হিমাংশু সিংহ: তোলাবাজি সর্ব অঙ্গে। হুমকি-চমকানি দ্বিগুণ। গুন্ডারা পয়সা দিয়ে সেটিংয়ে মত্ত। মধ্যরাতে রাজ্যের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত। চুনোপুঁটিরা নন একেবারে এমএলএ-রা ফিতে হাতে ফ্ল্যাট মাপছেন। বিশ্ববিদ্যালয় দখলে নামছেন। সেটিংয়ের ছোঁয়ায় স্কোয়্যারফুট সেনদেরই রমরমা অব্যাহত! বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে মঞ্চ আলো করে দেখা যাচ্ছে তাঁদের। আপনাদের নেতার ঘোষণা করা পাচারকারী পর্যন্ত ‘গিরগিটি’র মতো রং বদলে রাজ্যসভার সদস্য। তাহলে কোন পরিবর্তনটা এল শমীকবাবু? আপনার ঘরের খিল কি এতই পলকা যে স্রোত-বন্যা, আঘাত নয়, ফুলের পাপড়ির ঘায়েও হাট করে খুলে যাচ্ছে দরজাটা। আপনি টেরও পাচ্ছেন না! শুধু বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করে যাচ্ছেন পুরানো অভ্যাসে। মাত্র সাড়ে তিন মাসেই সরকার পরিবর্তনের রোমাঞ্চ বদলে গিয়েছে গড্ডলিকা প্রবাহের থোড় বড়ি খাড়ার ক্লান্তিকর আবর্তে। দলদাস পুলিশ নীরব দর্শক! সে তো আগেও ছিল। কিন্তু তারচেয়েও বড়ো দর্শক আপনি। এবং মাননীয় অর্থ এবং পঞ্চায়েত মন্ত্রীও। একজন বলছেন, যাদবপুরের বদনাম হলে রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য! আর অপরজন বলছেন, যাদবপুরে সার্জিকাল স্ট্রাইক হবে। কেন যাদবপুর কি পাকিস্তান? যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের গেরুয়া দলে টানতে না পেরে পাকিস্তানি জঙ্গি বলে দাগিয়ে দেবেন! দেশের শত্রু বলে গাল দেবেন! আর আপনি বলবেন, যিনি বলেছেন তিনি তো দলের কেউ নন! এ নাটক আর কতদিন চলবে? এরকম চললে ‘সুনার বাংলা’র কথা মানুষ তো ভুলতে বসবে!
গভীর রাতে একজন জনপ্রতিনিধি চোখ বড়ো বড়ো করে হুমকি দিচ্ছেন। নতুন এই মাননীয়ার বিস্ফারিত মুখাবয়ব, ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখ এবং দন্তকৌমুদি বের করে উচ্চগ্রামে হুংকার দেখে সেই রাতে ভীষণ ভয় করছিল। একটুও ভরসা পাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম দখলদারির নেশা কত সহজে মারণ বিষে বদলে যায়। সেখানে সব শাসকেরই চোখ সমান চকচকে ভয়ংকর। মাননীয়া বিধায়ক তাঁর অর্ধেক বয়সের তিন ‘ছাত্র’কে একঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ না করালে অনর্থ হয়ে যাবে বলে শাসাতে পারেন? ওটা তো পুলিশের কাজ। যাদবপুরের মতো দেশের প্রথম সারির তারকাখচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি এমন দখলের শাসানি দিতে পারেন? ভিতরে ভাঙচুর, আগুন, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের কিস্সা। দু’দল ছাত্রছাত্রী মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম পর্যন্ত ভেঙে মাড়িয়ে যাচ্ছেন বহিরাগতরা আর বিধায়িকা বলছেন সারারাত তাণ্ডব চলবে! পর পর তিনটে নাম, উচ্চারণ করে সতর্ক করছেন— সৃজন, এক ঘণ্টার মধ্যে থানায় এদের আত্মসমর্পণ না করালে তিনিই নাকি টেনে বের করে আনবেন। বলুন তো, কোন শান্তির স্বর্গ রচনার দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা! নাকি নতুন করে নৈরাজ্যই আমাদের দেওয়াল লিখন! সবাই ক্ষমতা হাতে তুলে নিলে আমরা যাব কোথায়?
