গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:
গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:
“পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্হাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥”
কাল যে প্রসঙ্গের সূচনা করেছিলুম আজ সেই বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করব। ‘ত্রাণ’ মানে সাময়িক অব্যাহতি, ‘পরিত্রাণ’ মানে স্থায়ী অব্যাহতি বা স্থায়ী নিবৃত্তি।
‘সাধু’ কাকে বলব? যাঁর কার্যের দ্বারা অন্যে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে উপকৃত হয় তিনিই ‘সাধু’ পদবাচ্য।
‘বিনাশায়’ বলতেই বা কী বোঝায়? ‘নাশ’ শব্দের পূর্বে বিভিন্ন উপসর্গ যোগ করলে ব্যুৎপন্ন শব্দগুলির অর্থ ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। ‘নাশ’ শব্দের অর্থ হ’ল সত্তার মূল কারণে ফিরে যাওয়া। ‘নাশ’ শব্দের পূর্বে ‘বি’ উপসর্গ লাগালে তার মানে হবে সেই ধরণের নাশ যা থেকে সেই সত্তার আর পুনরুত্থান ঘটবে না।
‘দুষ্কৃতাম্’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? শব্দটির অর্থ হ’ল ‘পাতকী’ অর্থাৎ যে ‘পাতক’ কর্ম করে চলেছে; ‘পাতকী’ তাকেই বলব যে একই সঙ্গে পাপ ও প্রত্যবায় দুই-ই ক’রে চলেছে। পাপের চেয়ে প্রত্যবায় বেশী মন্দ।
‘সংস্হাপন’ কথাটার নির্গলিতার্থ কী? প্রতিটি বস্তুরই একটা স্বীকৃত মান বা নির্দিষ্ট স্থান থাকে। কোন বস্তুকে পতিত অবস্থা থেকে স্বমহিমায় নিয়ে যাওয়াকে বলে ‘স্থাপন’। আর সেই পুনঃ প্রতিষ্ঠিত বস্তুটির যথাযথ তত্ত্বাবধান করাকে বলে ‘সংস্হাপন’।
‘সম্ভবামি’ মানে সম্যক্ রূপে জন্ম গ্রহণ করি। তোমরা সম্যক্ দর্শন ও সম্যক জ্ঞানের কথা শুণেছ। এখন এই যে সম্যক্ জন্ম এর অর্থ কী? এই বিশ্বের মধ্যমণি বা চক্রনাভি যখন একটা পাঞ্চভৌতিক আধার গ্রহণ করে সেটাকে বলা হয় ‘সম্ভবামি’। আনন্দমার্গ দর্শনে একে বলে তারকাব্রহ্ম। ভৌতিক আধার গ্রহণ করায় সেই ভূমা সত্তা ভাবলোকে বিচরণ করে ও একই সঙ্গে অণুমনের অধিক্ষেত্রের বাইরে নির্গুণ (unqualified), নিরাকার ও ভাবাতীত (transcendental) সত্তার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রাখে।
এরপর আসছে ‘যুগে যুগে’ শব্দ দুটি। সাধারণতঃ ‘যুগ’ শব্দের মানে বোঝায় একটা কালের পরিসমাপ্তি। তোমরা জান মানব অস্তিত্ব হ’ল এক আদর্শ প্রবাহ। যখন মানুষের আস্তিত্বিক ও সামাজিক মূল্য স্থূল থেকে স্থূলতর হয়ে পড়ে, মানুষ সেই বদ্ধ পরিবেশে যখন হাঁপিয়ে পড়ে তখন পরমপুরুষ তাঁর বিশাল চিন্তাপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটান। মানুষের মান ও মূল্যবোধের যখন আমূল পরিবর্তন সংসাধিত হয় তাকে বলা হয় একটা যুগ। এই ধরণের পরিবর্ত্তন ঘটানো সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে। একমাত্র তারক-ব্রহ্মই পারেন এই ধরণের বিরাট কর্মসূচীকে বাস্তবায়িত করতে। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমি বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করাই।
যুগ পরিবর্ত্তিত হয়ে চলেছে। তোমরা সকলেই সর্বান্তঃ-করণে সদবিপ্র সমাজ গড়তে ঝাঁপিয়ে পড়ো। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থেমে থেকো না বা কোন অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠার জন্যে ভীত হয়ো না। জয় তোমাদের হবেই হবে।
শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে