শুভজিৎ অধিকারী: তুমি কি দেখোনি? আমি তো দেখেছি, এই সমাজের ধর্ষিতা বোনের জীবন্ত লাশ। তুমি কি শোনোনি? আমি তো শুনেছি সেই ধর্ষিতা কিশোরীর করুণ আর্তনাদ!
শুভজিৎ অধিকারী: তুমি কি দেখোনি? আমি তো দেখেছি, এই সমাজের ধর্ষিতা বোনের জীবন্ত লাশ। তুমি কি শোনোনি? আমি তো শুনেছি সেই ধর্ষিতা কিশোরীর করুণ আর্তনাদ!
বারুইপুর কাণ্ড নিয়ে তখন উত্তাল গোটা বাংলা। সোশ্যাল মিডিয়ায় রোলিং হচ্ছে নানা প্রতিবাদের ভাষা। স্ক্রল করতে করতে চোখ আটকে গেল এই কয়েকটা লাইনে। নিশ্চয় কোনো এক কবির লেখা। সন্দেহ নেই, কাব্যিক ভাষায় বর্তমান সমাজকে নির্মম চপেটাঘাত করেছেন তিনি। সত্যিই তো, আজ আমরা এমন একটা সমাজে বাস করছি, যেখানে নিষ্পাপ শিশুদের অবলীলায় খুন, পাশবিক অত্যাচারের পর বোন কিংবা মায়েদের হত্যা, বিদ্বেষ-বিষে সম্প্রীতিকে নিধন, অসংবেদনশীল আস্ফালনের ঘটনা ছাড়া সুন্দর একটা ঝকঝকে সকাল পাওয়া বড়োই দুষ্কর! আমরা সমাজবদ্ধ জীব। এসব দেখছি, শুনছি আর গিলছি। হজমও করে নিচ্ছি। তাই, চোখের সামনে পড়শি কোনো বোনের উপর, মায়ের উপর অমানুষিক নির্যাতন চললে সেখান থেকে দ্রুত কেটে পড়ছি। অথবা, দরজা-জানলায় খিল আটকে দিচ্ছি। দুর্ঘটনার কবলে পড়া কোনো ব্যক্তি কাতরাতে কাতরাতে জল চাইলে, আমাদেরই কেউ হয়তো বা সেলফি তুলছে। প্রায় সর্বত্রই হীন তৎপরতা আর অবক্ষয়ের চিহ্ন। ঘুণ ধরেছে সমাজের মূল কাঠামো—মানবিকতায়।
অথচ, এমন সমাজ তো কাম্য ছিল না। মানুষের জঙ্গল-জীবনে গোষ্ঠীবদ্ধ সংগ্রাম থেকেই সমাজের জন্ম। যেখানে একে অপরের দুঃখ-যন্ত্রণায় সমব্যথী হবে। আপদে-বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ভালোবাসার একটা নিবিড় বন্ধন থাকবে সবার। সম্প্রীতি, সৌহার্দ বজায় থাকবে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এসব শুনতে কেমন যেন ‘সোনার পাথর বাটি’ বলে ভ্রম হয়। অহরহ ঘটে চলা অপরাধ সমষ্টিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে দাগিয়ে দিতে মন সায় দিয়ে বসে। আত্মীয় আত্মীয়ের শত্রু হয়ে উঠবে। বন্ধু বন্ধুর ক্ষতি করবে। পড়শি পড়শিদের হিংসা করবে। রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে দাড়িওয়ালা কোনো লোক দেখলে একদল চ্যাংড়া ছেলে ছুটে এসে ধর্ম পরিচয় জানতে শাসাবে। মেয়েকে কর্মক্ষেত্রে কিংবা স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে বাবা-মা উৎকণ্ঠায় থাকবে! বোনের হাতে সকালে রাখি বেঁধে হয়তো বা রাতে অত্যাচার করবে! এমন সবকিছুকেই আমরা চলমান জীবনস্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে ‘স্বাভাবিক’ বলেই ধরে নিচ্ছি। ভাবখানা এমন যেন এসব তো হওয়ারই কথা। অথচ, সমাজের পুনর্গঠন নিয়ে সুশীল চিন্তাভাবনা নেই অনেকেরই মধ্যে। ফল যা হওয়ার তাই। আজকের সমাজ থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া, মমতা, মানবতা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা। স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত আলগা হয়ে পড়ছে পারস্পারিক সম্পর্কের বাঁধন। তৈরি হচ্ছে অসুস্থ অমানবিক, ঘোর স্বার্থপর একটা সমাজ।
এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আজ পবিত্র রাখি বন্ধন উৎসব। পচতে থাকা এই সমাজ ব্যবস্থা রাখি বন্ধন বা রক্ষা বন্ধনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কতখানি আত্মস্থ করতে পারবে, সেটাই বড়ো প্রশ্ন। এ নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এড়িয়ে আজ অন্তত এইটুকু আশা তো করতেই পারি, ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে বোন একটু নিশ্চিন্তে বাড়ির বাইরে বেরবে। বিপদে পড়লে ভাই তাকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করবে। এক সম্প্রদায় আর এক সম্প্রদায়ের হাতে রাখি বেঁধে শান্তিতে সহাবস্থান করবে। প্রতিজ্ঞা করবে কেউ কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ-বিষ ছড়িয়ে বিভাজন করবে না। তাই আজকের রাখি বন্ধন এমন এক নৈতিক আদর্শসংবলিত সমাজ গঠনে আমাদের অনুপ্রাণিত করুক, যে সমাজে কোনো অনাচার থাকবে না। তবেই না রক্ষা বন্ধনের সার্থকতা। তা না হলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হোক কিংবা পার্বণ পালনের বাধ্যবাধকতায় হোক—রাখি বন্ধন উৎসব পালনে বদল হবে না সমাজের। হৃদয়ে পুষে রাখা হিংসা, ঘৃণা, অসংবেদনশীল মননে রাখি পরানোর মধ্যে মানবিক বন্ধনকে দৃঢ় করা যায় না।
সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে বেদ-পুরাণ-উপনিষদ, মহাভারত সহ একাধিক হিন্দু শাস্ত্র। পৌরাণিক যুগ থেকে প্রাক মধ্যযুগ। মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ আমল—যখনই সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট ও ধর্মীয় গ্লানি ভারতে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তখনই এক গোছা পবিত্র সুতো হয়ে উঠেছে মুক্তির সোপান। আর সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে নারীরাই।
ভারতীয় সমাজে একজন নারী সংকল্প শক্তি হিসাবে স্বীকৃত। অর্থাৎ, ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়সংকল্পের ক্ষমতার প্রতীক হল নারী। এই শক্তি দিয়েই গোটা নারীজাতি ধারণ করে রেখেছে সৃষ্টিকে। আমাদের একাধিক হিন্দুশাস্ত্রে নারীকে তাই ‘প্রকৃতি’ও বলা হয়ে থাকে। সেই নারীশক্তি পুরুষজাতিরও যাবতীয় ক্ষমতার আধার। প্রাচীনকালে রক্ষা বন্ধন এমনই তাৎপর্য বহন করে। একজন নারী তাঁর ভাই কিংবা স্বামীর কব্জিতে পবিত্র সুতো বেঁধে তাঁকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করতেন। বেদ-উপনিষদ সহ আমাদের একাধিক পুরাণে এ নিয়ে নানা কিংবদন্তি কাহিনি রয়েছে। ইন্দ্রের স্ত্রী শচীর কথাই ধরুন। অসুর রাজা মহাবলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেবরাজ ইন্দ্র। ঠিক তখনই অসুর বিনাশের সংকল্প নিয়ে স্বামী দেবরাজের হাতে রাখি পরিয়ে দিয়েছিলেন শচী। কংস ও তাঁর অনুচররা বারবার আক্রমণ করে ছোট্ট কৃষ্ণকে মেরে ফেলতে চাইছেন। সব বিপদ থেকে ছেলেকে রক্ষা করতে মা যশোদা একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের হাতে। বিপন্মুক্ত শ্রীকৃষ্ণ বড়ো হলেন। অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম সংস্থাপনে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিশুপাল ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পিসির ছেলে। তা হলেও তিনি মগধের সম্রাট জরাসন্ধের অন্যতম প্রধান মিত্র হয়ে উঠলেন। পাণ্ডব-বিরোধী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে একের পর এক অন্যায় করে যেতে লাগলেন। একদিন রাজসূয় যজ্ঞে আর্যাবর্তের সমস্ত রাজার সামনে শিশুপালের ১০০টি অন্যায় ক্ষমা করেও শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন দমে যাওয়ার পাত্র নন পিসতুতো ভাই। ১০১তম অপরাধ করতেই শিশুপালকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন তিনি। ছুড়লেন মধুসূদন চক্র। সেই চক্রে শ্রীকৃষ্ণের আঙুলের একটা অংশ কেটে যায়। উদভ্রান্তের মতো ছুটে এলেন দ্রৌপদী। নিজের দামি শাড়ি ছিঁড়ে এক টুকরো কাপড় শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে জড়িয়ে দিলেন। রক্তপাত বন্ধ হল। শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘বিনিময়ে তুমি আমার কাছে কী চাও।’ চমৎকার জবাব দিলেন দ্রৌপদী। ‘কিছুই না, প্রভু। আমি চাই আমার জীবনে আপনার সর্বদা পবিত্র উপস্থিতি।’ পরে, কৌরবরা প্রকাশ্য সভাগৃহে দ্রৌপদীর শাড়ি খুলে তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করলে ত্রাতা হয়ে হাজির হলেন শ্রীকৃষ্ণ। দ্রৌপদীর সম্ভ্রম বাঁচিয়ে মহাভারতকে উপহার দিলেন ভ্রাতা-ভগিনীর মধুর সম্পর্কের এক অনন্য উপাখ্যান।
মধ্যযুগীয় ভারতেও রাখির মাহাত্ম্য ছিল বিরাট। বিশেষ করে রাজনৈতিক মৈত্রীর মাধ্যম হিসাবে রাখি পাঠানো চল ছিল। সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ সম্ভবত মোগল সম্রাট হুমায়ুন ও মেবারের রানি কর্ণাবতীর কাহিনি। তখন মেবারের সিংহাসনে রানি কর্ণাবতী। গুজরাতের সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর রাজপুত সাম্রাজ্য দখলের অভিপ্রায় নিয়ে আক্রমণ করেন। আগেই কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রমাদিত্যকে তিনি পরাজিত করেছেন। চিতোরগড় দুর্গে বন্দি করে রেখেছেন কর্ণাবতীকে। সেই সময় মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি হুমায়ুন। অসহায় বিধবা রানি কর্ণাবতী আগ্রাতে তাঁর কাছে একটি পত্র পাঠান। সেখানে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে একটি রাখিও প্রেরণ করেন বলে কথিত। হুমায়ুন তখন বাংলা-বিজয়ে রওনা হচ্ছিলেন। কর্ণাবতীর পত্র ও রাখি পাওয়া মাত্রই সিদ্ধান্ত বদল করেন। সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তিনি চিতোরগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। বাহাদুর শাহ বেগতিক বুঝে হুমায়ুনকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করতে থাকেন। ফলে, চিতোরগড় পৌঁছতে তাঁর দেরি হয়ে যায়। এদিকে, বাহাদুর শাহের সৈন্যদের হাতে নিগৃহীত ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে রানি কর্ণাবতী আগুনে ঝাঁপিয়ে ‘জওহর’ ব্রত পালন (সম্মান রক্ষার্থে আত্মহত্যা) করেন। হুমায়ুন চিতোরগড় পৌঁছে দেখেন, সব শেষ! বোন কর্ণাবতীকে বাঁচাতে না পেরে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন তিনি। বাহাদুর শাহকেও সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার সংকল্প নেন। অবশেষে মানডু সাম্রাজ্য থেকে বাহাদুরকে উৎখাত করে বোন কর্ণাবতীর আত্মহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন হুমায়ুন। হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতা-ভগিনীর এই রাখি বন্ধন ভারতে আজও সম্প্রীতির লোকগাথা হয়ে থেকে গিয়েছে।
ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গ চক্রান্ত ঠেকাতেও রাখি বন্ধন উৎসবকেই সম্প্রীতি রক্ষার মোক্ষম অস্ত্র বানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সে দিনের সেই রাখি বন্ধন উৎসবের খুব সুন্দর মুহূর্ত আমাদের কাছে তুলে এনেছেন গুরুদেবের স্নেহধন্য রানি চন্দ। তাঁর সম্পাদিত ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণে তিনি লিখছেন—‘রবিকাকা একদিন বললেন, রাখি বন্ধন উৎসব করতে হবে আমাদের। সবার হাতে রাখি পরাতে হবে...।’ ১৯০৫ সালের রাখি বন্ধনের দিন ছিল ১৬ অক্টোবর। সেদিন গুরুদেব খুব ভোর থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। অবনঠাকুরের কথায়, ‘রবিকাকা বললেন সামনেই জগন্নাথ ঘাট। সবাই হেঁটে যাব। গাড়িঘোড়া নয়। গঙ্গাস্নান সেরে সবার হাতে রাখি পরাব। সেই মতো গঙ্গাস্নানে যাওয়া হল...। মেয়েরা খৈ ছড়াচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম। যেন একটা শোভাযাত্রা।’ ঘাট থেকে ফেরার পথে রাখি পরাতে পরাতে আসছেন রবিঠাকুর। অবনঠাকুর বর্ণনা দিচ্ছেন—‘পাথুরেঘাটা দিয়ে আসছি, দেখি বীরু মল্লিকের আস্তাবলে কতকগুলো সহিসের হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন রবিকাকা। রাখি পরিয়ে আবার কোলাকুলি! সহিসগুলো তো হতভম্ব। হঠাৎই রবিকাকার খেয়াল হল চিৎপুরের বড়ো মসজিদে গিয়ে সবাইকে রাখি পরাবেন। হুকুম হল চলো সবাই। রওনা হলুম সবাই। গেলুম মসজিদের ভিতরে। মৌলবীদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলুম...।’
সম্প্রীতির এই পথ পরিক্রমায় সেদিন কবিগুরুর কণ্ঠে শুধু ধ্বনিত হচ্ছিল—‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।’ গলা মিলিয়েছিল গোটা বঙ্গদেশ।
রবি ঠাকুর পেরেছিলেন রাখির কয়েকটা সুতোয় সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বকে বাঁধতে। শিক্ষা দিয়েছিলেন, জীবনের মূল সাধনা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের চেষ্টা। আর সেই মনুষ্যত্বের সঙ্গে, মানবতা, নৈতিকতা, সংবেদনশীলতার সম্পর্ক চিরন্তন। সবাইকে রাখি পরিয়ে সেই মনুষ্যত্ব অর্জনের দিন আজ। উত্তম আদর্শে দীক্ষা নেওয়ার দিন। বিদ্বেষ ছেড়ে সম্প্রীতি রক্ষার দিন। মা-বোনেদের সম্ভ্রম বাঁচানোর শপথের দিন। তাই, রাখির আর এক নাম ‘সুরক্ষা কবচ’।