্রকাশ্যে এনে স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। গর্গের হিসাব শেষপর্যন্ত সঠিক নাও হতে পারে, সরকারের নতুন পদ্ধতিই হয়তো পরিসংখ্যানগতভাবে অধিক যথার্থ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে হবে যুক্তি ও স্বচ্ছতা দিয়ে, আত্মপ্রশংসায় ভরিয়ে নয়। গণতন্ত্রে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞাপন সরকারি প্রচার নয়, নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন। তাই জিডিপির ৭.৮ শতাংশ নিয়ে উৎসব করার আগে প্রশ্নগুলি হওয়া উচিত: এই বৃদ্ধি কার? মানুষের আয় কতটা বেড়েছে? কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ছবিটি কেমন? বাজারে চাহিদা কি ফিরেছে? উত্তরগুলি অস্পষ্ট হলে কাগুজে অঙ্ক ভীষণ উজ্জ্বল হওয়ার পরেও অর্থনীতির ভিতরের অন্ধকার নিকষ কালোই দেখাবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