প্রীতম দাশগুপ্ত: ‘বন্দে মাতরম।’ এটি শুধু একটি শব্দবন্ধ নয়। গান নয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই দুটি শব্দ ছিল প্রতিবাদের প্রতীক। ক্ষুদিরাম থেকে মাস্টারদা—ফাঁসির মঞ্চে যাঁরা জীবনের জয়গান গেয়েছিলেন, তাঁদের মন্ত্রই ছিল এই দু’টি শব্দ। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের সেই মন্ত্রই আজ বিতর্কে। স্বদেশি যুগে ‘বন্দে মাতরম’ ছিল আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমের প্রতীক। কিন্তু আজ সেই গানই রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে। প্রশ্নটা, তাই শুধু একটি গান নিয়ে নয়। প্রশ্ন হল, আমার দেশপ্রেমের সংজ্ঞা কে ঠিক করে দেবে? সরকার আমাকে বলে দেবে, কোন গান কতটা গাইলে আমি দেশপ্রেমী? বন্দে মাতরমের দু’টি স্তবক গাইলে তুমি দেশদ্রোহী। আর ছ’টি স্তবক গাইলেই তুমি দেশপ্রেমী।
দিন কয়েক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো দেখলাম। পুরানো ভিডিয়ো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। বিহার বিজেপির তৎকালীন মুখপাত্র নবীন কুমার সিং বন্দে মাতরম গাইতে গিয়ে রীতিমতো হোঁচট খাচ্ছেন। বিভিন্ন রিলে দেখা যাচ্ছে, নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করা ব্যক্তিরা বলছেন, গানটির পুরোটাই গাইতে হবে। কিন্তু যখন তাঁদের গাইতে বলা হচ্ছে, রীতিমতো পালিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ধবপন্থী শিবসেনার নেতা সঞ্জয় রাউত বলেছেন, আগে প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বন্দে মাতরমের ছ’টি স্তবক টেলিপ্রম্পটার ছাড়া গেয়ে দেখান। আমিও অপেক্ষায় আছি, কবে মোদি-শাহের গলায় শুনব, ‘সপ্তকোটীকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে/দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃতখর-করবালে, অবলা কেন মা এত বলে’। আমি তো বলছি, টেলিপ্রম্পটার দেখে গাইলেও চলবে।
কংগ্রেস কেন ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্ত অর্থাৎ দু’টি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়? এটা জানতে হলে একটু ইতিহাস ঘাঁটতে হবে। ১৯৩৭ সালে জাতীয় কংগ্রেস এই গানটিকে জাতীয় মঞ্চে ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার আগে জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু পরামর্শের জন্য রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হন। ১৯৩৭ সালের ২৬ অক্টোবর নেহরুকে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করেন। তিনি লেখেন, ‘আনন্দমঠ একটি সাহিত্য কীর্তি, তাই উপন্যাসের পটভূমিতে গানটির রূপ সংগত হতে পারে। কিন্তু বহু ধর্ম ও মতের মানুষের মিলনক্ষেত্র হিসাবে জাতীয় সংসদ বা যৌথ জাতীয় মঞ্চে এমন কোনো রূপ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত।’ ১৯৩৭ সালের কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি রবীন্দ্রনাথের সেই দূরদর্শী প্রস্তাবকেই গ্রহণ করেছিল। মনে রাখতে হবে, সেই কমিটির সদস্য ছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলও।
কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক ব্যবহারের কথা বলেছিলেন? এর কারণ, ‘সুজলাং, সুফলাং মলয়জশীতলাম...’ এই অংশেই মূলত মাতৃভূমির প্রকৃতি ও সৌন্দর্য ও স্নেহময়ী রূপের বন্দনা রয়েছে। পরবর্তী অংশে ‘দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী/কমলা কমল-দলবিহারিণী/বাণী বিদ্যাদায়িনী...’ অংশে মাতৃভূমিকে সনাতন হিন্দুধর্মের দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ১৮৭৫ সালে। তার ছয়-সাত বছর পরে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আঙ্গিকে লেখা উপন্যাস আনন্দমঠে গানটিকে অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮৯৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ নিজেই প্রথমবার প্রকাশ্য মঞ্চে গানটি গেয়ে শোনান। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটির সুরারোপ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশের জাতীয় স্তোত্র কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। প্রথমেই উঠে আসে বন্দে মাতরমের কথা। কিন্তু জওহরলাল নেহরু ছিলেন জনগণমনের পক্ষে। কারণ এই গান সামরিক ব্যান্ডে বাজানোর উপযুক্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালে রাজেন্দ্র প্রসাদের সভাপতিত্বে জাতীয় পরিষদ ঠিক করে জনগণমন জাতীয় স্তোত্র। তবে বন্দে মাতরম জাতীয় গান হিসাবে জনগণের সমমর্যাদা পাবে। এখানেও বন্দে মাতরম বলতে কিন্তু ওই দু’টি স্তবককেই বলা হয়েছিল।