কেন আইন হাতে নেবেন বিধায়িকা? পুলিশ নেই। প্রশাসন উবে গিয়েছে। এভাবে একজন নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন? মধ্যযুগীয় কায়দায় হুংকার দিতে পারেন হাঁটুর বয়সি ছাত্রছাত্রীদের? গেরুয়া বাদে আর সবাই রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি, দিমাগি…। টুকরে টুকরে গ্যাং! সার্জিকাল স্ট্রাইকই একমাত্র পথ?
বাহ! শমীকবাবু বাহ! আপনি বলেছেন এবিভিপি’র সঙ্গে আপনার দলের কোনো রাজনৈতিক সংশ্রব নেই। এবার কি মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তি তৈরি করা যাদবপুরের বিধায়কের সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক নেই বলে বিবৃতি দেবেন। একজন বিধায়ক ওই ভাষায় এবং মারমুখী অঙ্গভঙ্গিতে ক্ষমতার আস্ফালন করতে পারেন? একটা প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে এরকম চললে, শেষে একদিন দেখব, শমীকবাবু আপনি নিজেই বলছেন, আমার সঙ্গেও গেরুয়া দলের বিন্দুমাত্র যোগ নেই। কিংবা বিজেপি নিজেই বলবে, শমীকবাবু যা বলেছেন, করেছেন সব ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার, দলের কোনো দায় নেই!
আসলে এই সামান্য ১১৪ দিনের সরকারি ঘেরাটোপেই আপনি যে কৈফিয়ত দিতে দিতে ক্লান্ত, তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছে বাংলার মানুষ। সিন্ডিকেট ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে ভোটের আগে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন অমিত শাহের পাশে দাঁড়িয়ে। কত প্রতিশ্রুতিই না দিয়েছিলেন প্রচার মঞ্চ থেকে। শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সবার জন্য তিন হাজার টাকার অন্নপূর্ণার দুশো ফিরিস্তি। একবার সুযোগ দিন। একশো দিন পেরিয়ে কতজন চাকরি পেয়েছেন? অন্নপূর্ণার বঞ্চনা নিয়ে প্রতিটি মহিলা কেন ফুঁসছেন? আর তোলাবাজি? তিন মাসেই সে রোগ আপনাদের সর্বাঙ্গে ক্ষত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আপনি বলেছিলেন, গেরুয়া দলের তৃণমূলিকরণ হবে না। তোলাবাজি যাঁরা করছেন তাঁরা সবাই নাকি ৪ মে’র দুপুর বারোটার পরে গেরুয়া পতাকা ধরা সুযোগসন্ধানী। আপনি নিজের মুখেই বলছেন, বিধায়করা কাটমানির লোভে ফিতে নিয়ে শাঁসালো এলাকায় ফ্ল্যাট মাপতে ছুটছেন। আর তৃণমূলের গুন্ডারা তলায় তলায় সেটিং করে বহাল তবিয়তে! আপনি প্রধানমন্ত্রী মোদির বাড়িতে, স্পিকারের সঙ্গে প্রাতরাশ, চায়ের আসরে আদৌ কোনো সম্মান পেয়েছেন কি না জানি না, তবে তার দ্বিগুণ সমাদৃত এনসিপিআই ও তৃণমূলের মধ্যবর্তী বায়বীয় অবস্থানে থাকা রাজ্যের ২০ জন বিরোধী এমপি। আপনার দলের নির্বাচিত তোলাবাজ এমএলএরাও কি ৪ মে দুপুর ১২টার পরের গেরুয়া হয়েছেন শমীকবাবু? যে তৃণমূলি সংস্কৃতিকে বিদায় দেওয়ার অঙ্গীকার করে গেরুয়াদের আগমন তাই আজ আপনারা শিরোধার্য করেছেন। কোথাও একটা, কোথাও দু’জন প্রতিনিধি নিয়েই পঞ্চায়েত দখল হয়ে যাচ্ছে পলক ফেলার আগে। সেই পুরানো সব দখলের সর্বগ্রাসী ক্যানসার।
