সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: উৎসবের মরশুমে বাঙালির ব্যাগ গোছানোর রেওয়াজ নতুন নয়। পাহাড়ি পাইন বনের হাওয়া কিংবা নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ির উঠোন—দুর্গাপুজোয় দিনকয়েকের ছুটি মানেই রোজকার একঘেয়ে দৈনন্দিন জীবনের বাইরে একটু খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেওয়ার আকুলতা। কিন্তু এই আনন্দের পথে শুরুতেই যে বাধা এসে দাঁড়ায়, তার নাম ভারতীয় রেলের টিকিট বুকিং। আসলে এই ব্যাধিটা বহু বছরের পুরানো। এবছরও সেই ব্যাধি এক তিলও বদলায়নি। সকাল আটটা বাজতেই স্ক্রিনে আঙুল চালানোর লড়াই, আর মাত্র পাঁচ মিনিট বা তারও কম সময়ের মধ্যে ট্রেনের আসন উধাও হয়ে যাওয়া! কয়েক মিনিটের স্নায়ুযুদ্ধ শেষে কম্পিউটার বা ফোনের পর্দায় গোটা গোটা হরফে ভেসে ওঠে একটি শব্দ—‘রিগ্রেট’। ভাগ্যদেবী কিছুটা সুপ্রসন্ন হলে ঠাঁই হয় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর ওয়েটিং লিস্টে। প্রশ্ন উঠছে, এ কেমন ডিজিটাল ব্যবস্থা, যেখানে কোটি কোটি যাত্রীর টিকিট কাটার অধিকার স্রেফ কয়েক মিনিটের লটারিতে পর্যবসিত হয়!
দুর্গাপুজো থেকে শুরু হওয়া উৎসবের মরশুমে গত কয়েক বছরের চিত্রনাট্যে কোনো হেরফের নেই। শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার ট্রেন—দার্জিলিং মেল, পদাতিক, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস বা কামরূপ থেকে শুরু করে বন্দে ভারত কিংবা শতাব্দীর মতো প্রিমিয়াম ট্রেন, বুকিং উইন্ডো খোলার পাঁচ মিনিটের মধ্যে টিকিট শেষ। চলতি বছর ১৭ অক্টোবরের (মহাসপ্তমী) টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে সমস্ত কনফার্মড আসন উধাও! আবার ১৯ অক্টোবরের (মহানবমী) টিকিটের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, মাত্র সাড়ে তিন মিনিটেই একাধিক জনপ্রিয় রুটের টিকিট শেষ। এমনকি অনেক ট্রেনে ওয়েটিং লিস্ট সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে ‘নো রুম’ বা ‘রিগ্রেট’ বার্তা দিয়ে বুকিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় রেলের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ট্রেনের অগ্রিম সংরক্ষণ ৬০ দিন আগে খোলে এবং ওপেনিং ডে-তে বুকিং শুরু হয় সকাল আটটা থেকে। প্রশ্ন উঠছে—৬০ দিন আগে বুকিং খুলেও যদি যাত্রীরা টিকিট না পান, তাহলে এই ৬০ দিনের অগ্রিম বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে লাভ হল কোথায়? কারও অভিযোগ, বুকিংয়ের মুহূর্তে সিট বেছে পেমেন্টে যেতে যেতে আসন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, পেমেন্টের পর সেশন শেষ বা বুকিং ব্যর্থ হওয়ার সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। অনলাইন রেল-কমিউনিটিতেও এই ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নিট রেজাল্ট জিরো। এই ছবি শুধু অনলাইনের ক্ষেত্রেই নয়। রেলের কাউন্টারগুলিতেও একই দৃশ্য। কনফার্ম টিকিটের আশায় সাধারণ মানুষ রাত জেগে স্টেশনে স্টেশনে রিজার্ভেশন কাউন্টারের সামনে লাইন দিয়েছিলেন। কিন্তু বহু চেষ্টার পরও সাধারণ যাত্রীদের ঠাঁই হচ্ছে দীর্ঘ ওয়েটিং লিস্টে। টিকিট কাটার প্রতিযোগিতার এই পর্বে যদি কাউন্টারে আপনি চার-পাঁচজনের পিছনে দাঁড়ান, তাহলে সেই পর্বে জনপ্রিয় রুটে আপনার টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ ওয়েটিং লিস্ট থাকলেও তবু একটু সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু ‘রিগ্রেট’ দেখালে সেই আশালতাও নির্মূল হয়ে যায়। কনফার্ম আসন নেই, ওয়েটিংয়ে জায়গা নেই, এমন অবস্থায় যাত্রীদের সামনে পড়ে থাকে বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা। কিন্তু উৎসবের মরশুমে বিমান ভাড়া এতটাই বেশি থাকে যে, হাত ছোঁয়ানো দায়। রইল বাকি বাস। কিন্তু এই সময়ে উত্তরবঙ্গগামী যে কোনো বাসের ভাড়াও পৌঁছে যায় ৪০০০-৪৫০০ টাকায়। কতজনের যে শেষ পর্যন্ত এই দুর্ভোগের কারণে ভ্রমণ বাতিল করতে হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
