Bartaman Logo
২৬ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শাসকের হুমকি বরদাস্ত নয়

ভোটে কোনো দল বা ব্যক্তি হারতেই পারে। মানুষ প্রত্যাখ্যান করতেই পারে। নিঃশব্দ ক্ষমতা বদলই ভারতীয় গণতন্ত্র এবং সমাজব্যবস্থার মাহাত্ম্যকে অন্য আর পাঁচটা দেশের থেকে আমাদের আলাদা করে দেয়।

শাসকের হুমকি বরদাস্ত নয়
  • ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভোটে কোনো দল বা ব্যক্তি হারতেই পারে। মানুষ প্রত্যাখ্যান করতেই পারে। নিঃশব্দ ক্ষমতা বদলই ভারতীয় গণতন্ত্র এবং সমাজব্যবস্থার মাহাত্ম্যকে অন্য আর পাঁচটা দেশের থেকে আমাদের আলাদা করে দেয়। বিশেষত্ব প্রদান করে। এর অন্যথা হলে প্রমাদ গুনতে হয়। রাজনীতিতে আকচাআকচি থাকবেই। বিতর্ক, সমালোচনা, পৃথক দৃষ্টিভঙ্গিই এই ব্যবস্থার শক্তি। তা বলে আজকের শাসক আগের ১৫ বছর যিনি শাসন ক্ষমতায় ছিলেন তাঁকে হুমকি দিতে পারেন না। একথা বলতে পারেন না, আপনাকে রাস্তায় বেরতে হবে না। রাস্তায় যাতে বেরতে না পারেন তার ব্যবস্থা করব। এই হুমকি চমকানি অবিলম্বে পরিত্যাজ্য। অভিযোগ থাকলে আইন আদালত আছে। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে বিচার হবে। সরকারের এজেন্সিগুলো ভীমরবে ময়দানে অপেক্ষায়। তারা তদন্ত করুক, কিন্তু শাস্তি দেওয়ার হলে আদালত দেবে। কোনো দল কিংবা সরকারের কারো বিচার করার এক্তিয়ার নেই। এটাই ভারতের মহান গণতন্ত্র। ক্ষমতার আসনে বসে যদি কারও মতিভ্রম হয়, এই সামান্য কথাগুলি তিনি ভুলে যান, তাহলে বুঝতে হবে সর্বনাশের আর বিশেষ বাকি নেই। ক্ষমতা মাথায় চড়েছে। পরিণতি কী হতে পারে তা হয়তো ভাবছেন না আজকের শাসক? সমাজে কী বার্তা যাচ্ছে? যা সরকারের পক্ষে সুখকর হতে পারে না।

Advertisement

২০০৪ সালে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়িজি। গেরুয়া ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় সফল নেতা। বাজপেয়ির পরাজয়ের ফেরে নতুন প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। নাকি ‘একসিডেন্টাল’ প্রধানমন্ত্রী! কই বাজপেয়িজি বাড়ি থেকে বেরতে পারবেন না বলে হুমকি তো কেউ দেননি। মতবিরোধ ছিল কিন্তু পারস্পরিক সম্মান নষ্ট হয়নি কখনো। ২০১১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে হারিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩৪ বছর পর বাংলায় পালাবদল। হাজার তিক্ততা ছিল, কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি করব যে আপনি বেরতে পারবেন না— এমন শব্দ মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে বেরয়নি। পথে ঘাটে ডিম ছোড়াছুড়ির খেলাও কেউ দেখেনি।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছেন। তাঁর সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সব কথার কথা হয়েই থেকে যাচ্ছে! শেষে আইন শাসকের ইচ্ছে আর খামখেয়ালিপনার কাছেই বন্দি থেকে যাচ্ছে বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য। ক্ষমতার অদ্ভুত চশমা চোখে এঁটে শাসক বলছে যাদবপুরে কিচ্ছুটি হয়নি। সব মিথ্যা! অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ অতিরঞ্জিত প্রচার। আরও বলছেন, ১৫ বছর রাজ্য শাসন করা মুখ্যমন্ত্রী বাড়ি থেকে বেরতে পারবেন না এমন অবস্থা তিনি করবেন। তাঁর ক্ষমতা বলিহারি! তিনি আরও সফল হোন। কাশ্মীর থেকে কাকদ্বীপ তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু যে নির্দেশ, যে বিচার আদালতের করার কথা তা তিনি বুক ফুলিয়ে করার আস্ফালন করলে তো লুণ্ঠিত হয় সংবিধান।  আঘাতপ্রাপ্ত হয় গণতন্ত্র। চেয়ারে বসে এই ভুলটা করা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, গোটা দেশের ক্ষতি। কার্যত ক্ষমতা যে কতটা বিষম ভয়ংকর বস্তু তা আর একবার টের পাচ্ছে বাংলার মানুষ। তোলাবাজি দখলদারি যে চলছে তা বিজেপির নেতারাই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রকাশ্যে। দলের এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর হিস্‌সার গণ্ডগোলও মারামারিতে বদলে যেতে বাকি নেই। তাতে ভাঙচুর, রক্তপাত, প্রাণহানিও হচ্ছে জেলায় জেলায়। দেশে অন্যতম পাঁচটা প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি যাদবপুর। তা আক্রান্ত হয়েছে গেরুয়া শক্তির হাতে। ভাবটা এমন ২০৮ জন এমএলএ যখন গেরুয়া দলের হাতে তাহলে সামান্য একটা দু’বিঘা চার ডেসিমাল বিশ্ববিদ্যালয় বাকি থাকে কেন? এখানেই শেষ নয়, যেখানে ভোটের প্রচারে শাসকের আইন খতম করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, ক্ষমতা পেয়ে আর কেউ তা মনে রাখতে চান না। সরকারের সর্বোচ্চ আসন থেকে শুরু করে সামান্য একজন বিধায়ক, দুজনেই এই সরল সত্যটা বিস্মৃত হচ্ছেন বেমালুম! মানুষ কিন্তু এ সবই দেখছে। তাদের নির্বোধ ভাবাটা ঠিক নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