বড্ড আশা ছিল চারপাশটা বদলে যাবে আমূল। পশ্চিমবঙ্গবাসীর উদ্দেশে আপনার খোলা চিঠির মূল বক্তব্য ছিল— ‘সিন্ডিকেট আর কাটমানির যে সমান্তরাল অর্থনীতি রাজ্যের উন্নয়নকে পঙ্গু করে দিয়েছে, তার বিনাশ করা।’ ভাবুন, সরকারের একশো দিন হওয়ার পর সেই শমীক ভট্টাচার্যকেই বলতে হচ্ছে, অনেক বিধায়ক সম্পর্কেই অভিযোগ আসছে। এগুলো বরদাস্ত করা হবে না। খান-কুড়ি বিধায়ক চলে গেলে কোনো অসুবিধে হবে না। সত্যিই যদি বিজেপি বাইশজন নেতাকে বরখাস্ত করে তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে, তাহলে তাদের নাম প্রকাশ্যে বলছে না কেন? এবং তোলাবাজি তো ক্রিমিনাল অফেন্স। পুলিশে অভিযোগ কই? গ্রেপ্তার হচ্ছেন না কেন সেই নেতারা, যারা একশো দিনেই নিজেদের পকেট ভরেছেন? ছেলে উচ্ছন্নে গেলে বাবা মা মুখ বাঁচাতে বলে, পাশের বাড়ির বখাটের সঙ্গে মিশেই সর্বনাশ হয়েছে। ছেলের দোষ মানতে চায় না। আপনি এবং আপনাদের পথপ্রদর্শক সংঘ পরিবারও যদি সবেতেই ৪ মে’র প্রসঙ্গ টানে তাহলে বলতেই হয়, অনেক তো হল, এভাবে শাক দিয়ে আর কতদিন মাছ ঢাকবেন শমীকবাবু?
অর্ধশতাব্দী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অনেক রাজনৈতিক উথালপাথাল দেখেছে। মতাদর্শের লড়াই থেকে একচুলও সরেনি বামপন্থীরা। তৃণমূল পারেনি, দোসর বিজেপিরও পারা কঠিন। জেএনইউ থেকে যাদবপুর আজও মুক্ত চিন্তার গড়। এবিভিপি একটুও সুবিধা করতে পারেনি। পারবেও না। তবে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ছিল ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর পড়ন্ত সন্ধ্যায় সেন্ট্রাল লাইব্রেরির অদূরে অস্থায়ী উপাচার্য গোপাল সেনের হত্যা। তারপর বিগত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘হোক কলরব’ আন্দোলন এবং মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে মাত্রাতিরিক্ত পুলিশ অ্যাকশন। কিন্তু এভাবে কোনো রাজনৈতিক দল মধ্যরাতে ভীমরবে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর করে আগুন লাগায়নি। দখল অভিযান চালায়নি। দখল করতে গেলে ভোট করতে হবে। সরকার দখল হলেও সেই দম এখনও গেরুয়া শক্তির নেই। তাই বিধায়ককে নামতে হচ্ছে লজ্জার মাথা খেয়ে।
সরকারের ১১৪ দিন অতিবাহিত। ঘড়ির হিসাবে ২৭৩৬ ঘণ্টা। কথা ছিল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া সব মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনা পাবেন। হয়নি। জেলায় জেলায় এই প্রতিশ্রুতিভঙ্গ নিয়ে মহিলারা সোচ্চার। এত কম সময়ে মহিলা ভোটারদের নতুন সরকারের উপর মোহভঙ্গ হওয়া মর্মান্তিক তো বটেই।
নির্বাচনের ফলাফলকে তাৎপর্যহীন করে নরকগুলজার চলছে বরানগর থেকে বালুরঘাট। বিধানসভা থেকে সংসদ। কান পাতলেই কোথাও টাকার বিনিময়ে, কোথাও আবার অন্য শর্তে সেটিংয়ের ফিসফাস শোনা যাচ্ছে। এও শোনা যাচ্ছে, পুজো কমিটির অ্যাকাউন্টে মোটা টাকা উদ্বৃত্ত থাকলে আপনাদের বিধায়ক তাও নজর করছেন পকেটস্থ করতে। সর্বত্র ভাগবাটোয়ারার নরকগুলজার চলছে বলে অভিযোগ!