এই ভোগান্তি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক পোস্ট করে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নেটিজেনরা। অনেকেই এজেন্টের সাহায্য নিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে টিকিট পেয়েছেন বলেও লিখেছেন। সেই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, আগে থেকে অ্যাপে মাস্টার লিস্ট তৈরি করে রাখা, পেমেন্টের জন্য ওয়ালেটে পর্যাপ্ত টাকাও রাখা থাকে, তার পরেও কীভাবে বুকিং উইন্ডো খোলার পর চোখের নিমেষে সব আসন শেষ হয়ে যায়! তাহলে যাত্রী চাহিদার হিসাব নিয়ে রেলের পরিকল্পনাটা ঠিক কোথায়? এই প্রসঙ্গে বলা যাক এক পরিচিত সাংবাদিকের কথা। পুজো পর্বে চারদিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে উত্তরবঙ্গ যাওয়ার প্ল্যান করেছিলেন তিনি। কিন্তু সকাল ৮টায় বহু চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ট্রেনে টিকিট পাওয়ার বদলে জোটে ‘রিগ্রেট’ বার্তা। শেষ পর্যন্ত রাধিকাপুর এক্সপ্রেসে বারসোই জংশন পৌঁছে সেখান থেকে ক্যাপিটাল এক্সপ্রেসে ব্রেক জার্নি করে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার এক নেটিজেন লিখেছেন, এই পর্বে যাঁরা টিকিট পাবেন, তাঁরা নির্ঘাৎ অন্নপূর্ণা যোজনার টাকাও পাবেন।
এই চরম অনিশ্চয়তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে সার্বিক অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পেও। উত্তরবঙ্গ বা সিকিমের পর্যটন ব্যবসায়ীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন উৎসব মরশুমের জন্য। আবার সাধারণ মানুষ ট্রেনের টিকিট কনফার্মড না হলে হোটেল বা হোমস্টে বুকিং করতে সাহস পান না। ফলে টিকিটের এই হাহাকার এক লহমায় গোটা ভ্রমণ ব্যবস্থার উপর সংশয়ের কালো ছায়া ফেলে দেয়। রেলের আধিকারিকরা অবশ্য একে ‘চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক ব্যবধান’ বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁদের বক্তব্য, সবাই একই সময়ে একসঙ্গে বুকিং করায় এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
টিকিট বুকিংয়ের সবচেয়ে বড়ো বিতর্ক আসনের বণ্টন ও অপ্রকাশিত কোটা নিয়ে। সাধারণ যাত্রীরা যখন মিনিটে মিনিটে সার্ভার ডাউন বা পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতায় হাবুডুবু খাচ্ছেন, তখন দেখা যাচ্ছে ট্রেনের মোট আসনের একটি বড়ো অংশ সর্বসাধারণের জন্য খোলাই হয় না। এই টিকিট চলে যায় নানা ধরনের কোটা, তৎকাল কিংবা প্রিমিয়াম তৎকালের ঝুলিতে। সঙ্গে রয়েছে একাধিক অ্যাপ, যারা আবার কনফার্মর্ড টিকিট দিতে না পারলে তিন গুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। সাধারণ মানুষ যে বিপুল ভিড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন, তার জন্য নির্দিষ্ট আসনের সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। আর সেই সীমিত আসনের উপর যদি আবার ভাগ বসানো হয়, তবে সাধারণ যাত্রীর কপালে রিগ্রেট ছাড়া আর কী-ই বা জুটতে পারে?
