মৃণালকান্তি দাস: পশ্চিম এশিয়ায় আছে তেল আর চীনের আছে রেয়ার-আর্থ! ১৯৯২ সালে ইনার মঙ্গোলিয়ার বাওতু শহরে একটি বড়ো খনিজ এলাকা দেখতে গিয়ে এমনই মন্তব্য করেছিলেন চীনের নেতা দেং জিয়াওপিং। তখন এই কথার গুরুত্বই বুঝতে পারেনি বাকি দুনিয়া। দেং যখন ওই ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, আমেরিকা তখন সবে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ করেছে। বেজিংয়ের দৃষ্টিতে, সেই মার্কিন অভিযান একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছিল, আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনায় চীনের দুর্বলতা কোথায় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে সংঘাতের কারণ হতে পারে। চীনের শাসকগোষ্ঠী এবং কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করেছিল সেই সময় থেকেই।
‘রেয়ার-আর্থ’ শব্দের বাংলা অর্থ বিরল ধাতু। কিন্তু নাম রেয়ার হলেও রেয়ার-আর্থ খুব বিরল নয়। তবু রেয়ার বলা হয়, কারণ, এগুলি সাধারণত আলাদা ও বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় না। রেয়ার-আর্থ বলতে আসলে পর্যায় সারণির মাঝখানে থাকা ১৭টি বিশেষ ধাতুকে বোঝায়। এই ধাতুগুলি অন্য খনিজের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে থাকে। ফলে এগুলি আলাদা করা কঠিন, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই জটিলতাই এগুলিকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এগুলি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য উপাদান। মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টারবাইন, সামরিক ড্রোন, উন্নত যুদ্ধবিমান ও রাডার ব্যবস্থা সবই এই ধাতুর উপর নির্ভরশীল।
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইনার মঙ্গোলিয়ার ‘বায়ান ওবো’ খনি চীনের রেয়ার-আর্থ শিল্পের মূল কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত, যা এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সঞ্চয়ক্ষেত্র। ১৯৬০-এর দশকে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জিয়াংশি ও গুয়াংডং প্রদেশে নতুন নতুন খনির সন্ধান মেলে, যা পরে হেভি রেয়ার-আর্থ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে রসায়নবিদ জু গুয়াংশিয়ান কম খরচে রেয়ার–আর্থ পৃথক করার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এরপরই চীন বড়ো মাপের উৎপাদন শুরু করে। চীনা নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, রেয়ার–আর্থ এমন এক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা কোনোভাবেই অপচয় করা যাবে না। ১৯৮২ সালের শুরুতেই দেং জিয়াওপিং এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ফাং ই নির্দেশ দেন ‘রেয়ার–আর্থ ও অন্যান্য দুর্লভ ধাতুর উৎপাদন বাড়াতে হবে।’ তবে আশির দশকজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো। ১৯৮৬ সালের মধ্যে চীনের উৎপাদন ১৯৭৮ সালের তুলনায় ১০ গুণ বেড়ে যায় এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে আমেরিকাকে পিছনে ফেলে চীন বিশ্বের বৃহত্তম রেয়ার–আর্থ উৎপাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আমেরিকা ও ইউরোপ চীনের এই উত্থানকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছিল। আসলে আমেরিকা ও পশ্চিমের দেশগুলি পরিবেশদূষণ ও ঝুঁকির কারণে ‘রেয়ার-আর্থ’ খোঁজার কঠিন কাজ এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। সেই জায়গায় প্রবেশ করেছে চীন। আশির দশক পর্যন্ত আমেরিকাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো রেয়ার-আর্থ উৎপাদক। পরে পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম কঠোর হওয়ায় এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমেরিকা ধীরে ধীরে উৎপাদন চীনে সরিয়ে নেয়। আমেরিকা সরে দাঁড়াতেই চীন সেই সুযোগ কাজে লাগায়। পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নিয়ে তারা এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ায়। ধীরে ধীরে তারা এই ধাতু উত্তোলন ও পরিশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষ হয়ে ওঠে। আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো রেয়ার-আর্থ মজুত রয়েছে চীনের হাতে। একই সঙ্গে বিশ্বে যত রেয়ার-আর্থ উত্তোলন হয়, তার বড়ো অংশ পরিশোধনের বেশিরভাগ এবং প্রায় পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা চীনের নিয়ন্ত্রণেই। শুরুতে লাভ না হলেও চীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পে অর্থ ঢেলেছে। এর ফলে তারা এখন সম্পূর্ণ নিজস্ব ও শক্তিশালী শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
চীন অবশ্য প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেয়নি, তারা ‘রেয়ার-আর্থ’ নিয়ে গোটা দুনিয়ায় আধিপত্য চালাবে। ২০১০ সালে সেনকাকু (চীনে ডিয়াওয়ু নামে পরিচিত) দ্বীপপুঞ্জকেন্দ্রিক বিতর্কিত ঘটনার সময় চীন ও জাপানের মধ্যে উত্তেজনার পর জাপানে রেয়ার–আর্থ রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালের সেই সংকটের পর থেকেই বেজিং বুঝতে পারে, রেয়ার–আর্থকে অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব। আর এই অস্ত্র কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তা চীন শিখেছে আমেরিকার জারি করা নিষেধাজ্ঞা দেখেই।
