সব্বাই আসলে শক্তেরই ভক্ত। দুর্বলকে চোখ রাঙানো, গলা চড়ানো, ফতোয়া দেওয়া সহজ; শক্তের সামনে সেই গলাতেই হঠাৎ মধু এসে যায়। দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে ছাত্র-যুবদের বিরুদ্ধে একের পর এক এফআইআর করেছিল ডবল ইঞ্জিন সরকার। আন্দোলন দমাতে পুলিশ নামানো হয়েছিল, মামলা করা হয়েছিল দিল্লি, অসম, মহারাষ্ট্র, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে। ককরোচ জনতা পার্টি ফের মিছিলের ডাক দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই মামলাগুলি প্রত্যাহারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হল কেন্দ্রকে। আর সেই আরজির প্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার শীর্ষ আদালত সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ওই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের এফআইআর বাতিলের নির্দেশ দিল। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত শুনানিতে সাফ বলে দিলেন, ‘বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কোনো অপরাধ নয়।’ কেন্দ্র জানাল, ভবিষ্যতেও এই আন্দোলন নিয়ে আর এফআইআর করা হবে না। এমনকি নিটকাণ্ডের জেরে আত্মঘাতী পড়ুয়াদের পরিবারকে তিন মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে সরকার প্রথমে পুলিশ দিয়ে আন্দোলন ঠেকাতে চেয়েছিল, মামলা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল, সেই সরকারই শেষ পর্যন্ত আদালতে এসে প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলেছে। এই অসম্ভব কাজ সম্ভব হল কীভাবে? সহজ উত্তর, ছাত্ররা মাথা নত করেনি বলে। সাধারণ মানুষও নির্ভয়ে একজোটে রাস্তায় নেমে আসার সাহস দেখাতে পেরেছে বলে। তাদের সম্মিলিত চাপে ৫৬ ইঞ্চির ছাতির সরকারও শেষপর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, হামলা করে, মামলা করে গণআন্দোলনকে দমন করা যায়নি, যাবেও না!
সরকারের এই পশ্চাদপসরণ একদিনে হয়নি। একটি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মন্তব্য থেকেই আগুনের সূত্রপাত। ককরোচ জনতা পার্টি প্রথমে বিক্ষোভ-অনশন কর্মসূচি শুরু করল। ধীরে ধীরে তা পরিণত হল জেন জি আন্দোলনে। তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করিয়েই সরকার ভেবেছিল, আগুন বোধহয় নিভে গেল। কিন্তু আগুন নেভেনি, ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি ফের তাকে জ্বালিয়ে দিল। তারপর দিল্লিতে মিছিলের ডাক। অভিজিৎ দিপকেরা বুঝিয়ে দিলেন, সরকারের দিকে ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নগুলো মুছে যায়নি। ব্যস, সেই মিছিলের এক ঘোষণাই বদলে দিল সরকারের সুর। এই ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য তাই খুব পরিষ্কার—ক্ষমতা স্বেচ্ছায় কিছু দেয় না, সরকারকে দিতে বাধ্য করতে হয়। এটাই গণতন্ত্রের আসল শক্তি। ক্ষমতার হাতে পুলিশ আছে, প্রশাসন আছে, মামলা আছে। নাগরিকের হাতে আছে একটাই অস্ত্র—একজোট হয়ে দাঁড়ানো। আর এখানেই লুকিয়ে ‘শক্তের ভক্ত’ প্রবাদটির মর্মার্থ। দুর্বলকে দেখে যারা বাঘের মতো গর্জায়, শক্তির সামনে তারাই বিড়ালের মতো মিউমিউ করে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ এবং সরকারের সুরবদল তাই শুধু একটি আন্দোলনের সাফল্য নয়, যারা ভাবেন ক্ষমতা পেলেই মানুষকে ভয় দেখানো যায়, তাঁদের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
এই শিক্ষা পশ্চিমবঙ্গের নতুন ক্ষমতাধরদেরও এখনই নেওয়া উচিত। পালাবদলের পর কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী-সমর্থকের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিন মাসের ক্ষমতাতেই তিন পুরুষের জমিদারি পেয়ে গিয়েছেন। তাদের অনুরোধের গলায় ফতোয়ার প্রতিধ্বনি, তাদের প্রতিবাদে রংবাজির গন্ধ আর সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলেই ‘সেকু-মাকু’ তকমা—সব মিলিয়ে পুরানো দাদাগিরির নতুন সংস্করণ। কিন্তু মনে রাখবেন, আজ যাঁকে একা পেয়ে হুমকি দিচ্ছেন, কাল তাঁর পাশে আরও দশজন দাঁড়াতে পারেন। পরশু একশো জন। তারপর হাজার...লক্ষ। তখন থানা থাকবে, পুলিশ থাকবে, ক্ষমতার পরিচয়পত্রও থাকবে—শুধু দাদাগিরিটা থাকবে না। দিল্লি তথা দেশের ছাত্র-যুবরা কোনো সরকার ফেলে দেয়নি। বরং তার চেয়েও জরুরি একটা কাজ করেছে—সরকারকে তার সীমা মনে করিয়ে দিয়েছে। শক্তেরই তো ভক্ত সবাই। আর মানুষ একবার শক্ত হয়ে দাঁড়ালে মোদি সরকার হোক, মহামহিম আদালতের কেউ হোক, কিংবা সদ্য ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া কোনো নতুন সংগঠন— সবাইকে সুর বদলাতেই হয়। তাই দাপট দেখানোর আগে চারপাশটা একবার দেখে নিন!