সম্প্রতি সংসদের বাদল অধিবেশনে জাতীয় গৌরব অসম্মান প্রতিরোধ আইন সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে। ১৯৭১ সালের আইনে জনগণমনের অসম্মানে শাস্তির বিধান ছিল। কিন্তু বন্দে মাতরমে ছিল না। নতুন আইন অনুযায়ী, বন্দে মাতরম গাওয়ার সময় বা বাধা দিলে বা গন্ডগোল করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শাস্তি তিন বছরের জেল অথবা জরিমানা অতবা দু’টোই। কিন্তু ওই আইনে কোথাও বলা হয়নি, কেউ যদি দু’টি স্তবক গান, তবে তাঁর কী শাস্তি হবে। গত বছরের ৭ নভেম্বর বন্দে মাতরমের সার্ধ্ব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এক বছরব্যাপী এক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল। প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেদিন বলেছিলেন, বন্দে মাতরমের খণ্ডিত অংশ জাতীয়তাবাদকে আহত করেছে। বলেছিলেন, ১৯৩৭ সালে বন্দে মাতরমের গুরুত্বপূর্ণ স্তবকগুলি বাদ দিয়ে কংগ্রেস দেশভাগের বীজ বপণ করেছিল। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অমিত শাহের মন্ত্রক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বন্দে মাতরমের সরকারি ভাষ্য হিসাবে ছ’টি স্তবকই চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল কেউ যদি ছ’টি স্তবক না গায়, তবে তার কী সাজা হবে। এ সংক্রান্ত বিধান কোথাও লেখা নেই। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দিয়েছে, কেন্দ্র যা বলেছে, সেটা আসলে পরামর্শ। এটা না মানলে কোথাও শাস্তির বিষয় নেই। আসলে মোদি-শাহরা যেটা বলেছেন, সেটা সংঘের বহুদিনের এজেন্ডা।
আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে বন্দে মাতরমের চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক ও জাতীয় তাৎপর্যের কথা তুলে ধরে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত জব্বলপুরে সংঘের বৈঠকে হোসাবালে ‘বন্দে মাতরম’কে একটি ‘অসাধারণ মন্ত্র’ হিসাবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষায়, এই গান মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও বন্দনার ভাবনাকে ধারণ করে এবং জাতীয় জীবনে চেতনার সঞ্চার করে।
সংঘের পত্রিকায় বন্দে মাতরমের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখা হয়েছিল, বঙ্গভঙ্গের পর এই গান নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। তখন নাগপুরের এক স্কুলছাত্র ওই নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে সেই গান গেয়েছিলেন। ওই ছাত্র ও তার এক সহপাঠী স্পষ্টই জানিয়েছিলেন, বন্দে মাতরম গাওয়া তাদের অধিকার। তাই সেই গান গাওয়ার জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা তারা ভাবতেই পারেন না। ছাত্রের নাম কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা। অর্থাৎ প্রথম থেকেই সংঘ বন্দে মাতরম নিয়ে বেশি সংবেদনশীল। এমনকি একসময় সংঘের সাধারণ সম্পাদক ভাইয়াজি যোশি বলেছিলেন, জনগণমন জাতীয় স্তোত্র। তাই তাকে সম্মান করতে হবে। তবে এই গান সংবিধান ঠিক করেছে। তবে আমাদের কাছে বন্দে মাতরমই জাতীয় স্তোত্র। সোজা কথায়, যে কারণে কবিগুরু বন্দে মাতরমের দুটি স্তবক রাখার কথা বলেছিলেন। সেই একই কারণে সংঘ চাইছে পুরো গানটি গাওয়া হোক। এটাও ঠিক, আটের দশক থেকেই এই বিষয়টিকে ইস্যু করতে শুরু করেছে আরএসএস।
সুতরাং এই ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আজকের রাজনৈতিক বিতর্ককে বিচার করা যায় না। কংগ্রেসের পালটা বিজেপি প্রস্তাব নিয়েছে, সাম্প্রদায়িক তোষণের কারণে ‘বন্দে মাতরম’-কে খণ্ডিত করার তীব্র বিরোধিতা করা হচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের বক্তব্য, বিজেপির থেকে দেশপ্রেম শেখার দরকার নেই। দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির দড়ি টানাটানিতে আমরা ভুলে যাচ্ছি মূল সমস্যাগুলি। কংগ্রেস যেন বিজেপির পাতা ফাঁদে পা দিতে চাইছে। কেন একথা বলছি?
