Bartaman Logo
২৬ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বন্ধন

এই পৃথিবীতে কোন জীবই বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় না। মানব মনের স্বাভাধিক প্রবণতাই হচ্ছে সর্বাত্মক মুক্তি।

বন্ধন
  • ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এই পৃথিবীতে কোন জীবই বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় না। মানব মনের স্বাভাধিক প্রবণতাই হচ্ছে সর্বাত্মক মুক্তি। সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক— সর্বস্তরেই সে চায় পূর্ণ স্বাধীনতা, আর কেউ যদি তা না চায় বুঝতে হবে— সে তার প্রাণীনতা খুইয়ে বসেছে, তার জীবনের স্পন্দন থেমে গেছে। তাই সে মানুষের স্থান জীবিত মানুষ সমাজে নয়, তার স্থান হওয়া উচিত শ্মশানের চিতায়। এখন প্রশ্ন হ’ল— কীভাবে এই বন্ধনমুক্তি সম্ভব? তাই আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে “জ্ঞাতা দেবং মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ।”

Advertisement

পরমপুরুষই একমাত্র সত্তা যাঁকে জানলে মানুষ সর্ববিধ বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে পারে— ‘মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ।’ বলা হয়েছে—
“সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্মং কলিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্‌।/ বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাহা শিবং শাস্তিমত্যন্তমেতি।।”/ “অনাদ্যনস্তমখিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্।/ বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ।”
‘সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্মং কলিলস্য মধ্যে’। মানুষের ইন্দ্রিয়গুলির গ্রহণ-সামর্থ্য খুবই সীমিত। এক বিশেষ স্তর থেকে অন্য একটি বিশেষ স্তর পর্যন্ত এরা কাজ করতে পারে, তার বাইরে এরা কিছু করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। যে ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়েরা ব্যর্থ হয় সেখানে বুদ্ধি কাজ করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু সেই বৃদ্ধিও এক বিশেষ সূক্ষ্ম পর্যায় থেকে অপর এক সূক্ষ্ম পর্যায় পর্যন্ত কাজ করতে পারে। খুব বেশী সূক্ষ্ম বা খুব বেশী স্থূল বস্তুর বেলায় বৃদ্ধিও ঠিক মত কাজ করতে পারে না। ‘সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মং’। যে ক্ষুদ্র বস্তুসত্তা ইন্দ্রিয়ের ধারণ-ক্ষমতার বাইরে তাকে বলি সূক্ষ্ম অর্থাৎ যাকে মন বুঝতে পারে কিন্তু ইন্দ্রিয় পারে না তা’ সূক্ষ্ম। আর যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তা স্থূল। আর যাকে মনও বুঝতে পারে না অর্থাৎ যা চিন্তারও অগম্য তা হ’ল অতি সূক্ষ্ম। ‘কলিলস্য মধ্যে’। ‘কলিল’ শব্দের কয়েকটিই অর্থ। এখানে ‘কলিল’ শব্দের অর্থ হ’ল— কোন বস্তুর অতি সূক্ষ্ম ভগ্নাংশ, যে সূক্ষ্ম ও অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় মানুষের বুদ্ধিও স্তম্ভিত হয়ে যায়, কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সেই অবস্থাটাকেই বলি পরমপুরুষের লীলা। যেমন, একটা ছোট্ট উইপোকা। অতি ক্ষুদ্রাকৃতি সে; তবুও তার একটা মস্তিষ্ক আছে যা দিয়ে সে চিন্তাও করতে পারে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা একটা অকল্পনীয় জিনিস। কিন্তু এখানেও পরমপুরুষের লীলা সমানভাবেই চলছে। তাঁর লীলা কেবল যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল বস্তুতেই চলছে তা-ই নয়। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্তুতেও তাঁর লীলা তেমনিভাবেই চলছে। আর পরমপুরুষের এই যে লীলা, এই লীলা কত বিচিত্রভাবে হয়ে চলেছে তা মানব মনের পক্ষে অগম্য, অকল্পনীয়।
এই লীলা কার? ‘বিশ্বস্য স্রষ্টারম্’। বিশ্ব কী? আমরা জানি, এই বিশাল সৃষ্টি, এই পাঞ্চভৌতিক জগৎ প্রকৃতির তমোগুণসৃষ্ট আর তমোগুলের ধর্মই হচ্ছে সব কিছুকে সীমার বন্ধনে বেঁধে ফেলা। তাহলে দেখছি, পরমপুরুষ এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতির তমোগুণের দ্বারা আর যখন তিনি এই তমোগুণী সৃষ্টির সাক্ষীসত্তা তখন তাকে বলা হয় ‘বিশ্ব’ অর্থাৎ পরমপুরুষের এই সৃষ্টির সাক্ষীস্বররূপকে বলা হয় বিশ্ব। পরিদৃশ্যমান এই পাঞ্চভৌতিক জগতের সাক্ষী সত্তা হিসাবে যখন কাজ করছেন তখনও পরমপুরুষের উদ্দেশ্যে এই ‘বিশ্ব’ শব্দটি ব্যবহহৃত হয়ে থাকে। এখানে শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বস্য স্রষ্টারম্’ অর্থাৎ যা পরমপুরুষের তমোগুণী সৃষ্টি সেটাও ‘বিশ্ব’; এই বিশ্বের যে সাক্ষীসত্তা তাও বিশ্ব। এখন প্রশ্ন হ’ল, কে এই সাক্ষীসভা যিনি বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন?— না, তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন ও এই জন্যেই তাঁকে বলা হয় ‘স্বয়ত্ত্ব’। সুতরাং অতি সূক্ষ্ম জগতেও যেখানে মানুষের মন কাজ করতে অসমর্থ সেখানেও তাঁর লীলা বহুধাবিকশিত।
শ্রীআনন্দমূর্তির ‘ভক্তিরস ও কীর্ত্তনমহিমা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