পূজ্যপাদ হরি মহারাজ (স্বামী তুরীয়ানন্দজী) একটি চিঠিতে কাউকে লিখেছেন, শ্রীশ্রীঠাকুর তোমাকে কিছু কাজ করার জন্য দেবেন। ওটাকে মনে প্রাণে করো। ঐ কাজ যখন শেষ হয়ে যাবে তো শ্রীশ্রীঠাকুর তোমাকে অন্য আর একটি কাজ দেবেন। ওটাকেও মনে প্রাণে করো। ঐ কাজও যখন শেষ হয়ে যাবে তো শ্রীশ্রীঠাকুর আরও একটি কাজ দেবেন। ওটাকেও মনে প্রাণে কর। তারপর শ্রীশ্রীঠাকুর তোমাকে আর কোনো কাজ দেবেন না। পূজ্যপাদ হরি মহারাজের পত্রাবলী হয়তো তুমি পড়ো নি। এটা পড়ে নাও। আসল কথাটি হল কর্ম মনকে বিশুদ্ধ করে। আচার্য শংকর ভগবত পাদ বৃহদারণ্যকোপনিষদের ভাষ্যে লিখেছেন, “কর্মভিঃ সংস্কৃতা হি বিশুদ্ধাত্মাঃ শকনুবন্তযাত্মানমপুনিষত-প্রকার্শিতমপ্রতিবন্ধেন বেদিতুম। এবংহৃয়ার্থবর্ণ “বিশুদ্ধসত্ত্বস্ততস্ততং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মান” ইতি। স্মৃতিশ্চ জ্ঞানমুতপদ্যতে পুংসাং ক্ষয়াতপাপস্য কর্মনঃ ইত্যাদি।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রত্যেক কথাতেই কালী মায়ের দোহাই দিতেন। শ্রীশ্রীমা সারদা দেবী, স্বামীজী মহারাজ ইত্যাদি সকলে শ্রীশ্রীঠাকুরের দোহাই দিতেন। ওনাদের অভিজ্ঞতা ছিল যে শ্রীশ্রীঠাকুরই স্বরূপতঃ পরমাত্মা যার উপস্থিতিতে ওনারা জগতের হিত কার্যে লেগে পড়েছেন। সেইরকম আমাদেরও বুঝতে হবে। যেমন যেমন আমাদের বুঝবার ক্ষমতা পাকা হয়ে যাবে, তেমন তেমন আমরা ওনার নিকট থেকে নিকটতর হয়ে যাবে। তার আগে তুমি কোথায় যাবে? এটাতেই তোমার সম্পূর্ণ সময় চলে যাবে, তারপর যখন ওনার নিকটে চলে যাবে তখন কাল, অকাল, কালী, অকালী সবকিছু থেকে বাইরে চলে যাবে, আত্মারামের আশ্রিত হয়ে যাবে।
প্রসাদ তো অনেক ভাগ্য করলে পাওয়া যায়। দেখো তো, তুমি প্রসাদ খেয়েছো তাই তোমার মন স্বচ্ছ হয়ে গেছে, তখন তোমার মনে প্রশ্ন উঠল, যে কাজ তুমি করেছো হয়তো সেইটি ঠিক হয়নি। স্বপ্ন দেখেছো। ঠিক আছে এখন থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর যেভাবে নিজের জীবনে করতেন, যেমন তুমি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’তে পড়েছো— যখনই কিছু খাবে প্রথমে প্রভুকে নিজের ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে খাও। ক্রমশঃ এটাকে তোমার প্রত্যেক কাজের সঙ্গে করো। যখনই কিছু করবে, নিজের হৃদয়স্থিত শ্রীশ্রীঠাকুর থেকে স্পষ্ট আজ্ঞা নিয়ে করো, যেমন শ্রীশ্রীঠাকুর শ্রীশ্রীকালীমাতার সঙ্গে কথা না বলে কিছুই করতেন না।
নিজের বুদ্ধির শুদ্ধির জন্য অবিরাম দীর্ঘকাল পর্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম-জপের প্রক্রিয়া বিধিপূর্বক করতে থাকো। তুমি নিজের কাম-ক্রোধ ইত্যাদিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছো এবং ওদের চলে যাওয়ার পরও তুমি ওদেরকে মনে করতে থাকো। ‘কাম এসেছিল’, ‘ক্রোধ এসেছিল’ তারপর আমাকেও তার উপায় বলার জন্য লিখে ফেলো।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত প্রত্যেকদিন ১০-১৫ মিনিটের জন্য পড়ো। বাংলা পড়তে পারো তো বাংলায় পড়ো আর যদি ইংরেজী পড়ো তবে স্বামীজির ‘The Complete Works of Swami Vivekananda’ বইটিও পড়ো। আমাকে শীঘ্রই জানাও তুমি কী কী বই এতদিনে পড়েছো, কি পড়ছো ইত্যাদি। এতটুকু মনে রেখো যদি তুমি ভাবো এই সংসার মায়াজালের গুচ্ছ তো তুমি এই মায়াজালের গুচ্ছে আবদ্ধ হয়ে যাবে।‘মধু সঞ্চয়ন’ (স্বামী গহনানন্দ উক্তি সংগ্রহ) থেকে