Bartaman Logo
২৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দোষটা দারিদ্রের নয়, দরিদ্রের

দোষটা আমাদেরই। কারণ, আমরা কুঁড়ে। সরকার দিকে দিকে... দপ্তরে দপ্তরে চাকরির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমরাই আবেদন করছি না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছি, কেন করব কাজ?

দোষটা দারিদ্রের নয়, দরিদ্রের
  • ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: দোষটা আমাদেরই। কারণ, আমরা কুঁড়ে। সরকার দিকে দিকে... দপ্তরে দপ্তরে চাকরির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমরাই আবেদন করছি না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছি, কেন করব কাজ? সরকার বাড়ি বাড়ি এসে বলছে, আসুন চাকরি করুন। বছরে দু’কোটি চাকরির মধ্যে আপনার রাজ্যের ভাগ্যেও বেশ কয়েক লক্ষ আছে। আমরাই যাচ্ছি না। আমরা ভেবে নিয়েছি, সরকার ভাতা দেবে। না দিলে আমরা বিক্ষোভ করব। এই দেখুন না, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাচ্ছে না বলে জেলায় জেলায় কেমন বিক্ষোভ করছে মহিলারা। কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই আমাদের। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেত বলে অন্নপূর্ণাও পেতে হবে? এ কেমন আবদার? 

Advertisement

দোষটা আমাদেরই। কারণ, আমরা অশিক্ষিত। আমাদের হর্তা-কর্তা বিধাতা সেই কবে বলেছিলেন, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থালা বাজাতে। তাহলেই কোভিড চলে যাবে। মানে, আমাদের সবার বাড়ি আছে। তাতে ব্যালকনিও আছে। তা সত্ত্বেও আমরা ফুটপাতে থাকি। ওখানেই নাতি-পুতিদের জন্য দুধ গরম করি। কেন আমরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাই না? ফুটপাতটা কি থাকার জায়গা? নাকি দুধ গরম করার?
দোষটা আমাদেরই। কারণ, আমরা অন্ধ সেজে থাকি। চারদিকে এত সমৃদ্ধি, এত সুখ... সেই সৌন্দর্য আমরাই দেখতে পাই না। চোখ থাকলে বানভাসি বাংলাতেও সৌন্দর্য নজরে আসে। আমাদের মন্ত্রী-সান্ত্রিরা দেখতে পান। আমরা পাই না। শুধু যন্ত্রণা, কষ্ট এসব দেখি। ওনলি পুওর অ্যান্ড হাঙ্গরি পিপল। বন্যায় তাদের বাড়ি ঘরদোর ভেসে গিয়েছে... তাতে কী? কোথাও আর দু’-একটা চোরাগোপ্তা বাড়ি কি নেই? কিংবা তিন কামরার ঘর। সেখানে গিয়ে উঠছে না কেন? ও আচ্ছা! অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা আটকে যাবে ভেবে? তাহলে তো এদের উপর নজরদারি চালাতে হবে! আরও একবার পাঠাতে হবে ‘অবজার্ভার’। তারা ফিরে এসে মনের মতো (থুড়ি শাসকের পছন্দ মতো) রিপোর্ট দেবে। আগের মাসে ভাতা পেয়ে থাকলেও বন্ধ হয়ে যাবে এ মাস থেকে। 
দোষটা আসলে এইসব ভোটারের। নির্বাচনের আগে সব দলই যায় উপহারের ডালি নিয়ে। ভুল হল... উপহার নয়, উপহারের প্রতিশ্রুতি। সে তো যাবেই! আসলে ভোটারগুলোরই গোড়ায় গলদ। এরা বোঝে না, সব বিশ্বাস করার আছেটা কী? সাড়ে চারশো টাকায় গ্যাস, ২০০ ইউনিট ফ্রি বিদ্যুৎ... এসব প্রচারে বলতে হয়। ক্ষমতায় এলে দিতেই হবে? কে দিয়েছে মাথার দিব্যি? লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যাঁরা পেতেন, তাঁরা সবাই কেন অন্নপূর্ণা পাবেন? মামার বাড়ি নাকি? কোনো শর্ত চাপবে না, সেও কি হতে পারে? কোনো ভদ্র দেশে হয়? তাই শর্ত মানতে হবে। দেখাতে হবে জমির মাপ, কতগুলো ঘর...। বলতে হবে, পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি করে কি না। তা সে যেমন চাকরিই হোক। 
দোষটা উমাদেবীর। বড্ড চাই চাই বায়না। ভাণ্ডার চাই, আবার যোজনাও! কান্নাকাটি করছেন এখন। বলছেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় ছেলের পড়ার খরচটা চালাতাম। আর এখন? উপায় হাতড়ে বেড়াচ্ছি। পাঁচ ঘর কাজ করেও যা রোজগার... তাতে একচিলতে ঘরটার জন্য তিন হাজার টাকা ভাড়া, আর খাই খরচটুকু মেটানোর পর কিছুই থাকে না। মেয়ে এখনও স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ছেলে সরকারি স্কুলে পড়লেও বইপত্র বা অন্য সব খরচ তো রয়েছে!’ তাহলে কি এবার ছেলেকেও স্কুল ছাড়িয়ে কাজে লাগিয়ে দেবেন স্বামীহারা উমাদেবী? জানেন না। কিন্তু জানতে চান। কারণ তিনি ভোট দিয়েছেন। ভরসা করেছেন প্রতিশ্রুতিতে। 
দোষটা শিল্পীর। দিনমজুরের কাজ করে বাবার ওষুধের টাকাটা অন্তত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে জোগাড় হয়ে যেত। তিন হাজার টাকা পাওয়া যাবে ভেবে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। এখন অ্যাকাউন্টে তিন টাকাও ঢুকছে না। আর শিল্পী কাজকর্ম ফেলে ছুটে বেড়াচ্ছেন জেলাশাসকের দপ্তরে। লাইন দিচ্ছেন, কাতর আরজি জানাচ্ছেন, আর ফিরে যাচ্ছেন। বাবুরা বলছেন, যাচাই হবে। ভাবছেন শিল্পী... কেমন এই যাচাই? টাকা আদৌ পাব তো? আর পেলেও ততদিন বাবাকে বাঁচানো যাবে কি? 
