সমৃদ্ধ দত্ত: সবথেকে বেশি হারে বাড়ছে মহিলা এবং জেন জি ভোটার। বস্তুত স্বাধীনতার পর এই প্রথম মহিলা ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের অত্যন্ত কাছে চলে এসেছে। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৪৯ কোটির কিছু বেশি। মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৪৭ কোটির সামান্য বেশি। আবার ভোট দেওয়ার প্রবণতার ক্ষেত্রেও মহিলারা এগিয়ে। পাশাপাশি ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি নতুন প্রজন্মের ভোটার সংখ্যাও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী।
প্রত্যেকটি ভোটে রাজ্যে রাজ্যে লক্ষ্য করা যায় যে, সব রাজনৈতিক দলই মূলত বাকি ভোটারদের ছেড়ে যুব এবং মহিলাদের কাছে টানার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্রবণতা ইতিবাচক এবং একইসঙ্গে নেতিবাচক। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যেক ভোটারের মূল্য ও গুরুত্ব সমান হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যায়, মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধ ভোটারদের সেভাবে কোনো দলই পাশে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে তাদের খুশি করার চেষ্টা করছে না।
যতরকম ভোটের রণকৌশল এবং আর্থিক উপঢৌকন, সব প্রতিশ্রুতি, ঘোষণার লক্ষ্য সিংহভাগ ক্ষেত্রেই মহিলা এবং যুব ভোটার। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত যত বিধানসভার ভোট হয়েছে, সর্বত্র দেখা গিয়েছে, মহিলা এবং যুবদের মন জয় করার জন্য কল্পতরু হয়েছে শাসক দল এবং তাদের প্রতিপক্ষ সব দলই। বিহারে নীতীশ কুমার ১০ হাজার টাকা করে মহিলাদের দিয়ে দিয়েছেন ভোটের আগে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান প্রচারই ছিল ৩ হাজার টাকা করে মহিলাদের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার দেওয়া হবে। কেরলম, তামিলনাড়ু, অসম, সর্বত্র মহিলা ও যুবদের জন্য প্রভূত ভোট উপহার দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক এই যুগে আর্থ সামাজিক একটি শব্দবন্ধ আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত। ইকনমিকালি ইউজলেস। অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে যে নাগরিক শ্রেণি অর্থনীতির কাজে লাগছে না। আর্থিকভাবে নয়। সামাজিকভাবে নয়। এর মধ্যে যুব-বৃদ্ধ সকলেই আছে। কিন্তু বৃদ্ধদের সম্পর্কে এরকম একটি নিষ্ঠুর এবং চরম আপত্তিকর শব্দ বেশি বলা হয়ে থাকে। কারণ কী? কারণ তাদের ক্রয়প্রবণতা নেই। কর্পোরেট জগতের কাছে সেই বেশি প্রিয় যে সারাক্ষণ কিছু না কিছু কিনবে। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য ছাড়া বৃদ্ধ প্রজন্ম বিশেষ বিলাসদ্রব্য কেনে না। যুব এবং মহিলাদের এই প্রবণতা সবথেকে বেশি সমাজতাত্ত্বিকের মতে। কর্মহীন হলেও যুবরা কোনো না কোনোভাবে টাকা জোগাড় করে কিছু না কিছু কিনতে চায়। অর্থনীতিকে সচল রাখে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, কর্পোরেটের মতোই আচরণ রাজনৈতিক দল ও সরকারেরও। তাদের কাছেও এই মহিলা ও যুবরাই সবথেকে প্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ, এই দুইয়ের সম্মিলিত ভোটব্যাংকের বৃহৎ অংশ যদি কোনো দল নিশ্চিত করে ফেলতে পারে, তাহলে