Bartaman Logo
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দ্রুত গতি শুধু নয়, রাস্তার গর্তও দুর্ঘটনার কারণ

দেশের মানুষ নিরীহ ও সামান্য একটি আবেদন রেখেছে প্রশাসনের কাছে

দ্রুত গতি শুধু নয়, রাস্তার গর্তও দুর্ঘটনার কারণ
  • ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়: দেশের মানুষ নিরীহ ও সামান্য একটি আবেদন রেখেছে প্রশাসনের কাছে। পুলিশ তো হেলমেট পরা বা মদ খেয়ে গাড়ি না চালানো ইত্যাদি নিয়ে সচেতনামূলক নির্দেশিকা রাস্তায় রাস্তায় টাঙায়, সেরকমই সতর্কতামূলক বোর্ড পুলিশ ঝোলাক, তাতে কোন রাস্তায় কতগুলি গর্ত আছে তা যেন লেখা থাকে। এই যেমন, ‘সামনে ১০ মিটার দূরে বাঁদিক ঘেঁষে একটি চার ফুটের গর্ত আছে। দেখে গাড়ি চালান’ ইত্যাদি। তবে জোরদার আবেদন উঠলেও দেশের পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Advertisement

রাজনীতিতে যেমন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন গা সওয়া হয়ে গিয়েছে ভারতের নাগরিকদের, তেমনই রাস্তায় গর্ত তৈরি হওয়া যে প্রশাসনিক গাফিলতি, তা নিয়েও কেউ মাথা ঘামায় না। এই বিষয়টিও গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে প্রশাসনিক গাফিলতিতে একের পর এক মৃত্যু, মায়ের কোল খালি করে, স্ত্রীকে বিধবা করে, সন্তানকে অনাথ করে যে প্রাণগুলি রাস্তায় অকালে ঝরছে, তার বিচার কীভাবে হবে? 
একটি ছোটো গর্ত কখনো কখনো একটি পরিবারের জীবনে চিরস্থায়ী শূন্যতা তৈরি করতে পারে। মোটরবাইকের চাকা গর্তে পড়ল, চালক ভারসাম্য হারালেন, পিছন থেকে ছুটে এল ট্রাক বা বাস তারপরই অপঘাতে মৃত্যু। দুর্ঘটনার রিপোর্টে লেখা রইল ‘চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার।’ কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল, চালক কেন নিয়ন্ত্রণ হারালেন? সেই প্রশ্নের উত্তর রাস্তার গর্তেই মুখ লুকোয়। ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে এক্সপ্রেসওয়ে, জাতীয় সড়ক, চার লেন, ছয় লেন। কোথাও উদ্বোধনের আগেই রাস্তার ছবি তোলা চলছে। কোথাও প্রকল্পের বিশাল ফলক বসছে। আর চকচকে সে বিজ্ঞাপনের আড়ালে ক্রমশ বড়ো হচ্ছে রাজপথের গর্ত।
ছোটো একটি পরিসংখ্যান, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথস অ্যান্ড সুইসাইডস ইন ইন্ডিয়া (এডিএসআই) রিপোর্ট জানিয়েছে, ভারতে ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার। জাস্ট একবার ভাবুন, প্রায় দু’লক্ষ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেন না। ভাবুন, তাঁদের পরিবারের অবস্থা কী হল? ভাবুন, রাস্তার গর্ত নিয়ে তারপরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যে রাষ্ট্র মহাকাশ পাড়ি দিচ্ছে, যে দেশ হাজার হাজার কোটি টাকার এক্সপ্রেসওয়ে বানানোর দাবি করছে, সেই রাষ্ট্রের নাগরিককে রাস্তার গর্তে পড়ে মরতেও হচ্ছে! এ লজ্জা গোটা দেশের, দেশের সরকারের। রাজপথে গর্ত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু দিনের পর দিন সে গর্ত মেরামত করা হয় না, এ মনোভাব অস্বাভাবিক। মৃত্যুর অপেক্ষায় ফাঁদ পেতে রাখে প্রশাসনিক ‘অপদার্থতা’। তা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করে কই!
