Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

হাসি

ঙ্গলের ভেতরে আলো পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারছে না। স্যাঁতসেঁতে জোলো হাওয়া দিচ্ছে। তুতুল বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। তুতুল বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আর জায়গা পেলে না বাবা!

হাসি
  • ২৪ মে, ২০২৬ ০৪:০০

সৌমী গুপ্ত: ঙ্গলের ভেতরে আলো পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পারছে না। স্যাঁতসেঁতে জোলো হাওয়া দিচ্ছে। তুতুল বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। তুতুল বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আর জায়গা পেলে না বাবা! দিনের বেলাতেই আমার রীতিমতো ভয় লাগছে!’ ওর বাবা সোম হেসে বলল, ‘এর মধ্যেই সাহস উধাও তুতুল! তবে যে জেদ করে এলি! সারাদিন থাকবি কী করে!’ 

Advertisement

তুতুল ভেতরের চাপা ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি তো ভয় পাচ্ছি অন্য কারণে। তুমি ভাব এখুনি যদি কোনো চিতাবাঘের কবলে পড়ি, তখন কী করব?’
সোম পা টিপে টিপে এগতে এগতে বলল, ‘নাহ্, চিতাবাঘ আছে আরও গভীর জঙ্গলে, এখানে কাছাকাছি লোকালয়ে ওরা আসে না! তবে বিষধর পাহাড়ি সাপ আছে অনেক। রাস্তা দেখে চল!’
ওদের অনেক সামনে রাস্তা দেখিয়ে চলেছে রেম্পো, ওদের গাইড। রেম্পো গম্ভীর, কথা কম বলে। সবসময় মুখে একটা আতঙ্কের ছাপ। এই দু’দিন কী করে যে কাটাবে তুতুল সেসব ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছে না। খুব তো জেদ করে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে মায়ের কথা শুনলেই হত। মা অফিসে ছুটি পায়নি বলে আসেনি, আর ওতেই সমস্যা বেড়েছে। 
দু’দিন আগে সোম ঠিক করেছিল উইকএন্ডের ছুটিতে কাছাকাছি পাহাড়ি এলাকায় একটি রাজবাড়ির খোঁজ পেয়েছে সেখানে গিয়ে তার অসমাপ্ত উপন্যাসের শেষটুকু লিখে ফেলবে, সেই শোনার পর থেকে তুতুল বায়না জুড়েছে সেও বাবার সঙ্গে আসবে! মায়ের অফিসে কিছুতেই ছুটি পায়নি বলার সত্ত্বেও তুতুলকে ঠেকানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত সোম তুতুলের মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভয় পাবি না তো? আমি কিন্তু ওখানে লিখতে যাচ্ছি, অফিসের কাজের চাপে এখানে কিছুতেই মন বসাতে পারছি না বলেই ওখানে গিয়ে লিখব ঠিক করেছি। তুই গেলে একা একা বোর হবি, তাছাড়া পুরানো রাজবাড়ি, একটু সেকেলে, বড়ো বড়ো ঘর, তেমন কেউ নেই, তোর কিন্তু ভয় লাগতে পারে!’ তুতুল ঠোঁট উলটে বলেছিল,‘ধুস! আজকাল ভূতে কেউ ভয় পায় নাকি! ওসব আগেকার দিনের লোকজন বিশ্বাস করত। এই সায়েন্সের যুগে এসব বিশ্বাস করা মানে নেহাত ছেলেমানুষি বাবা! আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি, দিনের বেলায় আমরা অ্যাডভেঞ্চার করব আর রাতে তুমি লিখবে! তখন আমি স্টোরি বুক পড়ব। রাজি?’
অগত্যা রাজি না হয়ে উপায় নেই।
জঙ্গল পিছনে ফেলে ওরা এসে পৌঁছল রাজবাড়ির অন্দরমহলে। রাজবাড়ি বলতে পুরানো পোড়ো বাড়ি, অশ্বত্থ গাছের ঝুরি নেমেছে, বট গাছের শেকড় প্রকট। তারই পাশে সিঁড়ি বেয়ে উঠে চারটে বড়ো ঘর বাসযোগ্য, নীচে পাশে ছোটো ঘরে রিসেপশন। বাকি ঘরগুলো তালা বন্ধ। 
