Bartaman Logo
২৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দল ভাঙতে গিয়েই বিপাকে পড়ল বিজেপি

তোলাবাজি নিয়ে ক্ষুব্ধ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুধু চার ঘণ্টায় বিজেপি হওয়া লোকজনের উপরেই নয়, দলের কিছু বিধায়কের কাজেও প্রচণ্ড বিরক্ত।

দল ভাঙতে গিয়েই বিপাকে পড়ল বিজেপি
  • ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: তোলাবাজি নিয়ে ক্ষুব্ধ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুধু চার ঘণ্টায় বিজেপি হওয়া লোকজনের উপরেই নয়, দলের কিছু বিধায়কের কাজেও প্রচণ্ড বিরক্ত। তাঁর দাবি, কিছু বিধায়ক ফিতে নিয়ে ফ্ল্যাট মাপতে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে, এমনকি ছেঁটে ফেলতেও পিছপা হবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ২০জন বিধায়ককে বের করে দিলেও সরকারের কিছু যায় আসে না। বিধায়কদের ব্যাপারে কড়া অবস্থা নিতে পারলেও তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙিয়ে আনা ২০জন ‘ভালো’ সাংসদের কী হবে? অনেকে বলছেন, তৃণমূলকে ভাঙতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে গেরুয়া শিবির। বিজেপি এখন ‘বিশের বিষে’ জর্জরিত।

