সিদ্ধার্থশংকর রায়ের জমানার অবসানের পর পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয় জ্যোতি বসুর দীর্ঘ মার্কসবাদী শাসন, যার উত্তরাধিকার বহন করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। প্রায় সাড়ে তিন দশকের সেই বাম আমলের অসংখ্য ব্যর্থতার তালিকায় শিক্ষাঙ্গনে দলীয় দখলদারি ছিল অন্যতম কুখ্যাত অধ্যায়—যার রাজনৈতিক নাম হয়ে উঠেছিল ‘অনিলায়ন’। ২০১১-তে সেই দখলদারির অবসানের প্রতিশ্রুতিতেই মানুষ রাইটার্সের চাবি তুলে দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির আয়ু বাংলার রাজনীতিতে যে কত ক্ষণস্থায়ী, তৃণমূল আমল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা পেল দাদাগিরি, দলবাজি, গোষ্ঠীকোন্দল এবং শাসক দলের স্যাঙাতদের অবাধ দাপট। মানুষ শেষপর্যন্ত তারও জবাব দিয়েছে। কিন্তু ‘প্রকৃত পরিবর্তনের’ নামে যে সরকার এসেছে, তার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই যদি পুরানো রোগের নতুন রং দেখা যায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই—সরকার বদলেছে, না কি কেবল পতাকার রং? শপথগ্রহণের দশদিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, শিক্ষাঙ্গন হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। রাজনৈতিক মনোনয়ন বাতিলের কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ঘোষণা যে কী আশ্চর্য দ্রুততায় বাষ্প হয়ে গেল! সাক্ষী ২৪৭টি কলেজের পরিচালন সমিতির নতুন তালিকা। সেখানে সভাপতির আসনে বসেছেন বিজেপির বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী—কেউ কেউ একাধিক কলেজেরও দায়িত্ব পেয়েছেন। অর্থাৎ ‘অনিলায়ন’-এর ছেঁড়া জুতো খুলে ফেলে দেওয়ার বদলে তার উপর গেরুয়া পালিশ মেরে নতুন মালিকানা ঘোষণা করা হয়েছে!
সরকারের যুক্তি, ‘দাগি’ কলেজে আর্থিক অনিয়ম ও অরাজকতা সামলাতেই জনপ্রতিনিধিদের বসানো হয়েছে। যুক্তিটি শুনতে যতটা প্রশাসনিক, বাস্তবতা ততটাই রাজনৈতিক। কলেজের আর্থিক অনিয়মের চিকিৎসা যদি সাংসদ-বিধায়ক দিয়ে হয়, তবে হাসপাতালের দুর্নীতি সামলাতে কি পরের ধাপে কিছু মন্ত্রীকে সার্জন বানানো হবে? আর শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসন যদি জনপ্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়াই সমাধান হয়, তবে ‘রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন’-এর ঘোষণাটি নিছক শপথের মঞ্চে উচ্চারিত একটি অলংকারমাত্র ছিল না কি? কলকাতা থেকে বালুরঘাট, হাবড়া-গোবরডাঙা থেকে বীরভূম—বিজেপির মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কদের একের পর এক কলেজের মাথায় বসানোর এই মহোৎসব সেই সন্দেহই ঘনীভূত করছে। একই সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ‘রাষ্ট্রবাদ প্রতিষ্ঠা’র হুংকার আরও উদ্বেগজনক। বন্দে মাতরম্ বা জাতীয় পতাকা নিয়ে বিতর্কের সত্য-মিথ্যা তদন্ত ও আইনসম্মত সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে রাজনৈতিক মতাদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত করা তার সমাধান নয়। শিক্ষাঙ্গনে দেশপ্রেম অবশ্যই থাকবে, কিন্তু দেশপ্রেমের সরকারি ঠিকাদারি চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো দলের শাখা অফিস নয়, আবার কোনো ছাত্র সংগঠনের ব্যক্তিগত জমিদারিও নয়—সেখানে যুক্তি, গবেষণা, বিতর্ক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই হওয়া উচিত মূল পরিচয়। যে সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে দলতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে নিজের দলের জনপ্রতিনিধিদেরই পরিচালন সমিতির চেয়ারে বসায়, সে আসলে পুরানো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়—পুরানো চেয়ারের উত্তরাধিকার দাবি করছে।
সবচেয়ে বড়ো আশঙ্কা এখানেই। বাম আমলে ‘অনিলায়ন’, তৃণমূল আমলে দলীয় দখলদারি—এবার যদি তার নাম হয় ‘গেরুয়ায়ন’, তবে বাংলার শিক্ষাঙ্গনের দুর্ভাগ্যের ইতিহাসে শুধু একটি নতুন অধ্যায় যোগ হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথার সঙ্গে সরকারের কাজের এত দ্রুত সংঘাত কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়। আরএসএসের রাজনৈতিক মতাদর্শ, বিজেপির সাংগঠনিক স্বার্থ এবং সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এই তিনের সীমারেখা যদি শিক্ষাঙ্গনে মুছে যায়, তবে বিপদ শুধু কলেজের পরিচালন সমিতিতে আটকে থাকবে না, তা পৌঁছাবে পাঠ্যক্রম, নিয়োগ, ছাত্ররাজনীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত পর্যন্ত। তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপি যদি তৃণমূলেরই কৌশল ধার করে, তবে জনগণকে পরিবর্তনের নামে কেবল রঙের বদল দেওয়া হবে। বাংলার মানুষ ‘দলতন্ত্রের অবসান’ চেয়েছিল, ‘দলতন্ত্রের পালাবদল’ নয়। শিক্ষাঙ্গনকে যে দলই নিজের রাজনৈতিক দুর্গ বানাতে চাইবে, তার বিরুদ্ধেই একই প্রশ্ন উঠবে: চেয়ার বদলেছে, দখলদারি বদলেছে কি? সরকার যদি সত্যিই শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে চায়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দলীয় পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান চালানো। নইলে ‘অনিলায়ন’-এর বিরুদ্ধে যে ভোট পড়েছিল, ইতিহাস বড়ো নির্মম—সেই ভোটই একদিন ‘গেরুয়া অনিলায়ন’-এর বিরুদ্ধেও পড়তে পারে।