Bartaman Logo
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধর্ম নয়, চাকরি... বদলাচ্ছে দাবি, রাজনীতিও

নিউ ইয়র্কে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেছেন, ‘মুসলিমদের যে দেশ থেকে তাড়াতে চায়, সে হিন্দুই নয়। কারণ, হিন্দুধর্ম সহনশীলতা শেখায়।’

ধর্ম নয়, চাকরি... বদলাচ্ছে দাবি, রাজনীতিও
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: নিউ ইয়র্কে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেছেন, ‘মুসলিমদের যে দেশ থেকে তাড়াতে চায়, সে হিন্দুই নয়। কারণ, হিন্দুধর্ম সহনশীলতা শেখায়।’ তিনি এমন কথা বলেই থাকেন। আগেও বলেছেন। ফারাক হল, আগে দেশে বলতেন। এখন বিদেশে গিয়ে বলেছেন। ফারাক হল, আগে এতটা উদার ভাষায় এই মনোভাব তিনি ব্যক্ত করতেন না। এজেন্ডার ফাঁকফোকর থাকত। এবার হিন্দুধর্মের উদারতা ব্যাখ্যায় তিনি একটু বেশিই দরাজ ছিলেন। কারণ কী? যেখানে তাঁর অনুষ্ঠান ছিল, তার বাইরে বেশ বিক্ষোভ-টিক্ষোভ হয়েছিল। আপত্তি জানিয়েছিলেন মেয়র মামদানি নিজেও। সেই কারণেই? নাকি জেন-জি আন্দোলনে বিজেপির বেহাল দশায় মলম-স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে সংঘ? দু’টি সম্ভাবনাই প্রবল। তবে হ্যাঁ, বক্তব্যস্থল মার্কিন মুলুক। তাই মেয়র আপত্তি জানালেও সভা বাতিল হয় না। শাসক না চাইলেও অনুষ্ঠানস্থলের বুকিং ক্যানসেল হয়ে যায় না। বলার অধিকার পাওয়া যায়। তাই সরসংঘ চালক বলেছেন। এবং স্বামী বিবেকানন্দ যে ভাষা আজ থেকে ১৩৪ বছর আগে ব্যবহার করেছিলেন, সেই ভাষায়, সেই আবহই তৈরির চেষ্টা করেছেন। ভাইচারার কথা বলে। সহনশীলতার বার্তা দিয়ে। শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী টেনে এনে... ‘যত মত তত পথ’। তবে এজেন্ডার ফাঁক কি একেবারেই ছিল না। সেটাও ছিল। নজর করতে হবে, এই বার্তালাপের মাঝে ভাগবত মহাশয় দু’টি শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘হিন্দুরাষ্ট্র হলেও’। অর্থাৎ, হিন্দুরাষ্ট্রের এজেন্ডা থেকে সংঘ সরেনি। সরবেও না। হিন্দুধর্ম উদার হবে। সংঘ নয়। তার শাখা সংগঠন নয়। হাতে গরম প্রমাণ আমেদাবাদ। মালালা ইউসুফজাই এবং অ্যানা ফ্রাঙ্কের বই স্কুলে ‘নিষিদ্ধ’ হয়। তার প্রতিবাদে ‘বই পড়ো’ কর্মসূচি নিয়েছিল পড়ুয়া ও অভিভাবকরা। তার উপর হামলা চালায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল। বলা হয়, আগে প্রমাণ করো তোমরা মুসলিম নও। জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ পশ্চিমবঙ্গ। এখানে দুর্গাপুজো নিয়ে ‘নিদান’ জারি হয়। বলা হয়, দুর্গা প্রতিমা গড়ার ক্ষেত্রে যেন কোনো ‘কায়দা’ না থাকে। যদি তার সঙ্গে থিম জড়িয়ে থাকে? তাহলেও না। দেবীর পুজোয়-প্রতিমায় আবার থিম কী? শিল্প কী? দেবীকে সাধারণের মতো দেখতে হবে না। তাঁর মধ্যে আমরা নিজের মাকে খুঁজব না। সমাজচিত্র ফুটে উঠবে না। এটাই নিদান। ‘শুচিতা’ বজায় রাখার প্রচ্ছন্ন ফতোয়া ঘোরাফেরা করে পুজো কমিটিগুলির আনাচে কানাচে। বহু বাড়ির পুজো উদ্বিগ্ন হয়... এবার কি আর নবমীতে মাকে মাছের ভোগ দেওয়া যাবে না? পুজো উদ্যোক্তারা আশঙ্কায় ভোগেন... তাহলে কি মণ্ডপ চত্বরে যে ছোটোখাটো রোলের দোকান বসে, এবার আর বসবে না? এই চারটে দিন আঁকড়েই তো কয়েকটা টাকা কামায় তারা। সেই পথ কি বন্ধ? ওরা স্টল দিলে অশুচি হবে পুজো? 