সোম রেম্পোকে জিজ্ঞেস করল, ‘রাতে ক’টা পর্যন্ত লোক থাকে?’
রেম্পো  বলল, ‘ম্যাক্সিমাম ন’টা পর্যন্ত, ডিনার দেওয়ার পর নীচের ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিকিউরিটি গার্ড থাকবে বাইরের গেটের সামনে। এখানে আর কেউ থাকবে না!’
সোম বলল, ‘তুমি? তুমি রাতে কোথায় থাকবে?’
রেম্পো বলল, ‘আমার আরও ট্যুরিস্ট আসবে অন্য জায়গায়, রাতে আমি এখানে থাকি না!’ বলেই যেন তাড়াতাড়ি পালাতে চাইল।
এবার তুতুল একটু ভয় পেল। বেলা পড়ে এসেছে। আলো নিভিয়ে দিয়েছে যেন কেউ। রিসেপশনের লোকটি কেমন একটা দেখতে। চোখ দুটো গুলির মতো। সে এসে রুমের দরজা খুলে দিল। সে বলল রাতের খাবার ন’টা নয় সাড়ে আটটায় দিয়ে সে চলে যাবে! 
সোম বোধহয় তুতুলের মনোভাব বুঝতে পেরেই বলল, ‘বুঝলি তুতুল আজ সারাদিন জার্নি করেছি তো আজ বরং খেয়েদেয়ে ঘুম দেব, মাঝরাতে পারলে লিখব, চল আপাতত ল্যাপটপে একটা মুভি দেখি!’
তুতুল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মুভি দেখতে দেখতে তুতুল কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সোম খেয়াল করেনি। রাতের খাবারটা ঘুমের ঘোরেই খাইয়ে দিল সোম। 
এখানে বেশ ঠান্ডা। জানলাগুলো বেশ করে চেপে বন্ধ করে সোম ল্যাপটপ খুলে লেখার চেষ্টা করল।  লেখার মধ্যে ডুবে যেতেই মনে হল কেউ ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। ঠান্ডা, ধীর কিন্তু স্পষ্ট! প্রথমটা পাত্তা না দিলেও ঠান্ডা নিঃশ্বাসের স্পর্শ প্রকট হতেই পিছন ফিরে তাকাতে দেখলেন কেউ কোত্থাও নেই। তুতুল অকাতরে ঘুমোচ্ছে। সোম আবার লিখতে শুরু করল। এবার আওয়াজটা এল বাথরুম থেকে। টপটপ করে জল পড়লে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন। কিন্তু সোম তো ভালো করেই কলের মুখ বন্ধ করেছে। তবু  উঠে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে সবকটি কলের মুখ দেখল। সব বন্ধ। বাথরুমের মেঝে শুকনো। কোথা থেকে এই আওয়াজ আসছে তাহলে? চারদিক শুনশান। একটা অজানা আশঙ্কা চেপে বসছে ক্রমশ। কেন এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হল কিছুতেই বুঝতে পারল না সোম। ঘরে এসে দেখল আরেক বিপত্তি। তুতুলের মাথার কাছের জানলা হাট করে খোলা। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। অথচ স্পষ্ট মনে আছে সব জানলা সোম নিজের হাতে বন্ধ করেছে। সোমের অদ্ভুত লাগল। জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে পা দুটো আটকে গেল সোমের। একটি বাচ্চা মেয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় ছাদে দাঁড়িয়ে সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে। সোম ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। গলা শুকিয়ে আসছে তবু মনের জোর নিয়ে মোবাইলের আলোটা জ্বালাতেই এক নিমেষে উধাও। ঘুটঘুটে অন্ধকারের চাদরে মুড়ে গেল চারদিক। তেমনি নীরব, নিশ্ছিদ্র, শব্দহীন একটি রাত যেন গ্রাস করতে চাইছে সোমকে। কোনোরকম জানলা বন্ধ করে সোম তুতুলের পাশে শুয়ে পড়ল। লেখা তো দূরের কথা সারারাত ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে একটা অস্বস্তি হচ্ছে সোমের। 
পরদিন সকালে রেম্পোকে বলতেই ও বলল, ‘রাতে এখানে গাছগাছালির ছায়ায় ওরকম মনে হয়। তবে ওই পশ্চিমদিকের জানলা না খোলাই ভালো। ওদিকে রাজবাড়ির কিছু সমাধি আছে!’
