‘বিকশিত ভারত’-এর ঢাক যত জোরে বাজছে, বাস্তবের ভারত ততই যেন সেই ঢাকের ফাঁপা শব্দটি শুনিয়ে দিচ্ছে। নীতি আয়োগের রিপোর্ট যদি আয়না হয়, তবে মোদি সরকারের কর্মসংস্থান-নীতির মুখটি মোটেই গর্বের নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই—মাত্র আটমাসে সরকারি চাকরির ৫৫ হাজার পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ২ কোটি! অর্থাৎ একটি পদের পিছনে কয়েকশো প্রতিযোগী। তাঁদের মধ্যে শুধু বি এ, বি এসসি, বি কম পাশ যুবক-যুবতিরাই নন, রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরাও। কেন? কারণ ডিগ্রি আছে, কিন্তু সেই ডিগ্রির সঙ্গে কাজের বাজারের সম্পর্ক নেই। যে-দেশে ইঞ্জিনিয়ারও ক্লার্কের চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে আবেদন করেন, সেখানে ‘যুবশক্তি’, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কিংবা ‘নতুন ভারতের সম্ভাবনা’র প্রচার নিছক শব্দের আতিশয্য। মোদি সরকার ভারতকে অতিদ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির সাফল্যগাথা হিসাবে তুলে ধরে। কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল যদি শিক্ষিত যুবকের হাতে কাজ না-হয়ে পরীক্ষার ফর্ম রূপে পৌঁছায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই—এই উন্নয়ন কার জন্য? ৫৫ হাজার শূন্যপদের পিছনে ২ কোটি আবেদন কোনো পরিসংখ্যানমাত্র নয়, এটি সরকারের সামনে ঝুলে থাকা ভয়াবহ এক সতর্কবার্তা। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল—সতর্কবার্তাটি এসেছে বিরোধীদের কাছ থেকে নয়, সরকারেরই নীতি আয়োগের তরফ থেকে।
সমস্যার গোড়ায় রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মজগতের ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ডিগ্রি দিচ্ছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তারা তৈরি করছে না। বি এ, বি এসসি, বি কম প্রভৃতি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির দরজা খোলার চাবিকাঠি নয়, বরং চাকরির পরীক্ষায় বসার যোগ্যতার সনদমাত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং-প্রযুক্তি শিক্ষাতেও একই সংকট। শিল্প চাইছে দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তিগত ব্যবহারিক জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, ডেটা-দক্ষতা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহু ক্ষেত্রে পরীক্ষামুখী, মুখস্থনির্ভর ও ডিগ্রি-কেন্দ্রিক। ফলে নিয়োগদাতা সংস্থা উপযুক্ত কর্মী পাচ্ছে না, আর শিক্ষিত যুবরা পাচ্ছেন না উপযুক্ত সম্মানজনক কাজ বা চাকরি। এই পরস্পরবিরোধী সংকটই রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রমাণ। ‘স্কিল ইন্ডিয়া’ বা ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’র স্লোগান দিয়ে এই ব্যর্থতা ঢাকা যাবে না। শিক্ষা ও শিল্পকে পাশাপাশি হাঁটাতে হবে। পড়াশোনার সঙ্গে অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বি এ-র সঙ্গে হসপিটালিটি, বি এসসি-র সঙ্গে অ্যাপ্লায়েড টেকনোলজি, বি কমের সঙ্গে অ্যানালিটিকসের মতো কর্মমুখী কোর্স বাড়াতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বছর ধরে সরকারগুলি তাহলে কী করছিল? যুবদের হাতে ডিগ্রি তুলে দিয়ে তাঁদের কর্মজগতের জন্য অপ্রস্তুত রাখার দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে?
আর সবচেয়ে বড়ো ভ্রান্তি—সরকারি চাকরিকে এখনো নিরাপদ আশ্রয়ের শেষ দুর্গ করে রাখা। সরকারি ক্ষেত্রে সীমাহীন চাকরি নেই—এই সত্য মেনে নিয়েই বেসরকারি ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। শুধু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধির শতাংশ দিয়ে সাফল্যের সার্টিফিকেট লেখা যায় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সময়োপযোগী উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) প্রসার এবং এমন শিল্পনীতি, যাতে শিক্ষিত যুবক-যুবতিদের জন্য বাস্তব কাজের সুযোগ তৈরি হয়। মোদি সরকারের কাছে তাই প্রশ্নটি সরল: ২ কোটি যুবক-যুবতিকে ৫৫ হাজার চাকরির পিছনে ছোটানোই কি ‘বিকশিত ভারত’-এর মডেল? যুবদের হাতে কোনো একটি ডিগ্রি দিয়ে তাঁদের বেকার রেখে, পরে তাঁদেরকেই ‘স্কিলড’ হওয়ার উপদেশ দেওয়া নিষ্ঠুর প্রহসন বইকি। রাষ্ট্রের কাজ শুধু পরীক্ষা গ্রহণ নয়, ভালো কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। নীতি আয়োগ সমস্যাটি অন্তত স্বীকার করেছে। এখন মোদি সরকারের সামনে পথ একটাই—প্রচারসর্বস্বতার আড়াল সরিয়ে শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন। ‘বিকশিত ভারত’ স্লোগানে নয়, যুবক-যুবতিদের হাতে কাজেই প্রমাণিত হবে। ২ কোটি আবেদনকারীর সারি সেই পরীক্ষার খাতা খুলে দিয়েছে। এবার উত্তর দেওয়ার পালা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির।