Bartaman Logo
৩১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নেপাল আমাদের অ্যালার্ট করছে

নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিভিন্ন ভিডিয়ো এখন ভাইরাল। দেখলে মনে হবে যেন হলিউডের কোনো মুভি।

নেপাল আমাদের অ্যালার্ট করছে
  • ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিভিন্ন ভিডিয়ো এখন ভাইরাল। দেখলে মনে হবে যেন হলিউডের কোনো মুভি। কিন্তু তফাৎটা হল, এটি রূঢ় বাস্তব। পর্দার কোনো কাল্পনিক ছবি নয়। গ্রাফিক্সের কারসাজি নয়। বাস্তবের ছবি হার মানিয়ে দেবে যে কোনো কল্পকাহিনিকেও। ২৬ আগস্ট। আর পাঁচটা দিনের মতো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল নেপালে। কেউ ভাবতেও পারেনি কী বড় বিপদ নেমে আসছে রাসুয়া, ধাদিং ও আশপাশের জেলাগুলিতে। ভাইরাল ভিডিয়োগুলিতে দেখা গিয়েছে, কর্মব্যস্ত জীবন। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ হঠাৎ-ই রুদ্র রূপ ধারণ করল লেহেন্দে, ভোটেকাশী  আর ত্রিশূলি নদী। প্রবল জলোচ্ছ্বাস। চীনের গিরাং হয়ে নেপালে ঢুকে কাদা-মাটির স্রোত চোখের নিমিষে ভাসিয়ে দিল হিমবাহ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের একের পর গ্রাম-শহর। হিমালয়ের সুনামির এক ধাক্কায় বড়োবড়ো কংক্রিটের ভবন, বাড়ি-ভর, ব্রিজ সবকিছু মনে হল খেলনা। মুহূর্তে সবকিছু স্রেফ ধুলোয় মিশে গেল। কত প্রাণহানি তার হিসাব চলছে। সাতশো-আটশো-হাজার...। তারপর একদিন গুনতি থেমে যাবে। চলবে ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব। ব্যাস আমরা ভুলে যাব। 

Advertisement

কিন্তু প্রশ্ন হল নেপালই কি শেষ? হিমালয় আমাদের বার্তা দিচ্ছে। বারবার। আমরা শুনছি না। তাই আমাদের জন্য ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই আরও বড়ো বিপদ অপেক্ষা করে আছে। এই প্রাকৃতিক ট্র্যাজেডি ভারত সহ গোটা হিন্দুকুশ হিমালয়ের জন্যই একটি বার্তা। এই অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (গ্লফ) দ্রুত বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে নেপালের বিপর্যয়ের কারণ, হিমালয়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় লাংটাং লিরুং অঞ্চলের একটি ঝুলন্ত হিমবাহের উল্লম্ব পতন। আইআইএসসির প্রখ্যাত হিমবাহবিদ অধ্যাপক অনিল কুলকার্নির মতে, এই পতনের তীব্রতাকে একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মার্কিন সংস্থা ইউএসজিসি প্রথমে জানিয়েছিল, তিব্বতে একটি মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হয়। ওই কম্পনের জেরেই হিমাবাহটি ভেঙে পড়ে। কিন্তু পরে তারা সেই মত সংশোধন করে নেয়। জানায়, এই হিমবাহ ধসের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, ৫.২ মাত্রার সমতুল ভূ-কম্পন হয়েছিল।  
হিমালয়ে যখন কোনো ঝুলন্ত হিমবাহ ধসে যায় বা হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যায়, তখন সংকীর্ণ নদীখাতে সেই জল বিপুল গতিতে প্রবাহিত হয়। তীব্র স্রোত নদীর পাড় ভেঙে পাথর ও গাছপালা উপড়ে নেয়। নদীর প্রবাহ ঘন কাদামাটির স্রোতে পরিণত হয়। এই ধ্বংসাবশেষ সংকীর্ণ বাঁকে সাময়িক অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ফেটে গিয়ে নীচের দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেতু ও জনপদে দ্বিগুণ শক্তিতে আছড়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলেন ‘ক্যাসকেডিং এফেক্ট’। আসলে হিমালয় নবীন পর্বতমালা। এখানকার প্রকৃতি ও ভৌগোলিক গঠন এমনই যে কোনো দুর্যোগ হলে সেটির ক্যাসকেডিং প্রভাব দেখা যায়। ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ বিপর্যয়, ২০২১ সালের চামোলি বা বছর তিনেক আগে উত্তর সিকিমে লহোনাক হ্রদ ভাঙা বিপর্যয় এসবরই উদাহরণ মাত্র। নেপালেও তাই।