বুকে হাত দিয়ে বলুন তো ২৯ এপ্রিল বাংলার ভোটাররা যে পরিবর্তনের আবেগে ভেসেছিলেন তা কি একটুও টোল খায়নি? ভরা শ্রাবণে শিবভক্ত মোদির সঙ্গে বসে মিটিং করছেন কী যেন পরিয়ে শিবের অবমাননার অন্যতম মুখ সায়নী ঘোষ! ভোটের আগে ভাবতে পেরেছিলেন? সংসদে বিল পাশের তাগিদ হার মেনেছে ধর্মের ভয়ংকর অবমূল্যায়নের সামনে। এটাকে ধান্দাবাজি বললেই আমি দিমাগি নকশাল! আগেই বলেছি তৃণমূলের গুন্ডারা আজ রাজদ্বারে যতটা সমাদৃত আগে তা দেখিনি। ডিম আর তৃণমূলের দিকে ধাবিত নয়, ছুটে আসছে গেরুয়া অভিমুখেই। সতর্ক করেও ফল মিলছে না। সংক্রামক রোগের মতো তা ছড়িয়ে পড়ছে গেরুয়া দলের সর্ব অঙ্গে। মারণরোগ যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে আগামী দিনে তা আরও মারাত্মক আকার নেবে। যাঁরা বিজেপির হয়ে খেটেছিলেন, তাঁরা গভীর হতাশায় আঙুল চুষছেন। আসন্ন পুরভোটে বিজেপির হয়ে কতজন আগমার্কা গেরুয়া দাঁড়াবেন আর কতজন ৪ মে’র পরের ধর্মান্তরিত, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। নিঃশব্দে ‘বিজেপির তৃণমূলিকরণ’ হয়েই চলেছে। জেলায়-জেলায়, পাড়ায়-পাড়ায় একই ছবি। ক’টা উদাহরণ চান?
শমীক ভট্টাচার্য যতই মঞ্চের উপর থেকে বিবেকের ভূমিকায় সতর্কবার্তা দিন-না-কেন, কার্যক্ষেত্রে দলের উপরতলা থেকে নীচুতলা, কোথাও সভাপতির কথামৃত তেমন গুরুত্বই পাচ্ছে না। দিল্লি না-হয় শমীকের কথা বা দলের ভিতর থেকে ওঠা প্রতিবাদ শুনছে না, কিন্তু নীচুতলাও কি আর রাজ্য সভাপতির কথায় আমল দিচ্ছে না? নাকি, আসলে এটা সেই মুখ আর মুখোশের খেলা? মুখে বলা হবে একরকম, আর কার্যক্ষেত্রে হবে আরেকরকম? ১১৪ দিনের এটাই সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা!
অরবিন্দ ভবনের সামনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের হাতাহাতি এবং দলের পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া সেই প্রশ্নের সামনেই আমাদের দাঁড় করায়। কীসের জন্য এসব? গত কয়েকদিনের ঘটনাক্রম দেখলে বেশ বোঝা যায়, তালে-গোলে যাদবপুরে একটা টালমাটাল রাজনীতির আবহ তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানকে আরও বড়ো সর্বনাশের মুখে ঠেলে দেওয়াই রাজনীতির কারবারিদের আসল লক্ষ্য। যাদবপুরের সর্বনাশ বাংলার সর্বনাশ। সার্জিকাল স্ট্রাইক নয়, ছাত্র ও অধ্যাপকদের সঙ্গে কথা বলে তার সমাধান খুঁজতে হবে।