সেই দলের ভোটে জয় সম্পর্কে আর উদ্বেগ থাকে না। আর তাই বয়স্ক সমাজ আর গুরুত্ব পায় না। ৮০ বছরের বেশি বয়স্ক ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৮৫ লক্ষ মাত্র। সুতরাং স্পষ্টই বোঝা যায় যে, কেন তাঁরা সবদিক থেকেই অবহেলিত। তাদের কথা ভেবে কেউ আর রাজনীতি করে না। সরকার কোনো সুদূরপ্রসারী রণকৌশল কিংবা পরিকল্পনাও গ্রহণ করে না। বার্ধক্য ভাতা এবং কিছু ট্যাক্স ছাড়েই কর্তব্য সমাপ্ত। পক্ষান্তরে যুব ও মহিলা ভোটারদের জন্য সব সরকার সর্বদাই উদারহস্ত। সাইকেল, স্কুটার, ল্যাপটপ, নগদ টাকা, ব্যাংক লোন ইত্যাদি উপহার দেওয়া হয় যুব ও মহিলাদের।
বর্তমান রাজনীতির সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ হল যুবসমাজের মন বোঝা। এবং এই না বোঝা তালিকায় সবার উপরে স্থান বিজেপির। কেন? এই একই সমস্যা তো সব দলের জন্যই প্রযোজ্য! সেটা ঠিক। কিন্তু বিজেপিকে দেশের জন্য নীতি নির্ধারণ করতে হয়। তাই তাদের আগে বোঝা দরকার যুবসমাজকে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম, টিভিকে, ডিএমকে, আম আদমি পার্টি ইত্যাদি দলের প্রধান নেতা এবং নীতি নির্ধারক নেতৃত্বের বয়স ৫৬ বছরের মধ্যেই। তুলনামূলকভাবে তাঁরা কমবেশি কানেক্ট করতে পারেন যুবসমাজকে।
বিজেপির মধ্যেও বহু নেতানেত্রী আছেন কমবয়সি। কিন্তু তাঁদের কেউ দল ও সরকারের নীতি নির্ধারক নয়। কেন্দ্র অথবা রাজ্য, বিজেপি শাসিত সব সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। দলের যুব নেতৃত্ব নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এই দুজন। এই প্রথম তাঁদের দেখা গিয়েছে জেন জি আন্দোলনে ব্যাকফুটে চলে যেতে। নিছক ইনস্টাগ্রামে রিলস করে, জেন জি-র ভাষায় কথা বলে এই সমস্যা দূর করা যাবে না। বিজেপি ১২ বছর ধরে কেন্দ্রে, তাবৎ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে ক্ষমতাসীন। সুতরাং মোদি এবং অমিত শাহকে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যা কার্যকরী হয়। জেন জি-র কাছে কোনো চটকদার স্লোগান ধর্তব্য নয়। তারা বলছে, কাজ করে দেখাতে হবে। ডুট ইট নাও। ভাষণ দিয়ে লাভ নেই।
জেন জি এবং মহিলাদের ভোটব্যাংক হিসাবে পরিগণিত করার একটি সুফল রয়েছে। সেটি হল, এই প্রথম কোনো ভোটব্যাংকের বিশেষ আইডেন্টিটি নেই। অর্থাৎ উচ্চবর্ণ, অনগ্রসর, হিন্দু, মুসলিম ইত্যাদি কোনো ধাঁচে এই দুই ভোটব্যাংক আবদ্ধ নয়। জেন জি মানে হল জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল যুবসমাজ। মহিলা ভোটব্যাংকও সেরকমই। আর জেন জি-র সংগঠিত হওয়ার সুবিধা হল, কর্মহীনতা, শিক্ষার সমস্যা, উচ্চশিক্ষার সংকট, স্কিলড হয়েও রোজগার না থাকা এসবের কোনো জাতি ধর্ম হয় না। বঞ্চনায় বৈষম্য নেই। তাই সকলে বঞ্চনা, রাগ, প্রতিবাদে দ্রুত একজোট হয়ে যাচ্ছে।
শাসক বিজেপি তো বটেই, সব রাজনৈতিক দলের কাছেই উদ্বেগজনক হল, এই জেন জি-দের ক্ষোভ বিক্ষোভ আন্দোলন যেখানেই হচ্ছে, সেখানে প্রকৃত জ্বলন্ত ইস্যুর ভিত্তিতে হয়েছে। দিল্লি, পাটনা, রাঁচি, জয়পুর সর্বত্রই শিক্ষা, স্কুল, পরীক্ষা, সিলেবাস, রাস্তা, স্কুলভবন ইত্যাদির উন্নতির দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হচ্ছে ইথানল মিশ্রিত ভেজাল পেট্রল কেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার প্রতিবাদে। অর্থাৎ প্রত্যেকটি নিত্যদিনের সমস্যার প্রতিবাদে ক্ষোভের স্ফূরণ। নিছক হিন্দু, মুসলমান, দাঙ্গা, জাতপাত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এসব নিয়ে কিন্তু জেন জি আন্দোলন করছে না।
