Bartaman Logo
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শতবর্ষে উত্তমের ছবিগুলির সংরক্ষণই হবে যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য

মৃত্যুর পরও একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে। ভাস্কর, চিত্রকর থেকে শুরু করে অভিনেতা সবার ক্ষেত্রেই তা সত্য।

শতবর্ষে উত্তমের ছবিগুলির সংরক্ষণই হবে যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: মৃত্যুর পরও একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে। ভাস্কর, চিত্রকর থেকে শুরু করে অভিনেতা সবার ক্ষেত্রেই তা সত্য। কিন্তু তাঁর শিল্পেরই যদি অস্তিত্ব না থাকে? তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেই শিল্পীকে চিনবে কীভাবে, শুধুই তাঁর সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণায়? অন্যের লেখায়? তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সম্যক পরিচয় ব্যতিরেকেই? নিজের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কি শুধুই শিল্পীর, সমাজের কোনো দায়িত্ব নেই? 

Advertisement

প্রশ্নগুলো উঠছে। কারণ বাঙালির গর্ব মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মের একশো বছর পূর্ণ হল আজ। রাজ্য সরকার উদ্যোগী হয়েছে উত্তমের শতবর্ষ পালন করতে। তৈরি হয়েছে একটি কমিটি। যে কমিটির মাথায় রয়েছেন, মিঠুন চক্রবর্তী, সন্দীপ রায়, প্রসেনজিতের মতো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্বরা। বছরভর এই কমিটি কী কী কর্মসূচি পালন করবে তার একটা রূপরেখাও সামনে এসেছে। কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত সিনেমাগুলিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ কতটা সফল হল? দুশোর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন মহানায়ক। তার মধ্যে কতগুলি ছবি এখনও দেখানোর মতো অবস্থায় আছে? যেগুলি আছে, সেগুলিই বা কতদিন ভালো থাকবে? সেগুলির সংরক্ষণ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা কি করেছে সরকার বা সরকারি উদ্যোগে গঠিত উত্তম জন্ম শতবর্ষ কমিটির সদস্যরা? উত্তমকুমারের সিনেমাগুলি নিয়ে কোনো আর্কাইভ করার ভাবনা কি আছে? প্রশ্ন অনেক। 
এইসব প্রশ্নের কয়েকটির উত্তর মিলেছে, যদিও তা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়নি। যেমন, নবান্নের একটি সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, বিগত রাজ্য সরকার উত্তমকুমারের ১৪টি সিনেমা এনএফডিসিতে পাঠিয়েছিল রেস্টোরেশনের জন্য। তার মধ্যে পাঁচটি সিনেমার রেস্টোরেশন সম্পূর্ণ করে এনএফডিসি রাজ্য সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই পাঁচটি সিনেমা হল— ‘দেয়া নেয়া’, ‘আলো আমার আলো’, ‘জতুগৃহ’, ‘কমললতা’ ও ‘অভয়ের বিয়ে’। এই ছবিগুলি কবে কোথায় দেখানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে ‘উত্তমকুমার জন্ম শতবর্ষ কমিটি’। হতে পারে সেগুলি উত্তমকুমারের জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে দেখানো হবে অথবা আসন্ন কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখানো হতে পারে। কিন্তু ছবিগুলির কমার্শিয়াল রিলিজের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দরকার ছিল ছবিগুলির কমার্শিয়াল রিলিজের। কিছু মাস আগেই সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘নায়ক’ ছবির পুনর্মুক্তি উপলক্ষ্যে প্রিয়া সিনেমায় দর্শকের যে ভিড় দেখা গিয়েছিল, তাতে এই ছবিগুলির পুনর্মুক্তি ঘটলে মানুষ দেখতে যাবেন বলেই আশা করা যায়। এসব থেকে বড়ো কথা সরকারের হাতে বেশ কয়েকটি হল যখন রয়েছে তখন ছবি পাঁচটি পালা করে রিলিজ করাই যেতে পারে। 
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, একটি বেসরকারি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের তরফেও উত্তমকুমারের গোটা পঞ্চাশেক ছবিকে ফোর কে রেজোলিউশনে রেস্টোর করা হয়েছিল। সেই ছবিগুলি অবশ্য ওই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সবাই দেখতে পারেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত উত্তমের প্রায় ৫৫টি ছবি রেস্টোর করা হয়েছে এবং আরও ৮টি ছবি রেস্টোর করার কাজ চলছে। কিন্তু ঘটনা হল, এই ছবিগুলি বাদেও উত্তমকুমারের বহু ছবি এখনও এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যেগুলির রেস্টোরেশন এবং সংরক্ষণ অবশ্য প্রয়োজন। সেগুলি রেস্টোরেশনের উদ্যোগ কি নেওয়া হবে? এই প্রশ্ন আপামর বাঙালির। 
উত্তমকুমারের সিনেমাগুলি সংরক্ষিত হলে শুধু উত্তমই নন, তাঁর সঙ্গে আরও যাঁরা অভিনয় করেছেন, সংরক্ষিত থাকবে তাঁদের অভিনয়ও। যাঁরা সেইসব ছবি পরিচালনা করেছিলেন একইসঙ্গে থেকে যাবে তাঁদের কাজও। পরবর্তীকালে কেউ যদি বাংলা সিনেমায় অভিনয়ের বিবর্তন বা পরিচালকদের কাজ নিয়ে কোনো গবেষণা করতে উদ্যোগী হন, তবে এই আর্কাইভ থেকে তিনি দেখে নিতে পারবেন ছবিগুলি। তখনকার ছবিগুলি তো সময়ের দলিলও। শুধুই সিনেমা নিয়ে নয়, সমাজবিদ্যার গবেষকরাও এর দ্বারা উপকৃত হবেন। 
