শুভজিৎ অধিকারী: কথায় বলে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে...।’ ভাগবত পুরাণ কিংবা ‘হরিবংশ’ গ্রন্থ অনুযায়ী, মথুরায় তখন দুর্যোগের রাত। ঘোর অন্ধকার। তুমুল ঝড়-বৃষ্টি, বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি। নিস্তব্ধ চরাচর। অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে দেবকীর অষ্টমগর্ভে জন্ম নিলেন কৃষ্ণ। মথুরা নৃপতি কংস জানতেন, বোনের গর্ভজাত এই সন্তানটি একদিন তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে। তাই কৃষ্ণকে তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চান না। অথচ, ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বরপ্রাপ্ত সন্তানকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করবেন বসুদেব-দেবকী। কিন্তু, কীভাবে? এ নিয়ে দু’জনেই গভীর চিন্তায় পড়লেন। আর তখনই দৈববাণী পেলেন বসুদেব। সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল কারাগারের মূল দরজা। কারারক্ষীরাও হয়ে গেলেন ঘুমে আধমরা। বসুদেব আর সময় নষ্ট করলেন না। সদ্যোজাতকে মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। যমনুা নদী পেরিয়ে পৌঁছলেন গোকুলের গোপীবধূ যশোদার দুয়ারে। ওই রাতে তাঁরও একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বসুদেব ফুটফুটে কৃষ্ণকে যশোদার কোলে শুইয়ে তাঁর কন্যাসন্তানকে নিয়ে এসে দেবকীর কোলে রেখে দিলেন। দেবকীর প্রসবের খবর পেয়েই কারাগারে ছুটলেন কংস। সদ্যোজাতকে তুলে দেওয়ালে আছাড় মারলেন তিনি। তাঁর হাত থেকে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তরীক্ষে আরোহণ করতে লাগলেন শিশুকন্যাটি। চলে যেতে যেতে কংসকে সতর্ক করে গেলেন এই বলে, ‘তোমারে বধিবে যে...।’ পুরাণ মতে, যশোদার গর্ভে জন্ম নেওয়া সেই কন্যাসন্তান ছিলেন আসলে যোগমায়া। দেবী দুর্গার আর এক রূপ। তার মানে এটা স্পষ্ট, সেদিন দুর্যোগের রাতে মর্তের অনাচার, অত্যাচার, ঔদ্ধত্য, অহংকার দমনে পুরুষশক্তির পাশাপাশি জন্ম হয়েছিল অদম্য এক নারীশক্তিরও।
এ তো গেল পুরাণ-কথা। কিন্তু, সত্যিই কি আজকের দিনে জন্মেছিলেন রক্তে-মাংসে গড়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণ? নাকি মহাভারতের রূপকথার এক নায়ক? অন্তত, যুক্তিবাদী ও প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধিৎসুদের মনে যুগযুগ ধরে এই প্রশ্ন উঠে আসছে। স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দও প্রখর যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণের জন্ম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে, শ্রীকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ও তাঁর ব্রহ্মজ্ঞান প্রদানকে কখনোই অস্বীকার করেননি স্বামীজি। বরং কৃষ্ণ-ভাবনার মধ্যেই জাগরণ ঘটিয়েছেন ভারতবাসীর আধ্যাত্মিক চেতনার। সে কথায় পরে আসছি।
দেবকীনন্দন আজও প্রকট লীলায় থাকলে বয়স হতো প্রায় ৫ হাজার ২৫৩ বছর। আমাদের একাধিক পুরাণ ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থ মতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট ছিলেন। মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বৈকুণ্ঠধামে যাত্রা করেন। সেই দিনটি থেকে কলিযুগের শুরু। আর দিনটি ছিল শুক্রবার। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এবার জন্মাষ্টমীও পড়ছে শুক্রবার। ফলে, বর্তমান সময়ে এই শুক্রবারের উপর যতই বিতর্ক হোক না কেন, আমাদের সনাতনী ধর্মে এর মাহাত্ম্য কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়।