সরকার আছে। উন্নয়নের বিজ্ঞাপন আছে। পাশাপাশি মরণফাঁদ গর্তও আছে বহাল তবিয়তে। দেশ এগচ্ছে। দ্রুত নাকি এগচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তার বুক ফেটে তৈরি হচ্ছে গর্ত। সে গর্ত যত বড়ো হচ্ছে উন্নয়নের বিজ্ঞাপনও তত চকচকে হচ্ছে। এ এক অভিনব ভারতীয় উন্নয়ন মডেল। যার উপরে এক্সপ্রেসওয়ে আর নীচে গর্ত। সামনে উদ্বোধনের ফলক, তার পিছনে আসছে অ্যাম্বুল্যান্স, তারপর সোজা হাসপাতালে। তারপর কাগজে লেখা হল, চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেছেন।’ বছরভর রাস্তা বানানো হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে। টোল প্লাজায় নাগরিকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ব্যবস্থাও দিব্যি সচল। শুধু রাস্তার যে অংশ দিয়ে নাগরিকদের নিরাপদে যাওয়ার কথা, সেটুকুর রক্ষণাবেক্ষণই শুধু হয় না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪, এই পাঁচ বছরে গর্তের কারণে ভারতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ৪৩৮ জন। ২০২৪ সালে গর্তে পড়ে মৃত্যু ২ হাজার ৩৮৫ জনের। ২০২০ সালে সংখ্যাটা ছিল ১ হাজার ৫৫৫, অর্থাৎ প্রায় ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটল। প্রতিবছরই মানুষ মরছে। বছর বদলাচ্ছে, পরিসংখ্যান বদলাচ্ছে, সরকারের ভাষণ বদলাচ্ছে, শুধু গর্তের চরিত্র বদলাচ্ছে না। ভারতবর্ষে প্রতিদিন বাবা কিংবা মা বা একজন ছাত্র, অথবা এক শ্রমিক, অফিসযাত্রী বা যে অন্য কেউ গর্তে পড়বেনই পড়বেন। তারপর কোনো সরকারি রিপোর্টে লেখা হবে, ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’। বা ‘চালকের গাফিলতি’ বা ‘অতিরিক্ত গতি’। অবশ্যই লেখা হবে, দুর্ভাগ্যজনক! কিন্তু সরকারকে জিজ্ঞেস করা হবে না, দুর্ভাগ্য কি আকাশ থেকে নেমে এসেছে? রাস্তার গর্ত তার কোনো কারণ নয়? প্রশাসনের গাফিলতি তার জন্য দায়ী নয়?
সরকার প্রকাশিত আর একটি রিপোর্ট দেখা যাক। ২০২২ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিল কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রক নিজে। তাতে দেখা গিয়েছে, পথ দুর্ঘটনায় প্রতিদিন দেশে ৪৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন দেশজুড়ে কমপক্ষে ১ হাজার ২৬৪টি পথ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ প্রবণতা চলছেই। আর সরকার বলছে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে হচ্ছে রাস্তার কাজ। সে কথা মানলে বলতে হয়, সমস্যা শুধু টাকা খরচের নয়। সমস্যা রাস্তা তৈরির মান, রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার। কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১৫ বছরের এক কিশোরকে একটি পে-লোডার চাপা দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছিল, ঘটনাস্থলে রাস্তার গর্ত মেরামতের কাজ চলছিল। নির্মাণের ত্রুটির কারণে কয়েকদিন পরপর রাস্তা খারাপ হলে এরকম ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। 
আরও একটি পরিসংখ্যান। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, গত পাঁচ বছরে ৯ হাজার ৪৩৮ মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র রাস্তার গর্তের কারণে।
ভারতে কোনো নাগরিকের মোটরবাইক গর্তে পড়লে সেটিকে বলা হয় ‘দুর্ঘটনা’। তারপর হবে কৌতুকপূর্ণ বিশ্লেষণ। তদন্তে দেখা হবে, গাড়ির চালকের লাইসেন্স ছিল কি না। হেলমেট পরেছিলেন কি না। গতি কত ছিল ইত্যাদি। কিন্তু রাস্তায় গর্ত কেন ছিল? কত দিন ধরে ছিল? সে বিষয়ে কতবার অভিযোগ জমা পড়েছিল? রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? শেষ কবে রাস্তা পরীক্ষা করা হয়েছিল? নিম্নমানের কাজ হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলি দুর্ঘটনার তদন্তের কেন্দ্রে আসবে না। দায় শুধু বর্তাবে সেই মানুষের উপর যাঁর গর্তে পড়ে মৃত্যু হল।
সরকারের টোল নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু নিরাপদ রাস্তা দেওয়ার দায় নেই। টোল বুথে নাগরিকের টাকা নিখুঁতভাবে পৌঁছে যায়। কিন্তু রাস্তার গর্তে নাগরিকের জীবন গেলে দায় যায় হারিয়ে। এই ব্যবস্থা কৌতুক ছাড়া আর কী? 
