Bartaman Logo
২৭ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মক্কা চুক্তি: ভারতকে সতর্ক থাকতে হবে

বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি চমক একদম পছন্দ করে না, তবে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ছিল আরব আমিরশাহি (ইউএই) ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলির জন্য এক বিরাট চমক!

মক্কা চুক্তি: ভারতকে সতর্ক থাকতে হবে
  • ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি চমক একদম পছন্দ করে না, তবে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ছিল আরব আমিরশাহি (ইউএই) ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলির জন্য এক বিরাট চমক!

Advertisement

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের এই ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, একটি দেশের উপর আক্রমণ হলে, তিন দেশই একসঙ্গে তার জবাব দেবে। পারস্পরিক প্রতিরক্ষার এই বিশেষ প্রতিশ্রুতি পশ্চিমের সামরিক জোট ন্যাটোর বিখ্যাত ‘৫ নম্বর অনুচ্ছেদ’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ধারার কারণেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলা শুরু করেছেন। সৌদির অর্থশক্তি, তুরস্কের ন্যাটো মানের প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা— সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট আত্মপ্রকাশ করেছে।
ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বলছিল, তারা ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে একটি জোট তৈরি করতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র। ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই জোটকে আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসে। যেটা আগে গোপনে চলত, সেটা এখন একেবারে প্রকাশ্যে। ইতিমধ্যে আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) আব্রাহাম আকোর্ডে সই করেছেন। ইরান যুদ্ধের আগুনে সেই চুক্তির পরীক্ষাও হয়ে গিয়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে আমিরশাহি যখন কোণঠাসা, ইজরায়েল তখন আবুধাবি রক্ষায় তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।
স্বপ্ন ছিল, শত্রুদের একবার পিষে ফেলতে পারলে ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল জোট তৈরি হবে। আর ইজরায়েল বসবে তেল, গ্যাস, অর্থ ও প্রযুক্তির সেই সংযোগস্থলের কেন্দ্রে। এই অঞ্চলের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে। এই পরিকল্পনায় মিশর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তারা হয় নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হয়ে যাবে, নয়তো ধর্মীয় ও জাতিগত উপদলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আমিরশাহি ও ইজরায়েল— উভয়ের স্বার্থই ছিল অভিন্ন। তারা ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে চেয়েছিল। এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে ব্যবহার করে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে নিজেদের জলপথের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিল। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঠিক এই প্রকল্পেরই এক মারাত্মক প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনই দাবি সংবাদসংস্থা মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট-এর।
এর প্রথম প্রভাব পড়বে রিয়াধ ও আবুধাবির মধ্যে। তাদের কৌশলগত বিরোধ আরও গভীর ও তীব্র হবে। গত ডিসেম্বরে আমিরশাহির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল খালেক আবদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে সৌদির সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য আছে। সংঘাতের কারণে তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সহযোগীদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে, কিন্তু তারা আবার এক হয়েও যেতে পারে।’ কিন্তু জানুয়ারি আসতে না আসতেই আবদুল খালেক আবদুল্লাহর সুর বদলে যায়। তিনি লিখলেন, ‘সৌদি আরব আর আমিরশাহির মধ্যে দূরত্ব কেবল ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা আরও গভীর।’ ঠিক সেই সময় সৌদি বিদেশমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বলেছিলেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর’। এরপরই আরব আমিরশাহি তাদের দেশে আল-আরাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।
গত মাসে অবশ্য কিছুটা সম্পর্কের উন্নতি দেখা গিয়েছিল। সৌদি রাজকীয় উপদেষ্টা তুর্কি আল শেখ একটি ছবি শেয়ার করেন। সেখানে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সলমন এবং আরব আমিরশাহির ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল: ‘সৌদি আরব ও আরব আমিরশাহি: দুই ভাইয়ের গল্প এবং এক গভীর অংশীদারত্ব’। কিন্তু এই ঐক্য বেশি দিন টেকেনি।
গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যার জবাবে একটি মুসলিম জোট গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদান। আর আড়ালে থেকে চতুর চাল চেলেছেন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক—ক্রাউন প্রিন্স মহম্মদ বিন সলমন (এমবিএস)। মক্কা চুক্তি তারই প্রতিফলন। মক্কা চুক্তি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন আবদুল খালেক আবদুল্লাহ। তিনি লিখলেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা এখন ভালো অবস্থায় নেই। প্রধান দেশগুলি নিজ ঘরের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে। নতুন আঞ্চলিক অক্ষ আর সামরিক জোট তৈরির এই দৌড় পশ্চিম এশিয়াকে দুর্বল করে দিচ্ছে।’ জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুল রহমান বিন মুসাইদ লিখলেন, ‘সমস্যা কোথায়, জনাব? যেকোনো দেশের কি নিজের পছন্দমতো চুক্তি করার অধিকার নেই? এটি কি প্রতিটি দেশের সার্বভৌম বিষয় নয়? নাকি সৌদি আরবের বেলাতেই এই যুক্তি খাটবে না!’