মুশকিল হল, উত্তমকুমার যে সময়ে অভিনয় করেছেন, তখন সিনেমা তোলা হতো সেলুলয়েডের ফিল্মে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সযত্নে রক্ষিত না হলে সেসব ছবির প্রিন্ট ও নেগেটিভ বেশিদিন থাকার কথা নয়। এ কথা ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত সবাই জানেন। তাই উচিত যত দ্রুত সম্ভব বেঁচেবর্তে থাকা বাকি ফিল্মগুলিকে ডিজিটালি কনভার্ট করা। শুধু ডিজিটালি কনভার্ট করলেই হবে না। ছবিগুলিকে ‘ফ্রেম টু ফ্রেম’ কারেকশন করে ফোর কে রেজোলিউশনে কনভার্ট করতে হবে। যা সময় এবং খরচ সাপেক্ষ। রাজ্যের নতুন সরকার কি নেবে সেই উদ্যোগ? 
দুশোরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন উত্তমকুমার। সেইসব সিনেমার বেশিরভাগেরই প্রিন্টের কোনো খোঁজ নেই। বিশেষত তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলির। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কাছে কিছু কিছু ছবির প্রিন্ট রয়েছে, কিন্তু সেগুলিরও অধিকাংশই নষ্ট হতে বসেছে। যেমন ‘জয়জয়ন্তী’ ও ‘মায়ামৃগ’ ছবি দু’টি একটি বেসরকারি চ্যানেলের হাতে রয়েছে এবং ওই চ্যানেল সূত্রে খবর, ছবি দু’টি আর চালানোর মতো অবস্থায় নেই। সরকার তো পারে এই ছবি দু’টিকে নিয়ে রেস্টোরেশনে পাঠাতে। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। মহানায়কের এরকম বহু ছবি এদিক ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে। অনেক ছবির 
প্রিন্ট মালিকানা নিয়ে জটে স্রেফ হারিয়ে গিয়েছে। সব থেকে বড়ো সমস্য হয়েছে, আগেকার দিনের ফিল্ম ল্যাবরেটারিগুলি উঠে গিয়ে। যেখানে ক্যানে বন্দি ফিল্ম থেকে প্রিন্ট তৈরি করা হতো। আগেকার দিনের সিনেমা দেখলে টাইটেল কার্ডে দেখা যাবে, পরিস্ফূটনে অমুক ল্যাবরেটরি বলে লেখা রয়েছে। ফিল্ম ল্যাবরেটারিগুলি ওই কাজটিই করত। সেইসব ল্যাবরেটরিতেই সংরক্ষিত থাকত অনেক ছবির নেগেটিভ ও প্রিন্ট। 
সিনেমা ডিজিটাল হয়ে ওঠায় সেইসব ফিল্ম ল্যাবরেটারির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই মৃত্যু হয়েছে ল্যাবেরটারিগুলির। সেগুলিতে সংরক্ষিত ছবির প্রিন্ট ও নেগেটিভের ক্যানগুলিরও হদিশ নেই। সেগুলি এখন কোথায় কী অবস্থা রয়েছে, সেটাই বড়ো প্রশ্ন। 
সম্প্রতি চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবিটির রেস্টোরেশন হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, উত্তমকুমার শুধু নয়, সেই সময়কার অনেক বাংলা ছবিই সংরক্ষণযোগ্য। তা করা গেলে বাংলা সিনেমার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু তা করতে গেলে দরকার অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ও পরিচালকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে তাঁদের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করার। সরকার যদি তাঁর কাছে পরামর্শ চায়, তবে তিনি এই প্রস্তাব রাখবেন বলে জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে একথাও সত্যি যে, শুধু সরকারি উদ্যোগই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এগিয়ে আসতে হবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থগুলিকেও। উত্তমের ছবি যেসব প্রযোজক, পরিবেশক সংস্থার হাতে রয়ে গিয়েছে এখনও, তাঁদেরও এগিয়ে আসতে হবে। রেস্টোরেশন বেশ খরচ সাপেক্ষ। রাজ্যের বড়ো শিল্প সংস্থাওগুলিকেও এ কাজে সাহায্য করার প্রস্তাব রাখা যেতে পারে। প্রতিটি বড়ো শিল্প সংস্থারই ‘সামাজিক দায়িত্ব’ পালনের জন্য কিছু অর্থ ব্যয় করার কথা। সেই তহবিল থেকে সংস্থাগুলি সাহায্য করতেই পারে। কিন্তু যাই করা হোক, এর জন্য সরকারের তরফে উদ্যোগ দরকার। 
রাজ্য সরকার অবশ্য উত্তমের স্মৃতি রক্ষার্থে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে যা প্রশংসাযোগ্য। যেমন, নিউটাউনে উত্তমকুমারের নামাঙ্কিত একটি ফিল্ম সেন্টার গড়ে তোলা হবে যেখানে দু’টি সিনেমা হল, ওপেন এয়ার স্টেজ, স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষ ইত্যাদি তৈরি হবে। সেখানেই যদি উত্তমকুমারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে একটি স্থায়ী প্রদর্শনী ও তাঁর অভিনীত ছবিগুলির একটি আর্কাইভ গড়ে তোলা যায় তো সোনায় সোহাগা। 
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই বলে গিয়েছিলেন, বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। এ কথা অনস্বীকার্য। বর্তমান রাজ্য সরকার যদি তাঁর কথাকে ভুল প্রমাণ করতে পারে তবে তা একাধারে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও উত্তমকুমারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হবে। বাঙালি ফিরে পাবে তার শিকড়কে।   

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