Bartaman Logo
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘কাগুজে’ দলের রমরমা!

নির্বাচন কমিশনের খাতায় রেজিস্টার্ড। কিন্তু সেভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলই নয়। কারণ জাতীয় বা রাজ্যস্তরের দল হিসাবে স্বীকৃত হওয়ার জন্য ন্যূনতম ভোট বা আসন তারা পায়নি।

‘কাগুজে’ দলের রমরমা!
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নির্বাচন কমিশনের খাতায় রেজিস্টার্ড। কিন্তু সেভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলই নয়। কারণ জাতীয় বা রাজ্যস্তরের দল হিসাবে স্বীকৃত হওয়ার জন্য ন্যূনতম ভোট বা আসন তারা পায়নি। দেশে এমন প্রায় ২৮০০ নথিভুক্ত অথচ অস্বীকৃত (রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি) রাজনৈতিক দল আছে যাদের ভূ-ভারতে কার্যত কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। কার্যালয় হাতেগোনা বা পরিত্যক্ত, কার্যকর্তার অস্তিত্ব প্রায় নেই, কর্মসূচিও নেই, আন্দোলন নেই। এককথায় নামগোত্রহীন কাগুজে রাজনৈতিক দল। অথচ এই ‘নেই-সর্বস্ব’ দলগুলির অধিকাংশের তহবিলে বছর বছর কোটি কোটি টাকা জমা পড়ছে! যেমন, গত বছরই জানা যায়, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের রাজ্য গুজরাতের ১০টি অস্বীকৃত দল ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে অনুদান পেয়েছে ৪৩০০ কোটি টাকা। এবারের তথ্য আরও চমকপ্রদ। সেই গুজরাতেরই ৬টি কাগুজে দল শুধুমাত্র ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে অনুদান পেয়েছে ১৭০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ! রাজনৈতিক দল হিসাবে এদের সম্মিলিত অবদান হল, গত লোকসভা ভোটে এদের প্রার্থী সংখ্যা ছিল মোট ১৫। বলাই বাহুল্য, এদের নাম আদৌ কোনো গুজরাতবাসী জানেন কি না সন্দেহ। পক্ষান্তরে গত লোকসভা ভোটে বিজেপি বাদে পাঁচটি স্বীকৃত জাতীয় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৮৯৩। ওই অর্থবর্ষে তাদের মিলিত অনুদানের অঙ্ক হল ১৪০০ কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ। অস্বীকৃত দলের অনুদানের তালিকায় শীর্ষে থাকা আম জনমত পার্টির আয় (৬২০ কোটি টাকা) দেশের বিরোধী দল কংগ্রেস (২৮১ কোটি টাকা)-কে পিছনে ফেলে দিয়েছে! লোকসভায় আম জনমত পার্টির প্রার্থী ছিলেন মাত্র একজন। এসব অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ‘মোদি মডেল’ না ‘মোদি ম্যাজিক’—কোন অদৃশ্য কারণে সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। 

Advertisement

এমনই এক নথিভুক্ত অথচ কার্যত অস্থিত্বহীন অস্বীকৃত দলের নাম এনসিপিআই। গত বিধানসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ এই প্রায় অচেনা দলে নাম লেখানোর পরই বহু রাজ্যবাসী এনসিপিআই-এর নাম প্রথম জানতে পারে। এই প্রায় অজানা দলের ঠিকানা হাওড়া হলেও আক্ষরিক অর্থেই রাজনীতির ময়দানে এতদিন এদের কোনো অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়নি। রাতারাতি সেই দলই এখন বিদ্রোহী তৃণমূলি সাংসদদের সৌজন্যে চর্চায় উঠে এসেছে। লোকসভার স্পিকার এই দলটিকে এখনও স্বীকৃতি দেননি। তৃণমূলের টিকিটে জিতে নতুন দলে যোগ দেওয়ায় এঁদের সাংসদ পদ খারিজের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে কালীঘাট-তৃণমূল। তবু কেন্দ্রের শাসক এনডিএ-র ভোটের শরিক হয়ে গিয়েছে ওই এনসিপিআই সদস্যরা! জোটের বৈঠকে মোদি-শাহদের সঙ্গে প্রথম সারিতে বসতেও দেখা গিয়েছে খাতায়-কলমে এখনও তৃণমূলের হয়ে জয়ী এই সাংসদদের। রাজ্যের আসন্ন পুরসভার ভোটে জোটের ‘শরিক’ হিসাবে বিজেপির সঙ্গে একসঙ্গে লড়ার বার্তাও দিয়েছেন ব-কলমে এই ‘এনসিপিআই’-এর সাংসদরা। এই প্রায় অস্তিত্বহীন দলের তহবিলে কোন কোন অদৃশ্য হাতের আশীর্বাদে অনুদান জমা পড়েছে, সেই তথ্য এখনও সামনে আসেনি। ফলে এনসিপিআই-এর ভবিষ্যৎ, তহবিলের ইতিহাস, সবই হয়তো ক্রমশ প্রকাশ্য।
কিন্তু এসব বিতর্ক, বিদ্রুপ, কটাক্ষের বাইরে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল, এই ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলের উৎস কী? অস্বীকৃত জেনেও কারা এতে টাকা ঢালছেন এবং কী উদ্দেশ্যে? সাধারণ নিয়মে ২০ হাজার টাকার কম অনুদান হলে দাতার নাম প্রকাশ করার দরকার পড়ে না। এই নিয়মকে কাজে লাগিয়েই অনেক অস্বীকৃত দল অজানা উৎস থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, কিছু অস্বীকৃত দল নামমাত্র প্রার্থী দাঁড় করিয়ে কোটি কোটি টাকা অনুদান পায়। অভিযোগ হল, এসব মূলত কোনো কোম্পানি বা হাওয়ালার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ বৈধ করার এক-একটা কেন্দ্র। অনেক ক্ষেত্রে আবার অনুদানের ভুয়ো রশিদ দিয়ে আয়কর ফাঁকি দেওয়ার বেআইনি কারবারে এই অস্বীকৃত দলগুলিকে ব্যবহার করা হয়। খবরে প্রকাশ, নথিভুক্ত অথচ অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলির ৭৩ শতাংশই নিজেদের আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেনি। এমন দল সবচেয়ে বেশি রয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। উদ্বেগের বিষয় হল, অস্বীকৃত দলের হাতে এমন বিপুল পরিমাণ অর্থের বহর দেখেও নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্র-রাজ্যের কোনো তদন্তকারী সংস্থা এখনও কোনো স্বতঃপ্রণোদিত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে সাদা চোখে ‘বেআইনি’ বলে কিছু প্রমাণ করা না গেলেও ঘটনা পরম্পরা ও কার্যকারণ বিচার-বিবেচনা করে এর উদ্দেশ্য-বিধেয় বোঝা খুব একটা কঠিন অঙ্ক কি? তাই দুর্নীতি আটকাতে ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে এবং দেশ ও দশের স্বার্থে এব্যাপারে তদন্তের প্রয়োজনের কথা অস্বীকার করা যায় না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