Advertisement

তৃণমূল কংগ্রেসের যে ২০জন সাংসদ এনসিপিআই দলে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের ভাগ্য সুতোয় ঝুলছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলত্যাগী ২০জন সাংসদের সদস্য পদ খারিজের আর্জি জানিয়ে 
সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন। তাঁরা সাংসদ থাকবেন কি না, থাকলেও কোন দলের প্রতিনিধি হিসাবে থাকবেন, ঠিক করবে সুপ্রিম কোর্ট। ইতিমধ্যেই আদালতের নির্দেশে লোকসভার স্পিকার ২০জন সাংসদের কাছে নোটিস পাঠিয়ে তাঁদের অবস্থান জানতে চেয়েছেন। তা নিয়ে শুধু দিল্লি নয়, বাংলার রাজনীতিও সরগরম। অনেকে মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্ট বাংলার রাজনীতিকে নতুন এক বাঁকের মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট ২০জনের সাংসদ পদ খারিজ করে দিতে পারে। আবার বল লোকসভার স্পিকারের কোর্টে ঠেলে দিতে পারে।  তবে সাংসদ পদ খারিজ হলে বাংলায় নেমে আসবে অকাল নির্বাচন। রাজ্যে লোকসভার ৪২টির মধ্যে ২০টি আসনে উপ নির্বাচন মানে হাফ বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। উপ নির্বাচন হলে বিজেপিকে যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তা পূরণ করতে পারছে কি না, তার একটা অ্যাসিড টেস্টও হয়ে যাবে। তবে, বিজেপি এটা এখন কোনোভাবেই চাইবে না।
বিজেপি নেতৃত্বের কথাতেই হয়তো ২০জন সাংসদ তৃণমূল ছেড়েছেন এবং এনসিপিআই দলে নাম লিখিয়েছেন। তারজন্য তাঁরা যদি গাড্ডায় পড়েন, টেনে তোলার নৈতিক দায় বিজেপিরই। বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া কর্পোরেশন নির্বাচনে তাঁরা এনডিএ-র শরিক হিসাবে জোট করে লড়াই করবেন। কিন্তু, সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তাঁর সাফ কথা, বিজেপি পুরভোটে একা লড়বে। তাঁর একথা বলার পিছনে যুক্তিও আছে। বিজেপি একা লড়েই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। তাই জয়ের কৃতিত্বে অন্যকে ভাগ দিতে যাবে কেন?
তবে, একইসঙ্গে এটাও ঠিক, তৃণমূলত্যাগী সাংসদদের বিজেপি সহজে ঝেড়ে ফেলতেও পারবে না। কারণ ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করে এনডিএ-র শরিকের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাই উপ নির্বাচন হলে ২০জনকেই টিকিট দিতে অথবা তাঁদের সমর্থন করতে হবে। তা না হলে নীতি নৈতিকতার  যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটাও থাকবে না। 
বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানোয় তৃণমূলত্যাগী ২০জন সাংসদ চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। এঁদের অনেকেই প্রথমবার সংসদে পা দিয়েছেন। মাঝপথে সাংসদ পদ খারিজ হয়ে গেলে তাঁরা বহু সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই আম ও ছালা দুই-ই যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমবার নির্বাচিত সাংসদদের মুখ ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। 
বাংলায় পালা বদলের পিছনে অনেকগুলি ফ্যাক্টর কাজ করলেও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আদি ও নব্যের মেলবন্ধনের কাজটা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করেছেন। দলবদলুদের দাপটে দুধকুমার মণ্ডলের মতো ‘ব্যাক বেঞ্চে’ চলে যাওয়া আদি নেতাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁদের টিকিট দিয়েছেন। তাতে আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব অনেকটাই মিটে যায়। ফলে দল ক্ষমতায় এসেছে। তাই বিজেপি সরকারের কাজকর্ম ও দলের ভালো-মন্দ নিয়ে তাঁর আবেগ একটু বেশি থাকাই স্বাভাবিক। হয়তো সেই জায়গা থেকেই দলের নেতা-কর্মীদের বিচ্যুতি দেখলেই তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। সতর্ক করছেন। 
ডিম থেরাপির শুরুতে বিজেপির তাবড় তাবড় নেতানেত্রী যখন উল্লাস করছিলেন তখন একমাত্র শমীকবাবুই তার বিরোধিতা করেছিলেন। প্রকাশ্যে বলেছেন, বদলাতে পারে ডিমের অভিমুখ। 
এমনকি, দলীয় নেতৃত্বের তোলাবাজির বিরুদ্ধে বারেবারে সরব হয়েছেন। কয়েকজনকে শোকজ ও সাসপেন্ড করেছেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, সাসপেনশন প্রত্যাহারের পর তাঁদের কেউ কেউ 
মন্ত্রীর সঙ্গে লেপটে থাকছেন। তা নিয়ে দলের 
কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, ‘ক্লিন চিট’ পেয়ে যাওয়া নেতারা আরও বেশি আগ্রাসী হতে পারেন। কারণ তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, খুঁটির জোর থাকলে কেউ কিছুই করতে পারবে না। তবে এবার শমীকবাবু দলীয় বিধায়কদের একাংশের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ তোলায় পরিস্থিতি কিঞ্চিৎ ঘোরালো হয়েছে। 
এতদিন শমীকবাবু ও তাঁর দল তোলাবাজি ও হামলার দায় চার ঘণ্টায় হওয়া বিজেপির উপর 
চাপিয়ে দিতে পারছিল। অনেকে তা বিশ্বাসও করেছিল। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সর্বজনবিদিত। ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে মারামারি ও খুনোখুনির ঘটনা আকছার ঘটেছে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের হস্তক্ষেপেও মেটেনি। ফলে সরকার 
বদলের পর মারামারি ও তোলাবাজির দায় তৃণমূলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা সহজ ছিল। অনেকে মনে করছিলেন, তৃণমূলের কোণঠাসারা ‘বদলা’ নিচ্ছে।  কিন্তু, এবার খোদ দলের বিধায়কদের বিরুদ্ধে আঙুল তোলায় সেই দাবি ধোপে টিকবে না। 
একুশের নির্বাচনে বিজেপি এমন অনেককেই টিকিট দিয়েছিল যাঁদের গায়ে লেগেছিল তৃণমূলের গন্ধ। টিকিট না পেয়ে বিজেপির প্রার্থী হয়ে জিতে অথবা হেরে ফের পুরানো দল তৃণমূলে ফিরেছিলেন। কিন্তু, এবার তেমনটা হয়নি। আদি বিজেপির পাশাপাশি একুশ সাল থেকে বিজেপি করছেন এমন নেতাদেরই বিজেপি টিকিট দিয়েছে। ফলে বিজেপির ভাবনা এবং আদর্শের সঙ্গে তাঁরা সম্পৃক্ত। সেই সব প্রার্থী নির্বাচিত হয়েই তোলাবাজির জন্য ফিতে নিয়ে ফ্ল্যাট মাপতে ছুটলেন কেন? তাহলে কি প্রার্থী বাছাই ভুল হয়েছে? নাকি দলীয় অনুশাসনের যে ঢাক পেটানো হয়, সবটাই ফাঁকা আওয়াজ!
কথায় আছে, প্রথম রাতেই বেড়াল মারতে 
হয়। এক্ষেত্রে সেই পথ অনুসরণ না করলে বিজেপির বিপদ বাড়বে। তবে, বিজেপি সবচেয়ে বেশি 
বিপাকে পড়েছে দল ভাঙাতে গিয়ে। তৃণমূলের 
২০ জন সাংসদকে ভাঙিয়ে বিজেপির এখন ল্যাজে‑গোবরে অবস্থা। দিল্লির নির্দেশেই যে বাংলায় তৃণমূলকে ভাঙা হয়েছে, তা নিয়ে কারও কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। তবে, সেটা না করলেই ভালো করত। অন্তত বাংলার লাভ হত। কারণ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ৫০ বছর পর কেন্দ্রে এবং বাংলায় একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করছে বলে রাজ্য সরকারের দাবি। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি অনায়াসেই ‘সোনার বাংলা’ গড়ার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারত। কিন্তু, যা চলছে তাতে মনে হচ্ছে, বাংলা গড়ার চেয়ে তৃণমূলকে ভাঙাই বিজেপির লক্ষ্য। 
এরই মধ্যে রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের একটি মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। অগ্নিমিত্রা কর্মী বৈঠকে বিধানসভা ভোটের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর অনুমান, ২০২৯ সালে লোকসভা ভোটের সঙ্গেই হতে পারে এ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন। তাঁর অনুমান সত্যি হলে বুঝতে হবে, ওয়ার্ম আপ করার আগেই বিজেপিকে খেলার জন্য মাঠে নেমে পড়তে হবে। ফলে কাজ করে মানুষের মন জয় করার জন্য রাজ্য সরকার পাঁচ বছর নয়, সময় পাবে তিন বছর। তাই বিরোধীদের শায়েস্তা করা নয়, মানুষকে স্বস্তি দেওয়াই হোক মূল মন্ত্র। 
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শমীকবাবু লাগাতার দলীয় নেতা কর্মীদের সতর্ক করছেন, হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তারজন্য প্রশংসাও পাচ্ছেন। কারণ তিনি মানুষের মনের কথাই বলছেন। শমীকবাবু শুধু রাজ্যসভার সাংসদ নন, দলের রাজ্য সভাপতিও। দুষ্টের দমন করলে আম জনতার চোখে তিনি হতেন ‘নায়ক’। বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসাবে তাঁর সামনে সেই সুযোগ ছিল। তিনি ‘অপরাধী’-দের সতর্ক করলেন। কিন্তু, কঠোর হলেন না। তাই শমীকবাবু ‘জাগ্রত বিবেক’ হয়েই থেকে গেলেন, ‘নায়ক’ হতে পারলেন না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