দোষটা এদের সবার। কমন দোষ, এরা গরিব। এদেরই ভক্তকুল বলছে সমাজের বোঝা। আগের সরকার এদেরই ভাতা দিয়ে ‘অভ্যেস খারাপ’ করে দিয়েছে। ভক্ত-বক্তব্য সাফ, সব ভাতা বন্ধ করে দিক সরকার। তাহলেই আপদ বিদেয় হবে। সত্যি তো। ভেবে দেখার মতো বিষয় বটে। গরিবি হটাও এখন আউট অব ফ্যাশন হয়ে গেছে। এখন বাজারে চলছে, গরিব হটাও। কর্মসংস্থান নেই! তাতে কী? মূল্যবৃদ্ধি আগুনের শিখার মতো চড়ছে। তাতেই বা কী এসে যায়? সবাইকে খাওয়ানোর দায় কি সরকারের? গরিব হয়েছ কেন? বাড়ি বানাওনি কেন? ফুটপাতে এসে থাকছ কেন? আর কেনই বা রাস্তার দৃশ্যদূষণ করে দুধ ফোটাচ্ছ? এরা নিশ্চয়ই শখ করে রাস্তায় থাকে। দারিদ্র? ও সব ন্যাকাপনা। এত দিক দেখা যায় নাকি? গরিবদের খাওয়াও, ভাতা দাও, বাড়ি বানিয়ে দাও, কাজ দাও... কত করবে সরকার? এত দিকে তাকাতে হলে উন্নয়ন হবে কীভাবে? রাস্তাঘাট, শিল্প... কত কাজ! এটা শুনলেই অবশ্য পেটের ভিতর থেকে ভুরভুরিয়ে সোডার মতো একটা প্রশ্ন বেরিয়ে আসে... আচ্ছা, শিল্প সত্যিই হচ্ছে? আর হলেও সবাই কি কাজ পাবে? উত্তর হল, না, পাবে না। আরে ভাই, সবাইকে কাজ দেওয়ার দায়িত্বও কি শাসকের? নয়? আচ্ছা, মেনে নিলাম। তাহলে আর একটা প্রশ্ন করা যায় কি? চাল-ডালের দাম কবে কমবে? এতেও অপ্রস্তুত হলেন নাকি? না না, একদম হবেন না। ওই শুনুন ভক্তকুল বলছে... সেই গ্যারান্টি সরকার কেন দেবে? যাও... মিলবে না। ভোট দিয়ে দিয়েছ, ব্যাস। পাঁচ বছর কিচ্ছুটি বলবে না। নিজেরা বুঝে নাও। তাকিয়ে দেখো... ভিআইপি কনভয় যাচ্ছে। একটা, দুটো, তিনটে... মোট ২১টা গাড়ি। কী যেন বলছে মধ্যবিত্ত-গরিবরা... তেলের দাম বেড়েছে! এহ, একেবারে পোলাপান। এটাও বোঝে না, তেলের দাম-ফাম সব আম আদমির জন্য। ভিআইপির জন্য নয়। ওই তেল সরকার দেয়। এ তো আচ্ছা জ্বালা, আবার প্রশ্ন পাচ্ছে (খিদে পাওয়া, টয়লেট পাওয়ার মতো)। সেটা হল, সরকার কোথা থেকে পায় এই তেলের টাকা? মাথা নড়ছে ভক্তদের। করুণায়। ভাবটা এমন, এটাও জানো না? আপনি একটু কুণ্ঠিত বোধ করুন, সঙ্গে ভক্তোত্তর (ভক্ত+উত্তর) শুনে নিন... তোমরা যে নানারকম কর দাও, তার থেকে আসে এই টাকা! এটা অধিকার। ভিআইপি হওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তোমরা ন্যাস্টি গরিব। কী করেছ দেশের জন্য? অন্বপূর্ণার জন্য বিক্ষোভ? রাস্তার ধারে দুধ গরম? যোগ দিবসে সবুজ ঘাসে বসে হাত পা ছুড়েছ কি? বাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়েছ? ফুঃ, এরা আবার গাড়ি গোনে, পেট্রল ডিজেলের দাম নিয়ে চর্চা করে... অধিকার কী? যোগ্যতা কী? এত কাঁদুনি কীসের? 
