Bartaman Logo
৩০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

২৯-এ বাংলায় বিধানসভা ভোট হলে বিরোধী কে?

২০২৯ সালে বাংলায় কি মাঝপথে আবার বিধানসভা নির্বাচন হবে? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পূবের গেটওয়ে পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে গেরুয়া শক্তি।

২৯-এ বাংলায় বিধানসভা ভোট হলে বিরোধী কে?
  • ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজনীতির ওঠাপড়া 

Advertisement

হিমাংশু সিংহ: ২০২৯ সালে বাংলায় কি মাঝপথে আবার বিধানসভা নির্বাচন হবে? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পূবের গেটওয়ে পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে গেরুয়া শক্তি। মাত্র তিন বছরেই আবার লোকসভার সঙ্গে এ রাজ্যের শাসন ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা পরখ করার ঝুঁকি কি শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসন নিতে চাইবে? ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ নরেন্দ্র মোদির ব্রেন চাইল্ড। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ, তিন তালাক নিষিদ্ধ করার পর বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পথে সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এক দেশ এক নির্বাচন। সঙ্গে লোকসভা ও রাজ্যসভার আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সুপরিকল্পিত কৌশল, যা নিয়ে দক্ষিণ ভারত জুড়ে একটা অবিশ্বাস আর অনাস্থার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। মোদিজি কি পারবেন ঊনত্রিশ সালে সব বাধা সরিয়ে তা কার্যকর করতে? কাশ্মীরের মানুষ কিন্তু রাজ্যভাগের সাত বছর পর মোটেও খুশি নয়। কারণ, পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বাকি সব ঝুলে! সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হয়নি, যুবকরাও কাজ পায়নি। তিন তালাক কাগজে কলমে নিষিদ্ধ হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না কেউ! এত বড়ো ব্যবধানে জিতেও এ রাজ্যে বিজেপি উল্লসিত নয়। নিশ্চিতও নয়। তাই শপথ নেওয়ার পর শিল্প আনা নয়, তোলাবাজি বন্ধ করাও নয়, বিরোধী দলকে ভাঙাই প্রথম প্রায়োরিটি ছিল। কারণ, ক্ষমতা পিছলে যাওয়ার ভয়! সাধারণত শাসক দল নয়, বিরোধীরা নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফেরাতেই আগাম ভোটের কথা বলে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়েই মাননীয়া অগ্নিমিত্রা পাল ঊনত্রিশ সালে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন দলীয় কর্মীদের। তাঁর ওই বক্তব্যে শুধু বিজেপি কর্মীরাই নন, রাজ্যের আপামর সাধারণ মানুষও বিস্মিত। প্রশ্ন একটাই, মাত্র কয়েক মাস আগে বিরাট ম্যান্ডেট নিয়ে ভোটে জিতে আসার পরেও মেয়াদ পূর্ণ করার এত আগে কেন রাজ্যের নতুন সরকারের মাননীয় পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী দলীয় কর্মীদের পরের ভোট নিয়ে সতর্ক করছেন? নতুন সরকারের একবছর দূরঅস্ত, এখনও ৬ মাস কাটেনি। যে পাহাড়প্রমাণ প্রতিশ্রুতি এবং সুশাসনের প্রত্যাশার উপর দাঁড়িয়ে ২ কোটি ৯২ লক্ষ মানুষ ‘কমল’ চিহ্নে ভোট দিয়েছে তাঁরা কড়ায় গণ্ডায় হিসাব বুঝে নেবেন। বিজেপির দাবি অনুযায়ী মহিলা ও সংখ্যালঘুরাও ঢেলে ভোট না দিলে এই ফল অসম্ভব ছিল। তাঁরা কি একটু একটু করে সরছেন? নাহলে এত অল্পসময়ে আশঙ্কা কীসের? অগ্নিমিত্রাদেবীর দল ও সংগঠন নিয়ে এই উচাটনের কারণ কী? তিনি কি কোনো অজানা কারণে উদ্বিগ্ন? বলা বাহুল্য, গত ২৯ এপ্রিল এই বঙ্গে শেষ দফার ভোটের দিন বিজেপির পক্ষে যে হাওয়া ও আবেগ কাজ করছিল, সাড়ে তিন মাসে তা নানা কারণে স্তিমিত। কারণ, তাঁরা দেখছেন তৃণমূলের পচা অংশটাকে খতম না করে বুকে টেনে নিয়েছেন শমীকবাবুরা। পাচারকারী এমপি হয়েছেন বেমালুম আর আঙুল চুষছে বিজেপির কারিয়াকর্তারা। এ তো বাংলার সঙ্গে নির্ভেজাল প্রতারণা। বিজেপির একটা অংশের ভয় সেই কারণেই। গত বুধবার আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভার ভারতীভবনে কর্মী সম্মেলনে অগ্নিমিত্রাদেবীর ওই মন্তব্য নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহূর্তে শোরগোল যথেষ্ট। এটা ঠিক, ঊনত্রিশে এ রাজ্যে বিধানসভা ভোট যদি হয়ও তার আগে রাজ্যের নবনির্বাচিত শাসক দলের প্রথম পরীক্ষা কিন্তু আসন্ন পুরভোটে। এবং ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির অন্দরে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই যেভাবে বিজেপির নীচুতলা থেকে প্রত্যেক ওয়ার্ডে কোথাও একডজন, কোথাও দেড় ডজন নাম জমা পড়ছে, তাতে নেতৃত্ব প্রমাদ গুনছেন। একবার প্রার্থী তালিকা বের হলেই বহু জায়গায় বিবাদ রাস্তায় নেমে আসবে। এর কারণ একটাই, সবাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায় এবং কে না জানে মওকা বারবার আসবে না। আবার ভালো তৃণমূলেরও অনেকে বিজেপির কাছে টিকিট প্রত্যাশী হওয়ায় সমস্যাটা আরও শোচনীয়। পুরভোটে এই ভালো সাজা তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির জোট হবে, না সবাই একা একাই লড়বে তাও বড়ো প্রশ্ন। এই দ্বিমুখী সমস্যা সামলে সুষ্ঠুভাবে দল ও ভোট পরিচালনা মোটেও সহজ হবে না। অগ্নিমিত্রাদেবীর আশঙ্কার কারণ সম্ভবত সেটাই! সেই কারণেই ঊনত্রিশের বিধানসভা লড়াইয়ের জুজু দেখিয়ে তিনি নীচের তলার সংগঠনকে সংযত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। পুরভোট যেহেতু এলাকার সমস্যার ভোট, ওয়ার্ড সংখ্যার নিরিখে প্রার্থী কিংবা প্রত্যাশীর সংখ্যাও অনেক। বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাও কয়েকগুণ বেশি। 
অগ্নিমিত্রাদেবী বিলক্ষণ জানেন শিক্ষাঙ্গনে গণ্ডগোল, লোকদেখানো ডিম ছোড়াছুড়ি, গেরুয়া সৌজন্যে তৃণমূলের ভালোমন্দ ভাগ এবং পার্টির একটা বড়ো অংশের অল্পসময়ে তোলাবাজি আঁকড়ে  বড়োলোক হওয়ার নেশা জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। কিছু নেতার আঙুল ফুলে এত অল্প সময়ে কলাগাছ হবে কে ভেবেছিল। অমিত শাহ নিশ্চয়ই বাজারে বাজারে বিচ্যুতি রুখতে ঘুরবেন না। এরই উলটোপিঠে আগের জমানার দাগিদের সঙ্গে আঁতাঁত সাধারণ মানুষের চোখে স্পষ্ট। সংসদে কিছু বিতর্কিত বিল পাশের অজুহাতে এই নোংরা সেটিং দেখে মহিলারা তিতিবিরক্ত। যে পুলিশকে দলদাস বলে দাগিয়ে ক্ষমতায় আরোহন, সেই পুলিশের কর্তাভজা ট্র্যাডিশন কি আজও বহাল নেই? বিন্দুমাত্র কোনো বদল দেখা যাচ্ছে খালি চোখে? পুরসভাগুলো অচল, পরিষেবা শিকেয়। ভাতা নিয়ে বিভ্রান্তি চলছে। দ্রুত রাজ্যে একটা বড়ো শিল্প ইউনিট স্থাপন জনগণের দাবি, যাতে সাধারণ ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবে। নাহলে এ রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গিয়ে পরিযায়ী হওয়ার কলঙ্ক আগামী পাঁচ বছরেও ঘুচবে কি না সন্দেহ। যত সময় যাবে চাঁদের মতো দলের গায়েও কলঙ্ক লাগা সংসদীয় গণতন্ত্রের অনিবার্য পরিণতি। সেই কারণেই সম্ভবত ঊনত্রিশ সালে লোকসভার সঙ্গেই বিধানসভার ভোট চাইছেন অগ্নিমিত্রাদেবী। ’৩১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছেন না। মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি ভালো করেই বুঝতে পারছেন সময় যত যাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বাড়বে। মানুষের আশা হোঁচট খাবে। সমর্থন সরবে। পরের বার এসআইআর থাকবে না। সেই কারণেই আসন্ন পুরসভাগুলোর ভোট নিয়ে বিজেপি এখন থেকেই উদ্বিগ্ন। দফায় দফায় বৈঠক করছেন সুনীল বনসলরা। কারণ, একটা আবেগ এবং তৃণমূলবিরোধী জনাদেশ বিজেপিকে ২০৮ আসনে জয়ী করেছে। বেশিদিন তা ধরে রাখা কঠিন।
