Bartaman Logo
৩১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিক্ষার আয়না

প্রশ্নপত্র ফাঁসকে এতদিন বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের তালিকায় রেখে দায় এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কোথাও দালাল, কোথাও পরীক্ষা কেন্দ্র, কোথাও-বা কয়েকজন অসাধু অফিসার—ব্যস, দায় শেষ! কিন্তু প্রশ্নটি আসলে আরও গভীর।

শিক্ষার আয়না
  • ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রশ্নপত্র ফাঁসকে এতদিন বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের তালিকায় রেখে দায় এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কোথাও দালাল, কোথাও পরীক্ষা কেন্দ্র, কোথাও-বা কয়েকজন অসাধু অফিসার—ব্যস, দায় শেষ! কিন্তু প্রশ্নটি আসলে আরও গভীর। বিজেপির প্রবীণ নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা সরকারের অস্বস্তির কারণ হওয়ারই কথা। তাঁর অভিযোগ, প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারিতে সরকার ও সিস্টেম নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছে। কারণ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস মানে শুধু কয়েক লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি নয়, এটি রাষ্ট্রের যোগ্যতা নির্ধারণের ব্যবস্থাটিকেই অবিশ্বাস্য করে তোলা। যে ছাত্র বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটি পরীক্ষায় বসে, তার সামনে যদি অর্থ, যোগাযোগ ও দুর্নীতির শর্টকাট রাস্তা খুলে দেওয়া হয়, তবে ‘মেধা’ শব্দটিই পরিহাসে পরিণত হয়। যোশির আরও একটি প্রশ্ন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ: বাজপেয়ি জমানায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হত না কেন? আরও অস্বস্তিকর হল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক সমালোচনা। বাজেট বরাদ্দ কমছে, সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে, বেসরকারিকরণ বাড়ছে, অথচ নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রচার থামছে না। স্কুল আছে, শিক্ষক নেই। কলেজ আছে, চাকরি নেই। তাহলে ‘বিকশিত ভারত’-এর বিকাশ কোথায়? ভবন দিয়ে শিক্ষা হয় না। উদ্বোধনী ফলক দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল পরিসংখ্যানের ফুলঝুরি সাজালে তরুণ প্রজন্মকে শেষ পর্যন্ত হতাশার অতিরিক্ত কী দেওয়া হয়?

Advertisement

আর এখানেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক দুর্নীতির যোগসূত্রটি সামনে আসে। একজন তরুণ যদি প্রতিদিন দেখে অর্থ ও প্রভাব যোগ্যতার বিকল্প হয়ে উঠছে, তবে তার কাছে নৈতিকতার পাঠ ক্রমশ অর্থহীন। আর সেখানে যদি স্বয়ং শিক্ষকেরই বিরুদ্ধে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার অভিযোগে ওঠে, মন্ত্রী বা আমলারা একইভাবে কলঙ্কিত হন, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই যদি নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাবার সুযোগ মেলে, তবে পরীক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগবেই: আমি কেন পিছিয়ে থাকব নিয়ম মানার ‘অপরাধে’? নৈতিকতা নিয়ে তরুণ সমাজের সামনে ভাষণ দেওয়ার আগে রাষ্ট্রকে নিজের আচরণ সম্পর্কে সতর্ক হতেই হবে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে জায়মান অনৈতিকতার দায় কেবল তরুণ প্রজন্মের ঘাড়ে চাপিয়ে শাসক দায়মুক্ত হতে পারে না। নিট-সহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ, তদন্ত, মামলা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার খবর তরুণদের মনে যে অবিশ্বাস তৈরি করেছে, তা সামান্য নয়। তার উপর শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের সেতুটিও ভঙ্গুর। ডিগ্রিই বাড়ছে কেবল, সমতা রেখে বাড়ছে না নিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, কিন্তু উপযুক্ত কাজের বাজার তৈরি হচ্ছে না। সরকারি চাকরিকেই এক ও একমাত্র নিরাপদ ভবিষ্যৎ মনে হলে একটি-দুটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ তরুণের জীবন-মরণ লড়াই অবশ্যম্ভাবী। সেই লড়াইয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার উপর আঘাত। বরং তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
জেন জি-র আন্দোলন তাই কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। যন্তরমন্তর থেকে বিভিন্ন শহরের রাস্তায় যে প্রতিবাদ দেখা গিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট। প্রদত্ত সিএমআইই-র তথ্য অনুযায়ী, ১৮-২২ বছর বয়সিদের মধ্যে মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা এপ্রিল-মে মাসের ৭০ শতাংশ থেকে জুন-জুলাইয়ে ৬৪ শতাংশে নেমেছে; সি-ভোটারের পরিসংখ্যানে, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ‘মোদিই ভালো’ বলার হার জানুয়ারির ৫৫ শতাংশ থেকে আগস্টে ৪৮.৭ শতাংশে নেমেছে। জনপ্রিয়তা ওঠানামার পিছনে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক পরিবেশ-সহ বহু কারণ কাজ করে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তরুণদের প্রশ্ন এখন আর কেবল চাকরি বা পরীক্ষার প্রশ্ন নয়, তাঁরা বরং জানতে চাইছেন: তাঁদের মেধা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের প্রতি সুবিচার করতে রাষ্ট্র কি আদৌ প্রস্তুত? ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ আন্দোলনের সাফল্য হলে সেটিকে শেষ অধ্যায় ভাবার কারণ নেই। মন্ত্রী বদলালেই ব্যবস্থা বদলায় না। প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরীক্ষাব্যবস্থা, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সরকারি শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তব যোগসূত্র নির্মাণ। সর্বাধিক জরুরি ক্ষমতার আত্মতুষ্টি ভেঙে সত্যকে স্বীকার করা। ‘বিকশিত ভারত’ স্লোগান যতই উচ্চকিত হোক, তার ভিত যদি হয় শিক্ষকহীন স্কুল, অনিশ্চিত চাকরি, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র এবং অবিশ্বাসে ভরা তরুণ সমাজ, তবে সেই বিকাশ কাগুজে মাত্র। প্রবীণ যোশি যে আয়নাটি তুলে ধরেছেন, সরকার সেটি ভাঙবে, না তাতে নিজের মুখ দেখবে—সেই পরীক্ষাই সামনে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