যন্তরমন্তর কি তবে আর প্রতিবাদের জায়গা নয়, কেবলই রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ? প্রশ্নটি এখন আর নিছক রাজনৈতিক অভিযোগের বিষয় নয়। পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, জটিল ধারায় মামলা—দেশের ছাত্র-যুবদের কণ্ঠরোধের যে ছবি রাজধানী থেকে উঠে আসছে, তা গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়াবহ অশনিসংকেত। প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ হোক কিংবা অন্যকোনো নাগরিক ক্ষোভ—সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়, ভিন্নমত পোষণ করাকেও ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ দেগে দেওয়া অসমীচীন। অথচ প্রতিবাদী পড়ুয়াদের ‘জব্দ’ করতে পুলিশের হাতে এসেই জমা হচ্ছে রাষ্ট্রের যাবতীয় যুক্তি। এই হাঁসজারু কৌশল—গণতন্ত্রের দরজা খোলা রেখে ভিতর থেকে তার কপাট বন্ধ করারই শামিল নয় কি? আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় হল—অভিযোগ উঠলে সরকার দায় এড়াতে ব্যস্ত, যেন পুলিশ তার প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ নয়। অথচ পুলিশের লাঠি যখন নাগরিকের গায়ে পড়ে, তখন সেই আঘাত শুধু শরীরে লাগে না—তাতে বরং আহত হয় রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাটিও। উজ্জ্বল ভুয়ানের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই নিছক কোনো বিচারপতির ব্যক্তিগত অসন্তোষ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যন্তরমন্তরে পড়ুয়াদের উপর পুলিশি অত্যাচারকে তিনি ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ এবং ‘বেদনাদায়ক’ বলেছেন। পুলিশের নিরপেক্ষতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেছেন ন্যায়াধীশ। ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তির কারণ ঠিক এখানেই—অভিযোগটি বিরোধীদের নয়, রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরের একজন দায়িত্বশীল কণ্ঠের।
আইনশৃঙ্খলারক্ষার ক্ষমতা আছে ঠিকই, নাগরিককে শাস্তি দেওয়ার স্বাধীন লাইসেন্স পুলিশের হাতে নেই। এই সামান্য পার্থক্যটি ভুলে গেলেই আইনরক্ষক মুহূর্তে আইনের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ান। বিচারপতি ভুয়ানের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক, তিনি শুধু অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা করেননি—পুলিশের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব, সততা, সাহস এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একটি লাঠিচার্জ বা কোনো একটি থানার আচরণে সীমাবদ্ধ নয়—সমস্যা আরও গভীরে। রাজনৈতিক নির্দেশ যদি পুলিশের পেশাগত বিবেককে প্রতিস্থাপন করে, তবে ইউনিফর্মটি আইনের প্রতীক না-হয়ে ক্ষমতাসীন দলের অদৃশ্য রাজনৈতিক পোশাকে পরিণত হয়। রাজধানীর পুলিশ কার নিয়ন্ত্রণে—এই রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে কিন্তু নাগরিকের কাছে আসল প্রশ্নটি আরও মৌলিক: পুলিশ কার—সরকারের, না সংবিধানের? উত্তরটি স্পষ্ট হওয়াই কাম্য। গ্রেপ্তার হওয়া মাত্র একজন নাগরিক তাঁর মৌলিক অধিকার হারান না। পুলিশি হেপাজতে মৃত্যু, নির্যাতন কিংবা ভুয়ো এনকাউন্টার কোনো ‘কঠোর প্রশাসন’-এর গৌরব নয়, সভ্য রাষ্ট্রে এগুলি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ভয়াবহতম লক্ষণ। যে সরকার নিজেকে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো রক্ষক বলে প্রচার করে, তার কাছে প্রশ্ন তাই আরও কঠিন: প্রশ্ন করলেই যদি লাঠি ওঠে, তবে সংবিধানের স্বাধীনতার জায়গাটি কোথায়?
আর এখানেই মোদি সরকারের আত্মতুষ্টির মুখোশটি সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সরকার হয়তো মামলা প্রত্যাহার করে, প্রশাসন হয়তো বিবৃতি দেয়, দলের মুখপাত্ররা হয়তো দায় ঠেলে দেন ‘আইনশৃঙ্খলা’র ঘাড়ে—কিন্তু রাষ্ট্রের আচরণ দিয়ে যে বার্তা পৌঁছে যায়, তা এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। তরুণ প্রজন্মকে এটাই বোঝানো হচ্ছে কি: গণতন্ত্রে তাদের কাজ স্রেফ ভোটদান, প্রশ্ন করা নয়? প্রতিবাদ করা চলবে, তবে তা অবশ্যই সরকারের পছন্দের সীমারেখার মধ্যে? অর্থাৎ সরকার তরুণদের জন্য ‘লক্ষ্মণরেখা’ এঁকে দিতেই মরিয়া! যন্তরমন্তরের ছাত্ররা যদি ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হয়ে ওঠে, তবে আগামী দিনের নাগরিক কোথায় গিয়ে রাষ্ট্রের কাছে নিজের অভিযোগ জানাবে? সরকারের মনে রাখা উচিত, ভয় দেখিয়ে কিছুদিনের জন্য রাস্তা ফাঁকা করা যায়, কিন্তু মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ যন্ত্রণা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। লাঠির প্রতিটি আঘাত সেই ক্ষোভকেই বরং আরও গভীরে প্রবেশের প্ররোচনা দেয়। বিচারপতি ভুয়ানের সতর্কবার্তা তাই কেন্দ্রের জন্য বিব্রতকর হলেও গণতন্ত্রের জন্য জরুরি, শুভকর—পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের যন্ত্র না বানিয়ে সংবিধানের প্রহরী করে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের শক্তি তার লাঠির দৈর্ঘ্যে নয়, নাগরিকের অধিকাররক্ষার ক্ষমতায়। সরকার যদি এই সহজ সত্যটুকুও ভুলে যায়, তবে যন্তরমন্তরে পড়ুয়াদের উপর পড়া লাঠি একদিন রাষ্ট্রের নিজের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার উপরেই আছড়ে পড়বে।