কেন্দ্রের শাসক দলের এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার নিঃসন্দেহে ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ এবং নারী সংরক্ষণের আড়ালে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০’এ নিয়ে যাওয়া। সেই ডিলিমিটেশন বিল কিন্তু এই নিয়ে দু’-দু’টি অধিবেশনে পাশ করা গেল না। আগামী শীতকালীন অধিবেশনেও পাশ করানো কঠিন। জেন জি’র বিক্ষোভ, দিল্লির যন্তরমন্তরে অশান্তি, পেলেট গান বিতর্ক এবং একাধিক রাজ্য থেকে জনসমর্থন হ্রাসের ইঙ্গিত শাসক দলকে ভাবাচ্ছে। সন্দেহ জাগছে, সত্যিই ঊনত্রিশ সালে এক দেশ এক নির্বাচন ও লোকসভা আসনের পঞ্চাশ শতাংশ সংখ্যাবৃদ্ধি কি সম্ভব? সংবিধান সংশোধনী বিল আনার চেষ্টাই শুধু ব্যর্থ হয়নি, জেন জি আন্দোলন এবং বিরোধীদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধে সংসদের বিগত বর্ষাকালীন অধিবেশনটাই পণ্ড হয়েছে। সরকারের আশা ছিল, মমতাকে হারিয়ে বাংলা দখল এবং তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিনের পতন বিরোধীদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। বিরোধী জোট বলে আর কিছু অস্তিত্ব থাকবে না। সংসদে কিন্তু তা হয়নি। বরং বিজেপির বিপদ বাড়ছে কংগ্রেস আগের থেকে বেশ খানিকটা উজ্জীবিত হওয়ায়। আপাতত বিল পাশের চেয়েও কেন্দ্রের শাসকের চিন্তা আগামী বছর প্রথমে পাঞ্জাব এবং তারপর উত্তরপ্রদেশের ভোটের ফল নিয়ে। পাঞ্জাব এবং বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে যদি ফল খারাপ হয় তাহলে ঊনত্রিশে এক দেশ এক নির্বাচনের ঝুঁকি সরকার নেবে না। পাঞ্জাবে এবারও মূল লড়াই আপ ও কংগ্রেসের মধ্যে। এ পর্যন্ত সব সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে পাঞ্জাবে এবারও বিরোধীদের পাল্লাই ভারী। মরিয়া হয়ে অকালি দলের সঙ্গে সমঝোতা করেও খুব একটা লাভ হবে না। আর উত্তরপ্রদেশ গত লোকসভা নির্বাচন থেকেই মোদিজিকে ভোগাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের জন্যই সংসদে একক গরিষ্ঠতা পায়নি গেরুয়া দল। বিধানসভায় যদি ভালো ফল না হয় কিংবা কান ঘেঁষে ক্ষমতা দখল হয় তাহলে এক দেশ এক ভোট করতে বিজেপি রাজি হবে বলে মনে হয় না!
মাত্র ৬০ বছর লেগেছে ‘নকশাল’ শব্দের অর্থ জানতে। দেবদূত পট্টনায়েক লিখিত বই উদ্ধৃত করে যোগেন্দ্র যাদব জানিয়েছেন, নকশাল শব্দের অর্থ কাশফুল। সব কাশফুল তুলে ফেলার ডাক দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যাদবপুরের বুকে দাঁড়িয়ে শুভেন্দুবাবু দেশবিরোধীদের নির্মূল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছেন ৮০ বিধায়কের দ্বিধাবিভক্ত তৃণমূলের চেয়েও শূন্য কিংবা এক-দুই সদস্যের বাম জোটের দাম বেশি। এদের কেনা যায় না। তাই ড্রোন নামাতে হবে যাদবপুরে। ওরা কী খায়, কোথায় যায় তার উপর নজরদারি করতে! নিজের অজান্তেই বিজেপি এ রাজ্যে বামেদের প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিচ্ছে। ঊনত্রিশে বিধানসভা নির্বাচন  হলে নিশ্চিতভাবেই বাম শক্তির সঙ্গেই যে লড়তে হবে, তা স্পষ্ট মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই। বাকিরা এলেবেলে সুযোগসন্ধানী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