Bartaman Logo
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বস্তি না দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা?

কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের গোটা প্যানেল বাতিলের খাঁড়া নেমে এসেছিল প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর উপর

স্বস্তি না দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা?
  • ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের গোটা প্যানেল বাতিলের খাঁড়া নেমে এসেছিল প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর উপর। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র সেদিন সামনে এসেছিল, তা গোটা রাজ্যকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। একটু কম বলা হল। হতবাক হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। তবে অযোগ্যদের ভিড়ে বলির পাঁঠা হওয়া ‘যোগ্য’ প্রার্থীদের কথা বিবেচনা করে দেশের শীর্ষ আদালত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অংশ হিসাবে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের চাকরি বহাল রাখার নির্দেশ দেয়। সেই নিরিখে গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সময়সীমা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি এনে দিলেও, সামগ্রিক চিত্রে গভীরতর আশঙ্কার মেঘই ঘনীভূত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কুমার ও বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এটাই রাজ্য স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)-কে দেওয়া শেষ সুযোগ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষক এবং গ্রুপ-সি ও ডি পদে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ করতেই হবে। এই মামলার শুনানিতে সময়সীমা না বাড়ালে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা যে এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থার মুখে পড়ত—সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই মেয়াদ বৃদ্ধি কি কোনো স্থায়ী সুরাহা আনতে পারল, নাকি শুধু সমস্যাটিকে কিছুটা পিছিয়ে দিল?

Advertisement

কেন এই প্রশ্ন? কারণ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত জটিল এবং বেদনাদায়ক। একদিকে ওবিসি ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা বহাল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন করে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় যেসব ‘যোগ্য’ চাকরিহারা প্রার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি, আগামী মে মাসের পর তাঁদের ভবিষ্যৎ ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে—তা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। অপরাধ না করেও, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাশুল গুনতে গিয়ে প্রায় এক দশক চাকরি করার পর শুধুমাত্র বয়সের ভার ও নানা পারিপার্শ্বিক চাপে পরীক্ষায় পাশ করতে না পারা বহু শিক্ষকের জীবন এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মুখে। তদুপরি, শিক্ষাকর্মীদের (গ্রুপ-সি ও ডি) করুণ দশা আরও মর্মান্তিক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বেতনহীন এবং নতুন পরীক্ষার ফলপ্রকাশও ঝুলে রয়েছে।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হল নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা। নির্বাচনের আগে বিরোধী দলনেতা (অধুনা মুখ্যমন্ত্রী) শুভেন্দু অধিকারী ‘যোগ্য’ চাকরিহারাদের পাশে থাকার এবং সরকারে এলে মানবিক ও আইনি উপায়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখার বিষয়ে স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর সময় গড়ালেও যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ বা চাকরিহারাদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকারের কোনো বৈঠক হয়নি। এমনকি বৈঠকে বসা নিয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। প্রশাসনের শীর্ষস্তরে এই নীরবতা ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। তাঁরা চাইছেন, রাজ্য সরকার যেন দ্রুত আলোচনায় বসে। আসলে শিক্ষাব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির ক্ষেত্র হতে পারে না। শীর্ষ আদালতের বেঁধে দেওয়া এই চূড়ান্ত সময়সীমাকে আর কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না। এসএসসি ও রাজ্য সরকারকে সমস্ত আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একইসঙ্গে, যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো লেশমাত্র ছিল না, অথচ আইনি জটিলতার নাগপাশে আজ যাঁরা কালের স্রোতে তলিয়ে যেতে বসেছেন, তাঁদের জীবন-জীবিকার কথা মাথায় রেখে মানবিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নাহলে আগামী ৩১ মে-র পর রাজ্যের বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট যেমন প্রকট হবে, তেমনই বহু নির্দোষ পরিবার চিরতরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় আর কোনোভাবেই যে বাড়তি সময় মিলবে না, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এটাই শেষ সুযোগ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