নেপালের বিপর্যয় ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলির পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সম্প্রতি আইআইটি রোপার এবং সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি একটি যৌথ গবেষণা করেছিল। হিমাচল প্রদেশ সম্পর্কে তাদের গবেষণালব্ধ রিপোর্ট রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। কী বলা হয়েছে, সেই রিপোর্টে। ১৯৯০ সালে হিমাচল প্রদেশে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা ছিল ১০৭টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টিতে। অর্থাৎ তিন দশকে হ্রদের সংখ্যা পাঁচগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হ্রদগুলির মোট জলভাগের আয়তন ৫.৫৪ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ১১.২০ বর্গকিলোমিটার হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমাণ ১০২ শতাংশ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৮৮টি হ্রদে যেকোনো সময় জিএলওএফ ঘটার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি হ্রদকে ‘চরম বিপজ্জনক’ এবং ১৮টি হ্রদকে ‘উচ্চ মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লাহুল-স্পিতি পর্যটকদের অত্যন্ত পছন্দের জায়গা। সেখানকার গিপাং হ্রদের আয়তন আড়াইশো শতাংশের বেশি বেড়েছ। কুলুর বাসুকি তালের আয়তন গত সাত বছরে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সমীক্ষকরা বলছেন, এই তাল বা হ্রদগুলির কোনো একটিতে বিস্ফোরণ ঘটলে পার্বতী ও চন্দ্রভাগা অববাহিকায় ৩৪টি ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ, ৫৭টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং ১০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক যোগাযোগ মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হতে পারে। সবচেয়ে ক্ষতি হতে পারে কুলু ও কিন্নর জেলায়। বিপাশা ও শতদ্রু অববাহিকাতেও ব্যাপক বন্যায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি বিনষ্ট হতে পারে। উত্তরাখণ্ডও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, উত্তরাখণ্ডে প্রায় ১২০০টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। যার মধ্যে ৪২৬টি হ্রদের ক্ষেত্রফল হাজার বর্গমিটারের বেশি। এর মধ্যে ২৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬টিকে ‘চরম বিপজ্জনক’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নামকরা জার্নাল ন্যাচরাল হ্যাজার্ডস জানিয়েছে, উপরি আলকানন্দা অববাহিকা, বিশেষ করে পবিত্র বদ্রীনাথ ধাম এবং ভারতের সীমান্ত গ্রাম মানার উপরিভাগে প্রায় ২১৯টি ঝুলন্ত হিমবাহ ও অত্যন্ত অস্থির বরফের আস্তরণ রয়েছে। ইসরোর ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টারের মানচিত্র অনুযায়ী, ভারতের লাদাখ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত হিমালয়ে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। যার মধ্যে ৬৭৬টি হ্রদের আয়তন গত চার দশকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। হিমবাহগুলি গলতে থাকায় বরফের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হচ্ছে এবং খাড়া ঢাল থেকে বরফখণ্ড ভেঙে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
