যত দিন যাচ্ছে, সরকারের বয়স যত বাড়ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি তত বেআব্রু হচ্ছে! বিশেষত একটা দেশের যুবসমাজের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে মূল যে চাহিদা, সেই শিক্ষা ও শিক্ষান্তে স্থায়ী চাকরির গালভরা প্রতিশ্রুতিগুলি যে নির্মমভাবে উপেক্ষা করে চলেছে বারো বছরের মোদি সরকার— বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষাতেই সেই ভয়াবহ ছবি উঠে এসেছে। বাস্তব সত্য হল, বেকারত্ব ও শূন্যপদ—দুই-ই ঊর্ধ্বগতিতে ছুটছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ছবিটা আরও ভয়াবহ। এসবের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তরমন্তরে জেন-জি বিক্ষোভের সাক্ষী থেকেছে গোটা দেশ। সেই আগুনে-বিক্ষোভ ছড়িয়েছে ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে। কিন্তু এতে পরিস্থিতি বদলাবে, সেই সম্ভাবনা কম। কারণ দেশের এই গভীর সমস্যার বিষয়টি জেনেও সরকার যেন জেগে ঘুমিয়ে আছে!
মুখে তারুণ্যের জয়গান গাইলেও যুবসমাজের জন্য যে মোদি সরকার আসলে ‘কবর’ খুঁড়ে রেখেছে, তা বলাই বাহুল্য। ধরা যাক কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে শূন্যপদের কথা। তথ্য জানার অধিকার আইনে এক ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার জানিয়েছে, গত এক দশকে কেন্দ্রের চাকরিতে শূন্যপদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ২০১৫ সালে তা ছিল ৪ লক্ষ ২১ হাজার। ২০২৪-এ তা হয়েছে ৮ লক্ষ ২৪ হাজার। শতাংশের হিসাবে ১১.৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ শতাংশ। শূন্যপদের এই জেড গতি রেল, প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য মন্ত্রক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর অফিস পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বা ব্যাংকের হিসাব নেই। তা যোগ করলে সংখ্যাটা ১০ লক্ষে পৌঁছাবে। সরকার জানিয়েছে, কেন্দ্রের কম-বেশি ৭৮টি মন্ত্রকে অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ। ২০২৪-এর ১ মার্চ-এ কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লক্ষ। বাকি পদগুলি শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি পদের মধ্যে একটি ফাঁকা! রিপোর্ট অনুযায়ী শূন্যের তালিকায় রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের ২৮৭টি (৩৫.৭৪ শতাংশ), প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ১২৬টি (২৮.৫৭ শতাংশ) পদ খালি। আবার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে প্রায় ২ লক্ষ ৪২ হাজার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে ১ লক্ষ ১১ হাজার পদ খালি। অবাক করার মতো তথ্য হল, ২০১৫-তে রেল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রকে কোনো শূন্যপদ ছিল না। দশ বছরে মোদি সরকারের ‘কৃপায়’ এখন এই দুই মন্ত্রকে শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ লক্ষ ৪০ হাজার এবং প্রায় ১৬০০। এই সরকারের অপদার্থতার আরেক নজির হল, পূরণ হওয়া পদের প্রায় ৫০ শতাংশই চুক্তিভিত্তিক কর্মী। মানে প্রতি দু’জনে একজন স্থায়ী ও একজন চুক্তিভিত্তিক। বেকারত্বের জ্বালায় দেশের যুবশক্তির একটা বড়ো অংশ যখন জর্জরিত তখন শূন্যপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি উদাসীনতা জানান দিচ্ছে সরকারের কাছে বাগাড়ম্বর আর ক্ষমতা দখলের রাজনীতিটাই মুখ্য। যুবশক্তি রসাতলে গেলেও এই শাসক নির্বিকার!
শূন্যপদের মতো দেশে বেকারত্বের ছবিটাও ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন আইএলও-র ২০২৪-এ প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ভারতে কর্মহীনদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই যুবসমাজের প্রতিনিধি। কর্মহীনদের মধ্যে যুবদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। ২০০০ সালে শিক্ষিত যুবকদের ৫৪ শতাংশ ছিলেন কর্মহীন। ২০২২-এ তা বেড়ে হয় ৬৬ শতাংশ। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের বেহাল দশার ছবিটা এবার সামনে এনেছে নীতি আয়োগও। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছরের প্রায় ৯ কোটি যুবক-যুবতী কোনো পড়াশোনা করছে না, কোনো প্রশিক্ষণ নিচ্ছে না, কোনো কাজের সঙ্গেও যুক্ত নয়। একরকম কর্মহীন অলস জীবন কাটাচ্ছে জেন-জি-র এই অংশ। এর কারণও ব্যাখ্যা করে নীতি আয়োগ বলেছে, ব্যবহারিক শিক্ষা ও শিল্প সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ শিক্ষিত এই তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই প্রায় ৯ কোটি কর্মহীনের পাশাপাশি যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁরাও যে হতাশ, তাও বলেছে নীতি আয়োগ। দেখা যাচ্ছে, সিংহভাগই শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কারণ, স্নাতক স্তরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি পড়ুয়ার মধ্যে বি.এ, বি.কম, বিএসসি-র মতো সাধারণ ডিগ্রি কোর্সে পাশ করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২ কোটির বেশি। এই কোর্সগুলির সিলেবাসে কর্মসংস্থানের উপযোগী কোনো পাঠ্যক্রম বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে না। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও এদের জন্য উপযুক্ত চাকরির দরজা খুলছে না। অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনার অভাব প্রকট। দেশের যুবশক্তিকে সঠিক দিশা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অথচ প্রচারের ফানুস উড়িয়ে স্বপ্ন দেখাতে এই সরকারের জুড়ি মেলা ভার। বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি, নতুন বিকশিত ভারত, আচ্ছে দিনের স্বপ্ন এখন অন্তঃসারশূন্য জুমলা হয়ে ফিরে এসেছে কোটি কোটি বেকারের সামনে। হেলদোল নেই সরকারের। ঘটনাও হল, ‘স্টিল ইন্ডিয়া’র মতো বড়ো বড়ো ইভেন্টের নামে ফি বছর কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও বাস্তবে শিক্ষিত তরুণদের কাছে প্রশিক্ষণের সুযোগ কতটা সীমিত, নীতি আয়োগের তথ্যই তার প্রমাণ। এখন দেখার, জেন-জি-র আন্দোলন এই সরকারের ঘুম ভাঙাতে পারে কি না।