গত কয়েক মাসে ভারতীয় রাজনীতি একটু ভিন্ন খাতে বইছে। বিশেষ করে আরশোলাদের নড়াচড়ার পর। এই প্রথম মনে হচ্ছে, বিজেপিও ব্যাকফুটে যেতে পারে। মোদি-শাহ জুটিকেও বেশ নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দেশের সামনে মূল সমস্যা বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি (এমনকি রামমন্দিরেও চুরি) শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি। যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এই সব প্রশ্নেই সরকারকে চেপে ধরেছে বিরোধীরা। সাম্প্রতিক উপ নির্বাচনেও হারতে হয়েছে বিজেপিকে। যেটা আগে একপ্রকার ভাবাই যায়নি। অবস্থা এমনই যে গোটা বাদল অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ এড়িয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কিছু না পেয়ে এখন বিজেপির হাতিয়ার সেই তথাকথিত জাতীয়তাবাদ। এটাই তাদের কৌশল। আসল প্রশ্নগুলিকে আড়াল করে ফেলা। এটা যেন সেই ক্রিকেট খেলার মতো। পছন্দের উইকেট বানিয়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে দাও। অর্থাৎ, যে প্রশ্নের উত্তর দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করব না, নজর সেখান থেকে ঘুরিয়ে দাও। আমাদের পছন্দের উইকেট (তথাকথিত জাতীয়তাবাদ), যেখানে আমরা ভালো খেলতে পারি, সেটাকে সামনে আন। প্রতিপক্ষকে কৌশলে দেশদ্রোহী প্রমাণ করে দাও। আমরা যাকে জাতীয়তাবাদ বলব, সেটাকেই প্রকৃত জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করে দাও। তাহলেই কেল্লা ফতে। আজকের রাজনীতিতে এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। একটি গানকে কেন্দ্র করে নাগরিকের দেশপ্রেম মাপা শুরু হয়েছে। কেউ ‘বন্দে মাতরম’ গাইলেন কি না, বা সম্পূর্ণ গাইলেন কি না, তা দিয়ে দেশপ্রেমের বিচার করা যায় না। দেশের যুব সমাজের একটি বড়ো অংশের কাছে বন্দে মাতরম মানে ‘মা তুঝে সালাম’। তার মানে কি তাঁরা দেশভক্ত নন। দেশের প্রতি ভালোবাসা নানাভাবে প্রকাশ করা যায়। সেটা মোদি-শাহ ঠিক করে দিতে পারেন না। শ্রমিক-কৃষকের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েও দেশপ্রেম দেখানো যায়। ছাত্র-যুবর ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবিও দেশপ্রেম। দুর্নীতির প্রতিবাদ দেশপ্রেম নয়? সংবিধানের মূল ধারা রক্ষা করার লড়াইকেই দেশপ্রেম বলে। দেশপ্রেম মানে তো শুধু কথার ফুলঝুরি নয়।