রাস্তার সঙ্গে সরকারের অর্থনীতির এক অদ্ভুত সম্পর্ক। রাস্তা বানানোর পর কিছুদিনের মধ্যে খারাপ হয়। সরকার টাকা খরচ করে। রাস্তা আবার খারাপ হয়। সরকার আবার টাকা খরচ করে। রাস্তা আবার খারাপ হয়। নাগরিক আবার অভিযোগ করেন। তারপর বর্ষা আসে। গর্ত বড়ো হয়। এ যেন ‘গর্ত অর্থনীতি’! রাস্তা যত খারাপ, মেরামতের সম্ভাবনা তত বেশি। শুধু নাগরিকের প্রাণটা এই অর্থনীতির হিসাবের বাইরে। 
রাস্তা ভাঙে, কিন্তু যুক্তি ভাঙে না প্রশাসনের। যুক্তির অভাব নেই। বৃষ্টি হয়েছে। জল জমেছে। ইউটিলিটি সংস্থা রাস্তা কেটেছে। ঠিকাদার ঠিক কাজ করেনি। নাগরিকরা নিয়ম মানেননি। আর যুক্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে সত্য। রাস্তা নিরাপদ রাখার দায়িত্ব কার? যদি বৃষ্টি দায়ী হয়, তাহলে বর্ষার আগে প্রস্তুতি কোথায়? যদি ইউটিলিটি সংস্থা রাস্তা কাটে, তাহলে পুনরুদ্ধারের মান নিয়ন্ত্রণ কোথায়? যদি ঠিকাদার দায়ী হয়, তাহলে ব্ল্যাকলিস্ট কোথায়? যদি আধিকারিকের নজরদারির অভাব হয়, তাহলে শাস্তি কোথায়? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু নতুন রাস্তা বানানোর বিজ্ঞাপন দিলে সমস্যা মেটে না। কারণ রাস্তা বানানো যেমন উন্নয়ন তেমন রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ প্রশাসনিক দায়িত্ব। ভারতে প্রথমটির ছবি অহরহ দেখা যায়। দ্বিতীয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।
এই আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের ভয়ঙ্কর দিকটি হল, নাগরিকরা রাস্তায় গর্ত থাকবে বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। অটোচালক গর্ত দেখে বাঁক নেন। বাইকচালক গতি কমান। বাসযাত্রী ধাক্কা খান। অ্যাম্বুল্যান্স কোনোরকমে পাশ কাটায়। স্কুলবাস সতর্ক হয়ে চলে। এতেই অভ্যস্ত গোটা দেশ। গর্তটি থেকেই যায়। আর রোজই কারও না কারও জীবন কাড়ে। সময় এসেছে প্রশ্নগুলি একটু অন্যভাবে করার। সরকারকে শুধু জিজ্ঞেস করলে হবে না, ‘রাস্তা কবে সারাবেন?’ প্রশ্ন করতে হবে, ‘এই গর্ত থাকার দায় কার? গর্ত চিহ্নিত হওয়ার পর কত ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সেই সময়সীমা ভাঙলে কোন আধিকারিক দায়ী হবেন? নিম্নমানের রাস্তা তৈরির পর ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কতবার ব্যবস্থা হয়েছে? গর্তজনিত মৃত্যুর ঘটনার কতগুলি প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে? কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?’ প্রশ্ন তুলতেই হবে। কারণ গর্তে পড়ে মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, তা হল প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। মৃত্যুর পর দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে চলা চলবে না। রাস্তার গর্ত সম্পর্কে প্রশাসন কি ওয়াকিবহাল ছিল? না থাকলে কেন ছিল না? থাকলে কেন সারানো হয়নি? প্রশ্ন তুলতেই হবে। ভোট দিয়ে যাকে মসনদে বসানো হয়েছিল তার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে?
বাঁশদ্রোণীর মৃত বাচ্চাটির বাবা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন, রাস্তা দ্রুত নিরাপদ করা হোক। যাতে আর কোনো পরিবারকে তাঁর মতো শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