কথায় আছে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এই সহজ নীতিকথাটি ভুলে গিয়েছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন! ভোটের আগে ক্ষমতা দখলের তাগিদে রাজ্যবাসীকে অভয় দিয়ে বর্তমান শাসক দল ঘোষণা করেছিল, মমতা জমানার প্রতিটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হুবহু চালু থাকবে তো বটেই, বরং আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে। কোনো প্রকল্পের প্রাপকরা বঞ্চিত হবেন না— প্রতিশ্রুতি ছিল এমনই। এই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে বিজেপিকে বিপুলভাবে জিতিয়ে ক্ষমতায় এনেছেন রাজ্যবাসী। কিন্তু ১০০ দিন অতিক্রান্ত করা নতুন এই সরকার গোড়া থেকেই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব বিস্তর। এক কথায়, যত গর্জন, তত বর্ষণ নেই। গত তিন মাসে নতুন সরকারের কাজের ধরনের অভিজ্ঞতা হল, একদিকে প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার নামে বিরাট সংখ্যক নাগরিককে হেনস্তা ও অপদস্থ করা হচ্ছে, অন্যদিকে যোগ্যতার মাপকাঠির নামে নিত্যনতুন শর্ত চাপিয়ে প্রাপকদের একটা অংশকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এসব আসলে বিজেপির গোপন পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল। ভোটের প্রচারে জিত হাসিল করতে ‘সকলের জন্য’ নামক টোপ দেওয়া হয়েছিল। এবং এই কৌশলে বাজিমাত করেছে গেরুয়া শিবির।
ধরা যাক, অন্নপূর্ণা যোজনার কথা, মমতা সরকারের সাড়া জাগানো মাসিক ১৫০০ টাকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের পালটা বিজেপির মাসিক ৩০০০ টাকার অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পে অনুদান দিতে নতুন ডবল ইঞ্জিন সরকার একের পর এক শর্ত জুড়েছে অথবা পালটেছে। যোগ্যতা বিচারের নামে লক্ষ লক্ষ প্রাপককে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। আবার ‘বিবেচিত’ প্রাপকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনুদানের টাকা পাঠাতেও ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রতিবাদে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মহিলারা যেভাবে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তা নজিরবিহীন। তাঁদের অনেকের মোহভঙ্গ হতে বিশেষ সময় লাগেনি। ক্ষোভে ফুঁসছেন প্রমীলাবাহিনী। প্রকল্পের অর্থ না পেয়ে মহিলাদের একাংশ মন্ত্রীকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, সরকারি অফিসে তালা পর্যন্ত ঝুলিয়েছেন, রেল ও জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছেন, আধিকারিকদের বাড়িতে হামলাও চালিয়েছেন। এই ‘বঞ্চিত’ মহিলাদের রোষের আগুন থেকে রক্ষা পায়নি মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম নির্বাচনি কেন্দ্র নন্দীগ্রামও। টাকা না পেলে এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। বস্তুত অতিরিক্ত ও হয়তো-বা অহেতুক ঝাড়াই-বাছাই করতে গিয়ে এই একটি মাত্র প্রকল্প নিয়েই সরকারের যে ল্যাজেগোবরে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতেই নতুন সরকারের সুশাসন দেওয়ার অঙ্গীকার রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি কতদিনে, কীভাবে সামলানো যাবে— তা বলা কঠিন। তবে একথা বলাই যায়, দিকে দিকে মহিলাদের এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ অতীতে দেখেনি বঙ্গবাসী। অর্ধেক আকাশ আজ পথে নেমেছে। পালাবদলের পর এটাও দেখল বাংলা। নারীশক্তিই আজ প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অভিযোগ তুলে সোচ্চার!
আসলে ভোটে জিততে যেকোনো দলের লক্ষ্য থাকে মহিলা ভোট। এই অর্ধেক আকাশকে তুষ্ট করতে গত জুন মাসে রাজ্যের সরকার সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনা ভাড়ায় যাতায়াতে ব্যবস্থা চালু করে। দু’মাস যেতেই সেই প্রকল্পে ‘শর্ত’ চেপেছে! এখন বলা হয়েছে, সব মহিলা এই সুবিধা পাবেন না। একমাত্র ‘পিঙ্ক কার্ড’ থাকলেই মিলবে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধা। প্রশ্ন হল, তাহলে প্রথমে ঘটা করে কেন ঘোষণা করা হয়েছিল? প্রচারের আলোয় আসার জন্য? মমতা জমানায় মাধ্যমিক উত্তীর্ণ বেকার যুবক-যুবতীদের মাসে ১৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা হয়েছিল। সেই প্রকল্পের অর্থ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও নতুন সরকার ঘোষণা করেছে, একমাত্র স্নাতক উত্তীর্ণ বেকাররাই মাসে ৩০০০ টাকা ভাতা পাবেন। অন্যান্যরা পাবেন মাসে ২০০০ টাকা। সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। প্রতিশ্রুতি মতো সেই কাজ এখনও অধরা। উলটে সর্বভারতীয়, না রাজ্য— কোন মূল্যসূচকের ভিত্তিতে ডিএ দেওয়া হবে—সেই টানাপোড়েনের ফয়সালা এখন আদালতের দরজায় পৌঁছেছে। ১০০ দিনের (এখন ১২৫ দিন) কাজের প্রকল্পেও রাজ্যের করুণ ছবিটা উঠে এসেছে সরকারি তথ্যেই। আবার উপযুক্ত বিকল্পের ব্যবস্থা না করেই ফুটপাত, রাস্তা হকারমুক্ত করতে বুলডোজার সংস্কৃতি আমদানি করেছিল নতুন সরকার। যথারীতি ঢোক গিলে সেই অভিযান এখন প্রায় বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। একই পরিণতি দেখা যাচ্ছে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার ক্ষেত্রেও। উদাহরণ আরও আছে এই তিন মাসেই। যেখানে হাঁকডাকে বাজার গরম করার চেষ্টা আছে। কিন্তু দিনের শেষে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এ রাজ্যে এই দলটি সরকার চালানোর জন্য কতটা উপযুক্ত? কতটা প্রস্তুত? ১০০ দিনেই সরকারের উপর মানুষের আস্থা, ভরসা কমতে শুরু করেছে কি না— সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সেইসঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও এক পা এগিয়ে দু’ পা পিছিয়ে যাওয়ার যে নীতি প্রায় সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে— তাও নজরকাড়ার মতো। শুরুতেই এমন ব্যাটিং হলে ইনিংসের বাকি সময়টা কেমন যেতে পারে—তা নিয়ে এখনই ভবিষ্যদ্বাণী করা না গেলেও আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।