গরম পড়লেই আমরা পাহাড়ে ছুটি। হিমাচলের সিমলা, ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। ব্রিটিশ আমলের পরিকল্পনা অনুসারে এই শহরে ২৫ হাজার মানুষ থাকতে পারেন। এখন বছরে এখানে ২৫ লক্ষ পর্যটক আসেন। এরপর বিপর্যয় হলে কাকে দোষ দেব? কিছুদিন আগের ঘটনা। জোশীমঠে একের পর এক ধস। শহরটাই টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। অথচ ১৯৭৬ সালে মিশ্র কমিটি জোশীমঠে বেআইনি নির্মাণ, হোটেল তৈরির বিরুদ্ধে সুপারিশ করেছিল। কে মেনেছে? উন্নয়নের নামে হিমালয়কে তিলে তিলে ধ্বংস করা হচ্ছে। এগুলি খণ্ডচিত্র। আসলে পাহাড়ের প্রতিটি পর্যটনস্থলের চিত্রই কমবেশি এক। এর সঙ্গে যোগ করুন বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের রিপোর্ট বলছে, হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চল প্রতি দশকে ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩২.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট  হারে উত্তপ্ত হচ্ছে। হিমবাহ গলার হার ৬৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হিমবাহ গলার ফলে বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে। সায়েন্স অ্যাডভান্স পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে গতিতে বরফ গলেছে, ২০০০-এর পর তার গতি দ্বিগুণ হয়েছে। 
একথা সত্যি যে, এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে রোখা মানুষের সাধ্যের বাইরে। কিন্তু তা বলে তো আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। আমরা যেটা করতে পারি, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কারণগুলিকে যথাসম্ভব কমাতে পারি। সেই চেষ্টা আমাদের করতেই হবে। আমাদের বুঝতে হবে পাহাড়ের চরিত্র। আমরা যদি পাহাড়কে সমতল মনে করি তাহলে তো বিপর্যয় হবেই। তখন রোদন করে লাভ নেই। ইতিমধ্যেই কিছু কাজ শুরু হয়েছে। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউটের প্রবীণ বিজ্ঞানী ডঃ মণীশ মেহতা বলেছেন, হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ করা সহজ নয়। এর মধ্যেও ১৩টি চিহ্নিত হ্রদের মধ্যে চারটির সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই হবে আরও দু’টির কাজ। এর সঙ্গে দরকার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মাটিতে সেন্সরভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো। পাহাড়ে উন্নয়ন তো করতে হবেই। কিন্তু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পই হোক বা টানেল বা অন্য কোনো নির্মাণ— সবার আগে পরিবেশগত ঝুঁকির পরিমাণ খতিয়ে দেখা দরকার। বিপজ্জনক হ্রদগুলির অতিরিক্ত জল বের করে চাপ কমাতে হবে। হ্রদগুলির জলস্তর পরিমাপক যন্ত্র ঠিক কাজ করছে কি না, তা নিয়মিত নজরে রাখতে হবে। নাহলে সিকিমের মতো বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। ভারত, নেপাল ও চীনের মধ্যে হিমালয় সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতেই হবে। মনে রাখতে হবে নেপাল ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার জলধারা রয়েছে। আবার শতদ্রু বা ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীর উৎপত্তিস্থল তিব্বত। ২০২৫ সালে আরটিআই তথ্যে জলশক্তি মন্ত্রক জানায়, ২০২২ থেকে চীন কোনো তথ্য শেয়ার করেনি। বুঝতে হবে হিমালয় কিন্তু ভৌগোলিক সীমান্ত বোঝে না। 
হিমালয় আমাদের আবার বলছে, বিপর্যয়ের পরে ত্রাণ পাঠানো জরুরি। কিন্তু তার থেকেও জরুরি প্রকৃতিকে বোঝা। পাহাড়কে সমতলের মতো কংক্রিটের বোঝা চাপিয়ে দিলে, সে তার 
প্রতিশোধ নেবেই। কত প্রাণের বিনিময়ে আমরা নিজেদের শুধরাবো?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