Advertisement

তা সত্ত্বেও মোহন ভাগবতের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর থেকে হিন্দু... মাথায় তিলক কেটে বা গেরুয়া উত্তরীয় কাঁধে ঝুলিয়ে যাঁদের হিন্দু হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, তাঁদের জন্য তো বটেই। চতুর্দিকে বাড়তে থাকা আগ্রাসন, চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত এবং আচরণ... তার মাঝে দাঁড়িয়ে। এখনও এই দেশে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ভিত নড়েনি—অন্তত এতটুকু স্বস্তি তাঁরা হয়তো পাচ্ছেন! রহমত পুকুর থেকে মাটি তুলে না দিলে ব্যানার্জিবাড়ির পুজো হয় না... এই সংস্কারও টলে যাচ্ছে না। স্বামীজির বাণী ছিল, ‘হে বীর, সাহস অবলম্বন কর; সদর্পে বল—আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। বল—মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, অজ্ঞ ভারতবাসী, মুচি ভারতবাসী, মেথর ভারতবাসী আমার ভাই।’ কোথাও তিনি ধর্মের উল্লেখ করেননি। বলেননি যে, হিন্দু মেথর ভারতবাসী আমার ভাই। উদারতা বোধহয় একেই বলে, তাই না? স্বামী বিবেকানন্দের থেকে বড়ো হিন্দু বা সনাতনী তো আজকের হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা কেউ নন! অথচ আজকের ‘উদারতা’র যুগে মল্লিকার্জুন খাড়্গে সভা করে যাওয়ার পর সেই জায়গা বিজেপি ‘শুদ্ধ’ করার মতো স্পর্ধা দেখায়। তারাই আবার সনাতনের কথা বলে... স্বামীজিকে আদর্শ বলে দাবি করে! এও সম্ভব?
যদি এই গোটা বক্তব্যই জেন-জিকে ধরার জন্য হয়ে থাকে, তাহলেও বলতে হবে, পর্যালোচনায় গলদ আছে। কারণ, এই প্রজন্ম ধর্মীয় আচার-আচরণ নিয়ে খুব একটা ভাবিত নয়। তারা জানতে চায়, সরকার আমাদের জন্য কী করল? শিক্ষার অধিকার, বাক স্বাধীনতা, চাকরি, মূল্যবৃদ্ধি... এইসবই তাদের ভাবনার ভরকেন্দ্রে। শুধুমাত্র রিল বানিয়ে বা হিন্দুধর্মের উদারতার কথা বলে সমাজের এই অংশটিকে ধরা যাবে না। মনে করা হচ্ছে, ২০২৯ সালে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা ৩৮ কোটিতে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, এই প্রজন্মের ভোটারই নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে। তাঁরা মন্দির-মসজিদ দেখবে না... রাস্তা কতটা ভালো, সেদিকে নজর দেবে। তারা বন্দে মাতরমে কতগুলো স্তবক, তা জানার বদলে হিসাব কষবে রান্নার গ্যাসের দামের... পেট্রল-ডিজেলের। এই সমীকরণটা কিন্তু খুব ভালোভাবে বুঝে গিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, রাজনীতির ঘরানাটাই বদলে ফেলেছেন তিনি। বিরোধী রাজনীতিকে একেবারে অন্য খাতে চালনা করতে চাইছেন। আর তাই সরাসরি কানেক্ট করছেন মানুষের সঙ্গে। জেন-জির সঙ্গে। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে। ককরোচদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকলেন না। কিন্তু বসে পড়লেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। সংসদ অভিযানে যোগ দিলেন না। কিন্তু সেই আন্দোলনে আক্রান্ত পড়ুয়াদের নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন, থানায় ধরনা দিয়ে এফআইআর নিতে বাধ্য করলেন। নেহা বোরা, রিয়া আহিরদের নিয়ে এলেন... আর নিজে পিছনে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে দিলেন সেই আগামী প্রজন্মকে। বার্তা স্পষ্ট—ওরা বলুক। আমি সঙ্গে আছি। কংগ্রেসের এই রাজনীতি ভারত আগে দেখেনি। এই রাহুল গান্ধীও আমাদের কাছে অপরিচিত। তাঁর বক্তব্য সাফ, ১) শিক্ষার অধিকার সবার। মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পাবে প্রত্যেকে। টাকা বা খুঁটির জোরে নয়। ২) সরকার সাহায্য করবে পড়ুয়াদের। তাদের শিক্ষায়। কেরিয়ার গড়ে তোলায়। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ৩) কাজের দুনিয়াতেও সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। যে ভালো পারফর্ম করবে, সে তত এগবে। ৪) কোনো একটি দল, গোষ্ঠী, সংগঠন বা সংস্থা মনোপলি চালাবে না। স্বচ্ছ পদ্ধতিতে প্রত্যেকের মধ্যে সুযোগ বণ্টন হবে। 
অনেকটা বামপন্থী ঘরানার এই রাজনীতি। অথচ পরিচিত বামপন্থা নয়। কোনো একটি শ্রেণির জন্য এই রাজনীতি গলা ফাটাচ্ছে না। বলছে না, আমরা সর্বহারার পক্ষে। বরং সব শ্রেণিকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। সাম্যবাদ থাকবে, গণতন্ত্রও। কিন্তু ক্যাপিটালিজমকে সঙ্গী করে। অনেকটা সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির ঘরানা। নতুন প্রজন্ম এটাই চায়। আর শুধু নতুন বলব কেন? আম জনতাই আজ এমনই এক ভারতের আশায় বসে। নামকরণ তারা হয়তো করেনি। কিন্তু বুঝতে পারছে, কোনো দল দেখলে চলবে না। চালের দাম, চিনির দাম দেখতে হবে। সরকারি স্কুলে ভরসা হারিয়ে বেসরকারি স্কুলের চড়া ফি-স্ট্রাকচারে গলা দিতে হবে না। ছেলেমেয়ের সাধারণ স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য বছরে ছ’-সাত লক্ষ টাকা খরচ হবে না। এর জন্য রাজনীতি যাই হোক, দলের নাম যা খুশি হোক, নেতার ভূমিকায় যে-ই থাকুন... দিনের শেষে প্রাপ্তিটাই আসল। ধর্ম নয়। রাজনীতিও নয়। আমার ছেলেমেয়ে কী খেল, কোন স্কুলে পড়তে গেল, তার স্বপ্ন সফল হল কি না... এর বাইরে আর কিছুই থাকছে না। রাহুল গান্ধী যদি আড়াই বছর এই ধারা বজায় রাখতে পারেন (বহু ক্ষেত্রেই তিনি ভালো শুরু করে নার্ভাস নাইন্টিতে আউট হয়ে থাকেন), তাহলে শুধু ধর্ম আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেল্লাফতে করা যাবে না। ভক্তি আর অতিভক্তির মধ্যে ফারাকও এখন আম জনতা বুঝে ফেলছে। রবি ঠাকুর বহু বছর আগে লিখে গিয়েছেন, ‘ভক্তি আসে রিক্তহস্ত প্রসন্নবদন/অতিভক্তি বলে, দেখি কী পাইলে ধন!/ভক্তি কয়, মনে পাই, না পারি দেখাতে/অতিভক্তি কয়, আমি পাই হাতে হাতে।’ প্রাপ্তির ফিল্টারে এখন ভক্তি ও অতিভক্তির পৃথকীকরণ চলছে। আড়াই বছর সময়টা বিরোধী রাজনীতির জন্য অনেক... কিন্তু শাসকের জন্য? বোধহয় নয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