নতুন জোটের সামরিক ভিত্তি শক্ত। পাকিস্তানের রয়েছে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং পারমাণবিক অস্ত্র। তুরস্কের রয়েছে দ্বিতীয় শক্তিশালী বাহিনী, ন্যাটো অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী নৌবাহিনী ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। দুই দেশেই বড়ো বিমানবাহিনী আছে, যদিও কিছু পুরানো। সৌদি আরবের বিমানবাহিনী মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত গোয়েন্দা, আকাশ প্রতিরক্ষা ও নির্ভুল হামলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। অর্থনীতিতেও সৌদি সবচেয়ে বড়ো শক্তি, বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক এবং ওপেকের নেতা। তাদের তেল উৎপাদন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সৌদি আরব আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।
আমেরিকার কল্যাণে ইজরায়েলের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা তাদের নেই। তা সত্ত্বেও ওই অস্ত্র তারা ব্যবহার করে। কিন্তু তারা সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প গোটা উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম। গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে বড়ো ধরনের পরিকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস আর হিজবুল্লাকে নিশ্চিহ্ন করার সামরিক লক্ষ্যপূরণ না হওয়ায় ও ট্রাম্পের চাপ সামলাতে গিয়ে ইজরায়েল কেবল নিজের অবস্থান কাঁটাতারে ঘিরেই শক্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে গোটা আরব দুনিয়া নিজেদের সুরক্ষার জন্য মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। প্রশ্ন হল, তবে কি পশ্চিম এশিয়ায় আরও একটা রণাঙ্গন তৈরি হচ্ছে? 
মক্কা চুক্তির পর ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বাড়তি উদ্বেগ স্বাভাবিক। কয়েক মাস ধরে শীর্ষ ইজরায়েলি কর্তারা সতর্ক করে আসছিলেন। বারবার বলছিলেন, পশ্চিম এশিয়ায় নতুন ‘সুন্নি’ অক্ষ গড়ে উঠছে, যা আগামী দিনে ইজরায়েলের প্রধান শত্রু হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের দাবি, সৌদি ও কাতারের অর্থে পাকিস্তান ও তুরস্কের অংশীদারত্ব ইজরায়েলের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে। তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলি ইতিমধ্যে গ্রিসকে এই নতুন জোটের প্রথম টার্গেট বলে চিহ্নিত করেছে। ভূমধ্যসাগরে গ্রিস এখন ইজরায়েলের প্রধান মিত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকে মক্কা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বললেও এখনই ন্যাটোর মতো কোনো কঠোর সামরিক জোট তৈরি হচ্ছে না। কারণ, ন্যাটোর মতো এখানে কোনো একক অভিন্ন শত্রু নেই। সৌদির প্রধান চিন্তা ইরানকে নিয়ে। তুরস্কের মূল অগ্রাধিকার সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর। মিশরের নজর গাজা ও লোহিত সাগরের দিকে। পাকিস্তানের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারত। কাগজে-কলমে এই চুক্তি যতই শক্তিশালী দেখাক, বাস্তবে এর প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন। কারণ, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চিরন্তন যুদ্ধে সৌদি আরব কখনো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে যায়নি। তারা নিজেদের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী মনে করে। প্রকৃতপক্ষে ভারত সৌদির বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। অন্যদিকে পাকিস্তান সৌদির কাছ থেকে কেবল অর্থনৈতিক সাহায্য পায়। একইভাবে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে বিরোধেও সৌদির পক্ষ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়ানবুর তেল শোধনাগারের দিকে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছেন সৌদিতে কর্মরত গ্রিক সামরিক সদস্যরা। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়— ইজরায়েলের আতঙ্ক কিংবা সৌদির উপর ‘ইরানি হুমকি’র বাইরে এই জোটের গুরুত্ব কতটুকু? এটা কি নিছকই প্রতীকী পদক্ষেপ— শত্রুদের এই বার্তা দেওয়া যে, দ্বিপাক্ষিক বিরোধ এখন বহুমুখী রূপ নেবে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে?
অন্যদিকে মক্কা চুক্তি এখন পাকিস্তানকেই এক নতুন অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক থাকলেও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠীও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-সমীকরণ। বিশ্লেষকরা জানতে চান, ভবিষ্যতে সৌদির তেল পরিকাঠামো আক্রান্ত হলে পাকিস্তান কি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে, নাকি ২০১৫ সালের মতো নিরপেক্ষতার নীতিতে অনড় থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এই জোট কীভাবে বিকশিত হয়, ভারতকে তা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজের স্বার্থেই!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