Bartaman Logo
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক কৌশল

২০২৫-এ শতবর্ষ পেরনো সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রধান মোহন ভাগবত বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যা যা বললেন, তা কোনো চাপে পড়ে, না কৌশল—সেই প্রশ্নে ফের উত্তাল ভারতীয় রাজনীতি।

রাজনৈতিক কৌশল
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০২৫-এ শতবর্ষ পেরনো সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রধান মোহন ভাগবত বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যা যা বললেন, তা কোনো চাপে পড়ে, না কৌশল—সেই প্রশ্নে ফের উত্তাল ভারতীয় রাজনীতি। আরএসএস-এর মূল আদর্শগত ভিত্তি হল, ভারতকে একটি ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসাবে দেখা। এদের চোখে, ঐতিহাসিকভাবেই ভারত একটি হিন্দুরাষ্ট্র। ভারতে বসবাসকারী ও ভারতের সংস্কৃতিকে ধারণকারী সব নাগরিকই, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস যাই হোক—সাংস্কৃতিক অর্থে ‘হিন্দু’। এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের আদর্শই প্রচার করে সংঘ পরিবার। অন্যভাবে বললে, সকল ভারতীয়কে যেন হতে হবে হিন্দু। কিন্তু বাস্তব হল, আরএসএস-এর এই ‘হিন্দুত্ব’ মতাদর্শ ভারতীয় সংবিধানের মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের পরিপন্থী। বিরোধী রাজনৈতিক দল, সমালোচক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, সংঘের ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ গঠনের লক্ষ্য আসলে ভারতের অ-হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার চেষ্টা। আসল উদ্দেশ্য হল, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিকাঠামো ভেঙে একচ্ছত্র হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যপূরণেই কাজ করে চলেছে বিজেপি সরকার। 

Advertisement

গত ২৯ আগস্ট আমেরিকার নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে অনাবাসী ভারতীয়দের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভাগবত যা বলেন, তা সাধারণত পদ্মবাহিনীর সমালোচনায় বিরোধীদের বক্তব্য হিসাবেই শোনা যায়। সংঘ প্রধানের মতে, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতের মূলমন্ত্র। এই চরিত্র ভারতের ডিএনএ-তে রয়েছে।... ‘বৈচিত্রকে আমরা উদযাপন করি, বৈচিত্রকে শ্রদ্ধা ও গ্রহণ করতে হবে এবং একইসঙ্গে আমাদের মনের মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি বজায় রাখতে হবে।’ এদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নিরন্তর অত্যাচারের হাজারো অভিযোগের বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সেদিন বলতে শোনা যায়, ‘যদি কোনো হিন্দু মনে করেন যে ভারতে কোনো মুসলিমের থাকা উচিত নয়, তবে তিনি আর যাই হোক হিন্দু নন। যদি আপনি নিজেকে হিন্দু বলতে চান তবে আপনাকে ‘যত মত তত পথ’-এর মন্ত্রকে বিশ্বাস করতেই হবে।’ সংঘ প্রধানের মুখে আদর্শ বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শুনে বিদ্রুপ কটাক্ষ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিরোধী শিবিরের প্রায় সর্বত্র। কারণ তিনি যা যা বললেন তার ঠিক উলটো ছবিটাই গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে। যেমন তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া যাক, প্রধানমন্ত্রীর বলা ‘লুঙ্গি পরা’ দেখে চেনা যায়... মন্তব্যটি। আবার এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ‘গোলি মারো...’ মন্তব্যের কথা। অথবা ২০১৮ সালে এক বিজেপি নেতার সেই মন্তব্য, ‘মুসলিমদের এদেশে থাকাই উচিত নয়, ওরাই জনসংখ্যার ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরি করছে’ ইত্যাদি কথা। আর এক বিজেপি নেতা ২০২০ সালে বলেছিলেন, ‘সমস্ত মুসলিমকে যে একবারে পাকিস্তানে পাঠানো হয়নি, তা আমাদের পূর্বপুরুষদের বড়ো ভুল।’ ভাগবতের আদর্শে বিশ্বাসীরাই মাত্র কয়েকদিন আগে কংগ্রেসের এক হেভিওয়েট নেতার একটি সভার পর তাঁর দলিত পরিচয়ের জন্য ঘটনাস্থল শুদ্ধিকরণ করেছে! গুজরাতের আমেদাবাদে এই ‘বীরপুঙ্গবরা’ একদল ছাত্রছাত্রীকে মালালার বই পড়ার অপরাধে মারধর করেছে। এইসব ঘটনা, বক্তব্য, প্রচার, অত্যাচার এমনকি হত্যাও চলেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—তা ভাগবত বর্ণিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের’ আসল চরিত্র ও চেহারা কি না— সেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অতীতে এদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি নানা ভাবে অত্যাচার নেমে এলেও সংঘ প্রধানকে তার প্রতিবাদে সেভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। 
আসলে সংখ্যালঘু, দলিতদের নিপীড়ন, বঞ্চনা, হেনস্তা করার কাজটাই আরএসএস-বিজেপির বিভিন্ন সংগঠন করে চলেছে প্রায় প্রতিনিয়ত। কিন্তু মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদির মতো নাগপুরের মাথারা মুখোশের আড়ালে থেকে নীতিকথা শুনিয়ে যাচ্ছেন দেশবাসীকে! এই দু’মুখো নীতিই আসলে ভাগবতদের রাজনৈতিক কৌশল। পশ্চিমবঙ্গেও যেমন নতুন বিজেপি সরকারের তিন মাসের রাজত্বে যেকোনো কুকর্মের ব্যাখ্যায় শাসক নেতাদের বলতে শোনা যাচ্ছে ‘এসব আমাদের সংস্কৃতি নয়।’ অনেকের মতে অবশ্য ভাগবতের এই বক্তব্য কোনো মতাদর্শের পরিবর্তন বা আত্মোপলব্ধি নয়। এ হল চাপের কাছে নতিস্বীকার। কারণ, তাঁর সফরকে ঘিরে নিউইয়র্কে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। খোদ নিউইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি সংঘ প্রধানের অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেন। বহু প্রবাসী ভারতীয় নাগরিক ও মানবাধিকার সংস্থা বিক্ষোভ দেখায়। তাঁকে আমেরিকায় ঢুকতে না দেওয়ারও দাবি ওঠে। এই প্রেক্ষিতে মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞা এড়ানো ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি বাঁচাতে ভাগবতকে ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদের ভেক ধরতে হয়েছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে। আসলে হয়তো সবটাই গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কারণ ভাগবত বিলক্ষণ জানেন, দেশে বিজেপির এখন বেহাল দশা। এ দেশের জেন জি-রা বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সোচ্চার হচ্ছে। চাইছে সমস্যার সমাধান। তাদের কাছে ধর্ম আসল কথা নয়, রাজনীতিরও তারা ধার ধারে না। ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা এই প্রজন্মের মন জয় করে তাদের কাছে টানতেই কি তিনি ‘সহনশীলতা’ ‘উদারতার’ পাঠ দিচ্ছেন? এও রাজনৈতিক কৌশল!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