অচেনা রাজনীতির সূচনা হয়েছে। প্রকৃত দৈনন্দিন জীবন যাপনের ও ভবিষ্যৎ চিন্তা নিয়ে মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ মুখ খুলছে, প্রতিবাদ করছে, সরাসরি আক্রমণ করছে সরকারকে। আর তাই দেখা যাচ্ছে, বাকি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সরিয়ে রেখে রাহুল গান্ধী জেন জি-র সঙ্গে রাজ্যে রাজ্যে যোগসূত্র স্থাপনের একের পর এক অনুষ্ঠান করছেন। সেই মঞ্চগুলিতে নিজেই ভাষণ দিচ্ছেন এমন নয়। জেন জি প্রতিনিধিদের তুলে আনছেন। মঞ্চে তাঁদের সমস্যা, দাবি, মনোভাবের কথা মন খুলে বলতে বলছেন। এসবই রাজনীতি কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বর্তমান যুগ হল পারসেপশন তৈরির যুগ। রাহুল গান্ধী জেন জি-র বেশি কাছে চলে যাচ্ছেন, তারাও রাহুলকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন, এরকম একটি বার্তা কংগ্রেস কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে চাইছে। এখানেই বিজেপির চ্যালেঞ্জ। রাহুল ইচ্ছাকৃতভাবে বারংবার প্রতিটি মঞ্চ থেকে বলছেন, মোদিজি আপনি অতীত, জেন জি ভবিষ্যৎ। এটা আর কিছুই নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা। মোদিকে এর বিরুদ্ধ যুক্তি দিতে হবে। কী সেটা? না জানলে বিপদ!
এমতাবস্থায় বিজেপির যে সমর্থকরা মোদি বিরোধিতার কারণে ককরোচ জনতা পার্টি অথবা যুব সমাজের বিভিন্ন প্রতিবাদ ও আন্দোলনকে আক্রমণ করছে, ককরোচ নেতৃত্বকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে ফেলে অথবা তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ব্যবহার করছে, তারা বিরাট বড়ো ভুল করছে। কেন? কারণ এই প্রতিটি পদক্ষেপ জেন জি-কে আরও বেশি করে বিরূপ করে দিচ্ছে। তারা মনে করছে এইসব আক্রমণ আমাদের করা হচ্ছে। কারণ, আমরাও তো আন্দোলনে গিয়েছিলাম।
ক্ষুব্ধ এবং প্রতিবাদী জেন জি-কে বিজেপি বেশি করে আক্রমণ করলে, রাহুল গান্ধীরই কিন্তু সুবিধা হয়ে যাবে। সেটাই হচ্ছে। জেন জি মানেই ভালো, তারা যা করছে সব ঠিক করছে, এই অতি সরলীকরণ যেমন ভুল, ঠিক তেমনই আবার যেহেতু তারা কেন্দ্র বিরোধিতা করেছে, তাই তাদের আক্রমণ করা, এটাও ভুল সিদ্ধান্ত।
‘আমি ঠিক, তোমরা ভুল’। এই মনোভাব জনতার উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুরানো বদভ্যাস। জেন জি কিন্তু সবথেকে বেশি অপছন্দ করে এই মনোভাব। রাহুল গান্ধী বলতে শুরু করেছেন জেন জি-র কথা আমাদের শুনতে হবে। তারা কী চায়, কী মনে করে, কী দাবি, সমাধান কীভাবে হবে, ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনি জেন জি-র কাছে গিয়ে নিজের ভাষণ দিতে আগ্রাসী নয়। শুনতে আগ্রহী। এই কৌশলী রাজনীতির মোকাবিলা নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি নেতৃত্বকে করতে হবে। বুদ্ধি প্রয়োগ করে। হুমকি হুঁশিয়ারিতে নয়। সবার আগে মনে রাখতে হবে একটি সংখ্যা। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি মোট ভোটারের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি! সব দলের ভাগ্যনিয়ন্তা।