তবে শুরু থেকেই বেজিং ছিল সতর্ক। স্টেট প্ল্যানিং কমিশনের রেয়ার–আর্থ অফিসের প্রাক্তন প্রধান হং ফেং রেয়ার–আর্থকে ‘রাজনৈতিক ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রাকৃতিক গ্যাসকে রাশিয়ার বারবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কীভাবে এমন আচরণ ভুক্তভোগী দেশগুলিকে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা র্যান্ডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানিয়েছে, ২০১০-এর দশকে বেজিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আগে শিল্পের স্থিতিশীলতা আনা।’ যার ফলে রেয়ার–আর্থের বিষয়টি মার্কিন-চীন সম্পর্কের আড়ালে চলে যায়।
সেটি আবার সামনে আসে গত দশকের শেষভাগে, যখন ওয়াশিংটন চীনের উপর চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। চীনের বেসরকারি ক্ষেত্রের উপর জি জিনপিংয়ের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিরোধে কঠোর আচরণ আমেরিকার সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘হুয়াওয়ে’-কে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। হুয়াওয়ের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বেজিংয়ের জন্য ছিল বিরাট ধাক্কা। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তখন রেয়ার–আর্থ আটকে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও বেজিং তাড়াহুড়ো করেনি। এর পরিবর্তে তারা আমেরিকার রিপাবলিকান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির সয়াবিন ও জ্বালানি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করে। আসলে হুয়াওয়ে ঘটনাটি চীনের একটি বড়ো দুর্বলতা উন্মোচিত করে দিয়েছিল— উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের জন্য তারা তখনও বিদেশের উপর নির্ভরশীল। তাই বেজিং বুঝতে পেরেছিল, সময়ের আগে রেয়ার–আর্থের ঘুঁটি চাললে তা উলটে তাদের দিকেই ঘুরে আসতে পারে।
বেজিং সব দিক থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ২০২০ সালের মে মাসে বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমাতে তারা ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ কৌশল গ্রহণ করে। যার মূল লক্ষ্য ছিল সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলা। ২০২০ সালের শেষের দিকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে বিদেশের বাজারে পণ্য সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়। আর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ‘চীন রেয়ার-আর্থ গ্রুপ’ গঠন করা হয়, যার পুরো নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় ‘স্টেট কাউন্সিল’-এর হাতে। কিন্তু ওয়াশিংটন যখন চীনা চিপশিল্পকে ধ্বংস করতে বিশ্বজুড়ে সর্বাধুনিক চিপ ও চিপ তৈরির যন্ত্রাংশ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তখনই চীন প্রতিক্রিয়া হিসাবে খনিজ রপ্তানিতে হাত দেয়। যদিও তখনও তার রেশ ছিল সীমিত।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিলে আমেরিকা বিষয়টির গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে শুরু করে। আমেরিকা চীনা পণ্যের উপর খুব বেশি শুল্ক বসালে চীন পালটা জবাবে কিছু রেয়ার-আর্থ ও বিশেষ চুম্বকের রপ্তানি সীমিত করে। এই ধাতুগুলি আমেরিকায় চীনের মোট রপ্তানির খুব সামান্য অংশ হলেও আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে। তাই এই সিদ্ধান্তে আমেরিকার বড়ো ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। এখন রেয়ার-আর্থ চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী দর-কষাকষির অস্ত্র। আমেরিকা যখন প্রযুক্তি বা চিপ নিয়ে চাপ দেয়, চীন তখন রেয়ার- আর্থকে চাপ সৃষ্টির পালটা উপায় হিসাবে ব্যবহার করে। এই বিরল ধাতুই এখন বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে গভীর দুশ্চিন্তা এবং বিকল্প উৎস খোঁজার এক উন্মাদ প্রতিযোগিতা।
তবে চীনের এই আধিপত্যেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা অজানা নয় মার্কিন কৌশলবিদদের। রেয়ার–আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণের কিছু আধুনিক ক্ষেত্রে চীন এখনও জাপান ও আমেরিকার চেয়ে পিছিয়ে। আর সেই কারণেই আমেরিকার চোখ পড়েছে ডাচ জায়ান্ট এএসএমএল-এর উপর। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এক্সট্রিম-আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন তৈরির একমাত্র প্রতিষ্ঠান ডাচ জায়ান্ট এএসএমএল। সম্প্রতি সেই ডাচ চিপ-প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। উচ্চ ক্ষমতার এআই মডেল পরিচালনার জন্য এই চিপ তৈরির যন্ত্রের উপর ২০১৯ সাল থেকেই চীনে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল আমেরিকা। মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক দাবি করেছেন, এই ধরনের অতি সংবেদনশীল একটি মেশিন হয়তো গোপন পথে চীনে পৌঁছে গিয়েছে। সত্যিই কি তাই?
হাওয়ার্ড লাটনিকের দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রযুক্তি দুনিয়ায় আরও পিছিয়ে পড়বে আমেরিকা। রণক্ষেত্র হয়ে উঠবে আরও ভয়াবহ!