টিকিট কাটার এই যুদ্ধ থেকে ডিজিটাল ‘দালালরাজ’-এর ভূমিকা পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি। একথা ঠিক যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে আইআরসিটিসি সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। আধার এবং ইউজার আইডি সংযোগ বাধ্যতামূলক করার পর প্রায় তিন কোটি ভুয়ো বা বোট-চালিত অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত ও বাতিল করা হয়েছে। দৈনিক প্রায় এক লক্ষ সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট থেকে টিকিট কাটার প্রবণতা কমে নেমে এসেছে কয়েক হাজারে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক শিডিউলিং ও ফ্রড ডিটেকশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যা একই আইপি অ্যাড্রেস থেকে দ্রুত পেমেন্ট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য পূরণের মতো ‘অস্বাভাবিক কার্যকলাপ’ চিহ্নিত করে বুকিং আটকে দিচ্ছে। কিন্তু এসব প্রযুক্তির সুফল এখনও পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের কাছে পৌঁছায়নি। ‘বট’ আটকানো গেলেও অতিরিক্ত যাত্রীচাপের সামনে থমকে যাচ্ছে গোটা ব্যবস্থাটাই। ফলে এত ঘোষণার পরেও টিকিট কাটার ক্ষেত্রে ‘ভরসা ইন’ হচ্ছে না।
তাহলে সমাধানের পথ কোথায়?
প্রথমত, দীর্ঘদিনের পুরানো এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে রুটভিত্তিক ট্রেনের সংখ্যা ও আসন বৃদ্ধি করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। গত কয়েক বছর ধরে উৎসবের কয়েক দিন আগে বিভিন্ন রুটে স্পেশাল ট্রেনের ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অনেক সময়ই তা যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত হয় না। আবার অনেকেই স্পেশাল ট্রেনের অপেক্ষায় না থেকে বাধ্য হয়ে গন্তব্য বদলে ফেলেন। কেউ বা আবার ঘোরার প্ল্যানই বাতিল করে দেন। এই সমস্যা সমাধানে জনপ্রিয় রুটগুলিতে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ট্রেনগুলিতে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করা দরকার। এআই প্রযুক্তি যদি ওয়েটিং লিস্ট ও যাত্রীদের ট্র্যাফিক প্যাটার্ন নজর রাখতে পারে, তবে সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বুকিং ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি ট্রেনে ঠিক কতগুলি আসন সাধারণ কোটায় বুকিংয়ের জন্য মিলছে এবং কতগুলি আসন অন্যান্য কোটায় সুরক্ষিত থাকছে, তার স্পষ্ট তথ্য সাধারণ যাত্রীর সামনে রাখা জরুরি।
উৎসবের মরশুমে ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, সারা বছর নিজের শিকড় থেকে বহু দূরে থাকা মানুষের ঘরে ফেরার আবেগ। প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি সেই আবেগের যথাযথ মূল্য দিতে না পারে, তবে সেই ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। উৎসবের দিনগুলি শুরু হওয়ার আগেই টিকিট কাটার এই ‘যুদ্ধ’ শেষ হওয়া দরকার।