দোষটা মানুষ নামক জীবের। কারণ তারা অভ্যাসের দাস। খালি প্রশ্ন করে। অভ্যাসবশত। জানতে চায়, তেলের দাম বাড়লে যে নিত্যপণ্যের পরিবহণ খরচ বেড়ে যায়, তার বেলা? চাষের কাজে জেনারেটর বা পাম্প চালানোর খরচাও বাড়ে। তাই তো সবজি থেকে গাবজি, সব জিনিসপত্রের দাম চড়ছে। মাথা নাড়েন ভক্তকুল। বলেন, আজেবাজে প্রশ্ন। কান দিলে চলবে না। ওই যে চিনির দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিহারের মন্ত্রী বলেছেন, আমাদের সমাজে ডায়াবেটিস বাড়ছে। অত চিনি খাওয়ার দরকার কী? এটাকেই মূল মন্ত্র, চরম সত্য হিসাবে মেনে নিতে হবে। ঠিকই তো, চিনি খাওয়া ছেড়ে দিন। আখ উৎপাদন হবে, কিন্তু সেটা ইথানলে লাগবে। তাতে যদি চিনির দাম বাড়ে, সরকার কী করবে? উন্নয়ন বন্ধ করে দেবে? পেট্রলে ইথানল মিশিয়ে কত মুনাফা হচ্ছে জানেন? জানেন না? তাহলে জানতেও হবে না। আপনারা বরং ক্ষুধা সূচক নিয়ে বিতর্কসভা বসান। রাষ্ট্রের তাতে কিছু আসে যায় না। কতজন ভারতবাসী একবেলা একপেট খেতে পায় না, সেই হিসাব কষে কী হবে? তার থেকে হর ঘর তিরঙ্গা কর্মসূচি করুন। অত খাই খাই করার কী আছে বাপু? খাই খাই না থাকলে ‘টাকা টাকা’ করাও বন্ধ হবে। তখন আর এরা ভাতা চাইবে না। বিক্ষোভও বন্ধ হয়ে যাবে। তখনই তো আমরা বুঝব বন্যার সৌন্দর্য। বুঝতে পারব, এক গামলা দুধ একটি শিশুর জন্য হতে পারে না। মন্ত্রী ঠিক বলেছেন। দারিদ্র বড়ো সমস্যা নয়। দরিদ্র লোকগুলো বেশি ঝামেলার। এরা অন্নপূর্ণার টাকা চায়। রাস্তায় থাকে, আর সেখানেই দুধ গরম করে। ফুটপাতেই ছেলেমেয়েকে পড়াতে বসে। স্বপ্ন দেখে... আমার সন্তান আমার মতো হবে না। ওকে রাস্তায় থাকতে হবে না। ও চাকরি করবে। ভালোমন্দ খাবে। মানুষ হবে। কেমন সেই মানুষ? এদের মতো? যারা গণতন্ত্রের কাঁধে পা দিয়ে উঠে রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়ে দেয়? হয়তো এটাই বিকাশ। দোষটা এই শ্রেণিটার। সমাজের। বিকশিত ভারত, বিকশিত বাংলা... এরা ভালো কিছু দেখতেই পায় না। তার সঙ্গে জুড়ে যায় কিছু সেকু-মাকু। উসকানি দেয়। ফুটপাতের ওই ছোট্ট মেয়েটার হাতে একটা জাতীয় পতাকা ধরিয়ে ছবি তোলো। তারপর পোস্ট করে দাও। ব্যাস, মেরা ভারত মহান হয়ে গেল। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের কথা আর কেউ বলে না। কোথায় তারা? রেলের সঙ্গে সমঝোতা হল? বা নতুনভাবে গজিয়ে ওঠা কোনো দাদার সঙ্গে? কত টাকায় রফা? জানা নেই। জানতে নেই। অমৃত মহোৎসব চলছে দেশজুড়ে। তার সুবাস এখন বাংলাতেও। ভরসা ইন... গরিব আউট। আমরা বরং বন্দেমাতরম গাই... পুরোটা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