সমৃদ্ধ দত্ত: ক্লাস থ্রিতে ওঠা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ দ্বিতীয় শ্রেণির টেক্সট বই পড়তে এবং বুঝতে পারছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া পড়ুয়াদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ অংশ চতুর্থ শ্রেণির বইতে সে কী পড়েছে সেটা মনে করতে পারছে এবং আবার পড়তে পারছে। বাকিরা পারছে না। ৩১ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী চতুর্থ শ্রেণির অঙ্ক আবার করতে পারে। বাকিরা পারছে না। ৬৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ভারতে ক্লাস টেনের পর পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। ৫২ শতাংশ ছেড়ে দিচ্ছে অষ্টম শ্রেণির পর। ভারতে স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ছে শুধু এটাই নয়, শিক্ষা প্রক্রিয়াও চরম উদ্বেগজনক অবস্থায়। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক কিংবা প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট অথবা ‘প্রথম এনজিও’ ইত্যাদি ভারতের শিক্ষা সংক্রান্ত সমীক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত সংস্থা ও সরকারি বিভাগের প্রতিটি সমীক্ষায় সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার নীচুতলার যে চিত্র উঠে আসছে সেটি ভারতের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। শিক্ষামন্ত্রকের ২০২৫ সালের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পাঠরত পড়ুয়ার সংখ্যা কমবেশি ১১ কোটি। আবার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত পাঠরতদের সংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি। নবম ও দশক শ্রেণির ছাত্রছাত্রী সংখ্যা তখন সাড়ে ৩ কোটি। আবার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এই সময়সীমায় মাত্র ২ কোটি ৭০ লক্ষ। এই পরিসংখ্যান থেকে কী বোঝা যাচ্ছে? সেটি হল, যত উপরের ক্লাসে ওঠা যাচ্ছে, ততই ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এদিকে বহু রাজ্যে পাশ-ফেলও নেই। সুতরাং ফেল করে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে এমন নয়। ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি সমীক্ষার রিপোর্টে ২০২১ সালে দেখা গিয়েছিল, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি ছাত্রদের মধ্যে শহুরে এলাকায় ৭৬ শতাংশ স্কুলে পড়ছে দেশজুড়ে। গ্রামে এই সংখ্যা আরও কম, ৬৯ শতাংশ। সুতরাং ২৫ থেকে ৩১ শতাংশ ছাত্রছাত্রীরা ওই বছরে অর্থাৎ কোভিডকালে কোনো স্কুলে পড়ছিল না। সমস্যা হল, কোভিডকাল পেরিয়ে এসেছে ভারত। কিন্তু ২০২৫ সালের রিপোর্টে বিশেষ উন্নতি দেখা যায়নি। এটাই সরকার এবং শিক্ষামহলের কাছে সবথেকে বেশি উদ্বেগজনক যে, যারা একবার স্কুলছুট হয়ে যাচ্ছে, তাদের আবার স্কুলে ফিরে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
দক্ষিণ ভারতে একমাত্র অন্ধ্রপ্রদেশ ছাড়া বাকি সব রাজ্যে সাক্ষরতা হার ৮০ শতাংশের বেশি। শুধু অন্ধ্রপ্রদেশে ৭৩ শতাংশ। কিন্তু উত্তর ভারতে বিপরীত। হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশ ছাড়া আর সব রাজ্যে সাক্ষরতার হার ৮০ শতাংশের কম। দক্ষিণ ভারতে ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সি পড়ুয়াদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো না কোনোভাবে উচ্চশিক্ষার কোর্সে যুক্ত। সেটা সরকারি বা বেসরকারি ম্যানেজমেন্ট অথবা ডিগ্রি কোর্স হতে পারে। কিন্তু দিল্লি, চন্ডীগড়, হিমাচল প্রদেশ ছাড়া উত্তর ভারতের অন্য রাজ্য এই প্রবণতায় পিছিয়ে। গুজরাতে মাত্র ২৪ শতাংশ।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি তো দূর অস্ত। রাজ্যে রাজ্যে প্রাথমিক স্কুলগুলির পরিকাঠামোই কার্যত সবথেকে উদ্বেগ ও লজ্জার সৃষ্টি করেছে। কোথাও ছাদ নেই, কোথাও দেওয়াল নেই, কোথাও দেখা গিয়েছে গোয়ালঘরে ক্লাস হচ্ছে এবং গোরু বাছুরের পাশেই ছাত্রছাত্রীদের বসতে হচ্ছে। একজন শিক্ষক, একজন শিক্ষিকা নিয়ে স্কুল চলছে। দিনের পর দিন শিক্ষক ও শিক্ষিকা আসেন না, এরকমও উদাহরণ বিস্তর।
ঠিক এই সংকটের মধ্যে নতুন সমস্যা হল, বিভিন্ন রাজ্যে এক নয়া প্রবণতার জন্ম হয়েছে। সেটি হল, প্রাথমিক স্কুলকে অন্য কোনো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া। সেটি আপাতভাবে মনে হবে ভালোই ব্যবস্থা। কিন্তু সমস্যা হল, প্রাথমিক স্কুলগুলি হয় গ্রামের মধ্যে, অথবা বাড়ির কাছে, সামান্য হেঁটে ছাত্রছাত্রীরা পৌঁছতে পারে। পক্ষান্তরে যখনই এইসব স্কুলকে যুক্ত করা হচ্ছে মাধ্যমিক স্কুলের সঙ্গে, তখনই সেটি হয়ে পড়ছে বাড়ি থেকে দূরে। শহরে বসে আন্দাজ করা শক্ত যে, গ্রামাঞ্চলের বহু প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ভরা বর্ষায় সবথেকে কাছের বড়ো স্কুলে যাওয়া পাহাড় পেরনোর থেকেও বড়ো সংগ্রাম। আর এভাবে বিভিন্ন রাজ্য থেকে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রাথমিক স্কুলকে যখনই বড়ো স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, তারপরই হু হু করে কমে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। অর্থাৎ অত দূরে আর কেউ আসতে চাইছে না। তার পরিণতি হল, আরও বেশি করে স্কুল ড্রপআউট সংখ্যা বৃদ্ধি। সরকারি স্কুল পরিদর্শকদের উপর নানাবিধ দায়িত্ব থাকে। কিন্তু সরকারের উচিত প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিয়ম করে হাজির হয়ে সেখানে শিক্ষাদানরত শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের থেকে জেনে নেওয়া যে, প্রকৃত সমস্যা ঠিক কোথায় হচ্ছে। কী করা উচিত। রাজনৈতিক মহল যতটা স্কুলের পরিচালন সমিতি, অভিভাবক সমিতি ইত্যাদি দখল করায় মনোযোগী, সেই তুলনায় পড়াশোনার উন্নতি কীভাবে আরও করা সম্ভব, শিক্ষক শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের কী কী সমস্যা হচ্ছে সারা বছর ধরে, সেগুলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি।
সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার, বিশেষ করে প্রাথমিক ক্ষেত্রের সবথেকে বড়ো সমস্যা হল, সমাজের একটি বৃহৎ অংশের শিক্ষিত, উপরতলার মানুষ একেবারে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের সরকারি স্কুল ছাড়া গ্রামে গ্রামান্তরে, ব্লক, মহকুমা স্তরে নিজেদের সন্তানদের পড়তে পাঠায় না। স্কুল শিক্ষা, স্কুল শিক্ষকদের নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম, দুর্নীতি, গ্রেপ্তারি ইত্যাদি ঘটনাকে এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ যতটা রাজনৈতিকভাবে আলোচনা ও উপভোগ করে, সেই তুলনায় প্রকৃত সমস্যার মধ্যে প্রবেশ করে না। কারণ, সরকারি প্রাথমিক স্কুল পুরসভা পরিচালিত স্কুল, গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলের সমস্যা ও পঠনপাঠন প্রক্রিয়া ও প্রতিনিয়ত সামাজিক অবক্ষয়ের প্রভাবের কিছুই এই সমাজকে প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ করে না। সুতরাং গোটা সমস্যাটা তারা একটু উপরের মঞ্চে বসে নীচে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখলে যেমন হয়, তেমনভাবেই অবলোকন করে।