ফিরে আসি শ্রীকৃষ্ণের জন্ম প্রসঙ্গে। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত পবিত্র ‘হরিবংশ’ গ্রন্থ ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের জন্ম নিয়ে আর কোনো পাথুরে ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণাদি নেই। তা সত্ত্বেও আমরা স্রেফ পরম ও পবিত্র বিশ্বাসে হাজার হাজার বছর ধরে আঁকড়ে রেখেছি এক মহামানবীয় পুরুষশক্তিকে। যিনি আমাদের কাছে স্বয়ং ভগবান। আমাদের ঘরের ছেলে। আমাদের আরাধ্য...আমাদের আশ্রয়। স্বামীজিও শ্রীকৃষ্ণের জন্ম নিয়ে সন্দিহান হলেও জগৎ সংসারে শ্রীকৃষ্ণের নীতি, আদর্শ ও প্রেমপূর্ণ সহনশীলতা, সংবেদনশীলতাকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছেন। আমাদেরও আত্মস্থ করার উপদেশ দিয়েছেন।
শিকাগো থেকে লন্ডন—একাধিক ধর্মীয়সভায় ভারতের ধর্ম-সংস্কৃতির গরিমা প্রতিষ্ঠা করতে কৃষ্ণ-ভাবনাকে একজন যুক্তিবাদী ও আধুনিক চিন্তাবিদ হিসাবে তুলে ধরতেন স্বামীজি। শ্রীকৃষ্ণ জন্মেছেন কি জন্মাননি, সেই বিতর্ক দূরে সরিয়ে স্বামীজি মেনে নিয়েছেন, পরমব্রহ্ম রূপে শ্রীকৃষ্ণ চিরন্তন। তাঁর দিব্য রূপের অবনতি নেই। বার্ধক্য নেই। তিনি আজও আমাদের কাছে শিশু গোপাল-গোবিন্দ, নন্দলাল অথবা ক্ষুরধার বুদ্ধি সম্পন্ন রাজনৈতিক কুশলী তরুণ ও একজন যথার্থ প্রেমিক পুরুষ। অর্থাৎ, তিনি কালের অধীন নন, পরম স্বাধীন। জ্ঞান, শক্তি, বল, ঐশ্বর্য, বীর্য, তেজ, যশ, প্রেম, বৈরাগ্য প্রভৃতি সদগুণের মূর্ত প্রতীক—ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
স্বামীজি কলকাতায় থাকলে অনেকটা সময় কাটাতেন আলমবাজার মঠে। সেখান আসতেন তরুণ কিছু শিষ্য। তাঁদের গীতাতত্ত্ব বোঝানোর আগে স্বামীজি মূলত চারটি প্রশ্ন রাখতেন। সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল, কৃষ্ণ নামে আদৌ কেউ জন্মেছিলেন কি না? জবাব দিতেন অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ভাবধারাকে অবলম্বন করে। শ্রীকৃষ্ণ আসলে কে? স্বামীজি বলতেন—‘কৃষ্ণ সম্বন্ধে সন্দেহ এই: ছান্দোগ্য উপনিষদের একস্থলে পাওয়া যায় দেবকীপুত্র কৃষ্ণ ঘোরনামা কোন ঋষির নিকট উপদেশ গ্রহণ করেন। মহাভারতের কৃষ্ণ দ্বারকার রাজা। আর বিষ্ণুপুরাণে গোপীদের সহিত বিহারকারী কৃষ্ণের কথা বর্ণিত আছে। অতি প্রাচীনকালে আমাদের দেশে ‘মদনোৎসব’ নামে এক উৎসব প্রচলিত ছিল। সেইটিকেই লোকে দোলরূপে পরিণত করিয়া কৃষ্ণের ঘাড়ে চাপাইয়াছেন। রাসলীলাদিও যে ঐরূপে চাপানো হয় নাই, কে বলিতে পারে? পূর্বকালে আমাদের দেশে ঐতিহাসিক সত্যানুসন্ধান করিবার প্রবৃত্তি অতি সামান্যই ছিল। সুতরাং যাঁহার যাহা ইচ্ছা, তিনি তাহাই বলিয়া গিয়াছেন...। ভূগোলের জ্ঞানও কিছুমাত্র ছিল না—অনেকে কল্পনাবলে ইক্ষুসমুদ্র, ক্ষীরসমুদ্র, দধি সমুদ্রাদি রচনা করিয়া গিয়াছেন। পুরাণে দেখা যায়, কেহ অযুত বর্ষ, কেহ লক্ষ বর্ষ জীবনধারণ করিতেছেন। কিন্তু আবার বেদে পাই ‘শতায়ুর্বৈ পুরুষঃ’। আমরা এক্ষণে কাহাকে অনুসরণ করিব। সুতরাং, কৃষ্ণ সম্বন্ধে সঠিক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত করা একরূপ অসম্ভব...।’
‘অসম্ভব’ বলেও নিজের কৃষ্ণ-ভাবনা ও সাধনা থেকে আমাদের মূলত পাঁচটি শিক্ষা দিয়েছেন স্বামীজি। এক, শ্রীকৃষ্ণ হলেন সর্বাঙ্গসুন্দর ও আদর্শ চরিত্র এবং মানব ইতিহাসের এক অনন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি, যোগ নিয়ে তিনি সকলেরই কাছে মূর্তিমান বিগ্রহ।’ শুধু বলেই থেমে থাকেননি, শ্রীকৃষ্ণকে একজন আদর্শ শিক্ষক মনে করে ভারতবর্ষে কুসংস্কারমুক্ত আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সূচনাও করেছেন। সর্বভূতে ঈশ্বর খুঁজে মানবধর্ম পালনের দীক্ষা দিয়েছেন। দুই, শ্রীকৃষ্ণের কর্মযোগের আদর্শ ও অনাসক্তিকে জীবন ধারার শ্রেষ্ঠ পন্থা বলে যুব সমাজকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যুগাবতার স্বামীজি। ১৯০০ সালের পয়লা এপ্রিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ধর্মীয় সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড়ো অবদান হিসেবে তাঁর কর্মযোগ-তত্ত্বের সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘যিনি চরম কর্মব্যস্ততার মধ্যেও পরম শান্তি খুঁজে পান। আবার পরম শান্তির মধ্যে থেকেও যিনি অতি সক্রিয়তা বজায় রাখতে পারেন, তিনিই জীবনের প্রকৃত রহস্য অনুধাবন করেছেন।’ তিন, স্বামীজির মতে, ব্রজধামের কৃষ্ণ ছিলেন নিষ্কাম, নির্মল প্রেম ও ভালোবাসার প্রতীক। স্বামীজি বলতেন, গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণের এই প্রেম ভালোবাসা ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ, জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন দরিদ্রের ঈশ্বর, ভিক্ষুকের ঈশ্বর, পাপী, পুণ্যার্থী সকলেরই ঈশ্বর। সকল জীবের মধ্যেই তাঁর অধিষ্ঠান। তাই, শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘সামান্য একটি তুলসীর পাতা, জল আর একটি ফুল— যে-ই আমার বেদীতে কিছু একটা অর্পণ করে, আমি তা সমান আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করি।’ চার, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম সর্বধর্ম সমন্বয়ের বলিষ্ঠ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দেখিয়েছেন স্বামীজি। শিকাগোয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে গীতা থেকে শ্রীকৃষ্ণের সেই শাশ্বত বাণী ‘যে যেভাবে আমার ভজনা করুক না কেন, আমি তাকে সেইভাবেই অনুগ্রহ করে থাকি। যে পথেই চলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা আমার দিকেই ধাবিত হয়...’ উল্লেখ করে গোটা বিশ্বের ধর্মীয় নেতাদের মুগ্ধ করেছিলেন উত্তর কলকাতার দত্তবাড়ির ছেলেটি। আর সেদিনই গোটা বিশ্ব জেনেছিল ভারতের বহুত্ববাদের প্রকৃত রূপ। পাঁচ, স্বামীজি মথুরা এবং দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের রাজসিক গুণকে ভারতবর্ষে সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল আধার মনে করতেন। তাই তিনি পরাধীন ভারতকে মুক্ত করতে শ্রীকৃষ্ণের বীরত্বপূর্ণ রূপের উপাসনা করার শিক্ষা দিতেন যুবকদের। স্বামীজি তখন মাদ্রাজে। বর্তমানে চেন্নাই। সেখানকার প্রতিটি ভক্ত সম্মেলনে প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘তোমরা আপাতত শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলাটি একটু আড়ালে রেখে, সিংহনাদে শ্রীকৃষ্ণের পূজা সর্বত্র ছড়িয়ে দাও। আমাদের এখন এমন একজন বীরের প্রয়োজন, যাঁর ধমনীতে আপাদমস্তক রজোগুণ প্রবাহিত হচ্ছে—যিনি সত্যকে জানার জন্য মরতেও প্রস্তুত।’
শেষ করি, স্বামীজির শ্রীকৃষ্ণ-রূপ দেখা ও অন্যকে দেখানোর একটি গল্প বলে। স্বামীজি তখন জয়পুরে। সেখানকার সেনাপতি সর্দার হরি সিং-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁর বাড়িতেই আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু স্বামীজির বেদান্ত মতবাদ বিশ্বাস করতেন না সর্দারজি। একদিন সন্ধ্যায় স্বামীজি হরি সিংকে বললেন, চলুন কিছুটা পথ হেঁটে আসি। দু’জনেই বেরিয়ে পড়লেন। পথে দেখলেন, শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি নিয়ে ভক্তরা পরিক্রমা করছেন। নাম সংকীর্তন করছেন। স্বামীজি দেখতে দেখতে কৃষ্ণভাবে প্রায় অবসন্ন। আচমকা হরি সিংয়ের শরীর ছুঁয়ে বললেন, ‘ওদিকে তাকাও। দেখো দেখো...জীবন্ত ঈশ্বরকে দেখো। মুহূর্তের মধ্যেই সর্দারের দেহে যেন বিদুৎ খেলে গেল। চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। প্রায় বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে তিনি বসে পড়লেন। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরলেন সাধারণ চেতনায়। ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘ধন্য স্বামীজি। আজ আমার দিব্যজ্ঞান লাভ হল আপনার স্পর্শে। সত্যই আমি আজ ভগবানকে দেখলাম!’
আজ, জন্মাষ্টমী। ঘরে ঘরে ছোট্ট গোপালকে নিয়ে আনন্দঘন পরিবেশ। ভূরিভূরি আয়োজন। অথচ, স্বামীজির ভাবাদর্শ হল, এতকিছুর কী বা প্রয়োজন। যিনি একটি ফুলেই সন্তুষ্ট তাঁর জন্মদিন উদযাপনে আচার-অনুষ্ঠান বা উপবাসের কি খুব দরকার? সবার আগে ভক্তিভরে নিজের মধ্যে কৃষ্ণত্বকে জাগিয়ে তোলো। তাঁর মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্ভীকভাবে নিজের কর্তব্য পালন করো। তবেই জন্মাষ্টমীর সার্থকতা।