কিন্তু সরকারকে সেরকম করলে তো হবে না। সরকার যদি ফিডব্যাক পায় যে, পাশ-ফেল আবার প্রথম শ্রেণি থেকেই শুরু করতে হবে, তাহলে
শুরু করুক। যদি ইংরাজি পঠনপাঠন প্রথম থেকেই করা দরকার বলে সর্বসম্মত দাবি অথবা প্রয়োজনীয়তা মনে হয়, তাহলে সেটা করা হোক। যদি বিপরীত হয়, তাহলে, সেই সিদ্ধান্তই বজায় থাকুক। কিন্তু কিছু একটা হোক।
ঠিক এরকম একটি আবহে মনে হতে পারে এই শিক্ষা সমস্যা বোধহয় শুধুমাত্র প্রাথমিক, জুনিয়র হাই, মাধ্যমিক অথবা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এরকম মোটেই নয়। খোদ নীতি
আয়োগ সম্প্রতি একটি রিপোর্ট পেশ করেছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, স্নাতক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা আমূল বদলে ফেলতে হবে। নীতি আয়োগ বলেছে, নিছক বিএ, বিএসসি, বিকম পাশ করে আর চাকরি পাওয়া যাবে না। সাধারণ স্নাতক পাশ করলে, একমাত্র
ভরসা সরকারি চাকরি। অর্থাৎ সরকারি দপ্তরে আবেদন করে নিয়োগ পরীক্ষা দেওয়া। আর এই চাকরি এবং এই ডিগ্রি নিয়ে কোটি কোটি কর্মপ্রার্থী বসে আছে। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের আট মাসে ৫৫ হাজার সরকারি চাকরির জন্য ২ কোটি কর্মপ্রার্থীর আবেদন জমা পড়েছিল।
বিশ্বজুড়ে চাকরির আবহের যে গতিপ্রকৃতি, সেটি এমন দিকে যাচ্ছে যে, বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হলে, আর চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই যে স্নাতকস্তরের বিষয় এতকাল ধরে সিলেবাসে রাখা হচ্ছে, তার আমূল বদল দরকার। সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, এরকম বিষয়কে স্নাতকে প্রবেশ করাতে হবে কলেজে কলেজে। নচেৎ পকেটে ডিগ্রি থাকবে, কিন্তু সেই ডিগ্রি ক্রমেই ভবিষ্যতে ডিগ্রি না থাকারই শামিল হবে। আর তাই ভারতের কলেজগুলির চিত্র কী? সর্বত্র ডিগ্রি কোর্সে ছাত্রছাত্রী নেই। বহু অনার্স কোর্স ফাঁকা।
ঠিক এরকমই আবহে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে আপাতত সর্বাগ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে শিক্ষার সঙ্গে কর্মের সরাসরি যোগসূত্র গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করতে। একইভাবে ইনফর্মেশনের এই উৎসব ছেড়ে আবার নলেজের কাছে ফেরার তাড়না তৈরি করতে হবে সমাজে। মোবাইল বাহিত অন্তহীন এত ইনফর্মেশন আমাদের মোটেই দরকার নেই। যে তথ্য কাজে লাগবে, সেটাই সবাই আগে আত্মস্থ করুক। সমাজের বর্তমান মনোভাব হল, মোবাইলে যা পাওয়া যায়, সবই দেখা, শোনা, সেভ করা, ডাউনলোড করা। ওভার-ইনফরমেশন ভাবনাচিন্তার দিশাকে শ্লথ করে দিচ্ছে। কাজেও আসছে না কোনো। অজস্র অবান্তর ইস্যু নিয়ে আমরা আলোচনায় মত্ত। এবার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শিক্ষা সংস্কারে ঝাঁপিয়ে পড়া জরুরি। নতুন প্রজন্ম চায় সঠিক দিশা। সরকারি বনাম বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার ভেদাভেদ, বৈষম্য ঘোচানো হোক। ওয়ান নেশন ওয়ান এডুকেশনের মন্ত্র নেওয়া হোক। শিক্ষায় ধনী দরিদ্র যেন বিভাজন না থাকে।