সোম অবশ্য সেটাই ভাবছিল, নিশ্চিত মনের ভুল। তুতুলকে সোম আর কিছু বলল না। সারাদিন কেটে গেল জঙ্গলে ঘুরতে। পাহাড়ি ঝোরা, পুরানো মন্দির বেশ রোমাঞ্চকর জায়গা এটা। ওরা রাজবাড়ির সমাধিক্ষেত্রেও ঘুরে এল রেম্পোর সঙ্গে। কিন্তু সূর্যাস্ত হলেই রেম্পো কেমন উশখুশ করতে শুরু করল। ও কিছুতেই থাকল না এখানে। 
রাতের খাবার খেয়ে আজ নিশ্চিন্তে লিখতে বসল সোম। শেষটুকু জমে উঠেছে। আজ আর কোনো শব্দ নেই। যাক। তুতুল ঘুমোচ্ছে। 
হঠাৎ যেন হাসির আওয়াজ পেল সোম। ঠিক যেন তুতুল কারওর সঙ্গে গল্প করছে। সোম বিছানায় তাকাতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। তুতুল বিছানায় নেই। দৌড়ে গিয়ে বাথরুমে দেখল সেখানেও তুতুল নেই। সোম চিৎকার করল, ‘তুতুল!’ কোনো সাড়া নেই! এবার আবার সেই হাসির আওয়াজ শুনতে পেল সোম। অনুসরণ করে এগতেই দেখল সিঁড়ির  মুখে একটা ঘর খোলা। আর ঠিক সেখানেই তুতুল কারওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাসছে। সাধারণ নয় সেই হাসি। বিকট। কানে লাগছে রীতিমতো। ঠিক যেন কারওর মুখোমুখি বসে হাসছে তুতুল! 
এই ঘরটা তো বন্ধ ছিল! হাত পা ঘেমে উঠল সোমের। মুখ দিয়ে একটা কথা বের করতে পারছে না সোম। যেন বোবা ভাষায় পেয়েছে ওকে। গলা চেপে ধরেছে যেন কেউ। 
সোম স্পষ্ট দেখছে তুতুল দরজা থেকে কারওর হাত ধরে বেরচ্ছে, দ্রুত গতিতে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের বিরাট জলাশয়ের দিকে, সোম চেষ্টা করেও এগতে পারছে না, কেউ যেন পা দুটো মাটির সঙ্গে গেঁথে রেখেছে ওর। 
দৃষ্টিপথের বাইরে চলে যাওয়ার আগে ও সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘তুতুল!’ সোম দেখল তুতুল পিছনে ফিরে ওর দিকে তাকিয়েই লুটিয়ে পড়ল। আর একটা ছায়া যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নিমেষে। সোম আপ্রাণ চেষ্টা করে শুধু আর্তনাদটুকুই করতে পারল। একচুলও নড়তে পারল না।
চিৎকার শুনে সিকিউরিটি গার্ড ছুটে আসতেই সোমের যেন সংবিৎ ফিরে এল। দু’জন মিলে যখন তুতুলকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে এল তখন তুতুলের ধুম জ্বর।
আর এক মুহূর্ত এই রাজবাড়িতে থাকবে না ঠিক করল সোম। তুতুল জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ভুলভাল বকছে। ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার দেখানো উচিত। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। রেম্পোকে ফোন করে জোরাজুরি করতে গাড়ি নিয়ে নিয়মের বাইরে গিয়েও এই জঙ্গলে ঢুকেছে রেম্পো, শুধু তুতুল অসুস্থ বলে। অথচ ঘুমোনোর আগে পর্যন্ত তুতুল স্বাভাবিক ছিল। রেম্পোর মুখ থমথমে, শুধু বলল, ‘এখুনি গাড়িতে উঠে আসুন, এখানে রাতে বাইরের লোকজন একদম পছন্দ করে না রিমলি বেটি!’
গাড়িতে তুতুলকে তুলে সোম জিজ্ঞেস করল, ‘রিমলি কে?’
রেম্পো বলল, ‘রিমলি এ বাড়ির ছোটো মেয়ে, ওদের শেষ বংশধর। বিদেশে থাকত বাবা মায়ের সঙ্গে। তিন বছর আগে এখানে এসে খেলতে খেলতে ওই জলাশয়ে পড়ে গিয়ে ডুবে মারা যায়! তারপর থেকে ওদের বাড়ির লোকজন ছাড়া কেউ রাতে থাকলেই অশরীরী আত্মার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। অনেকে সেই আনন্দ পেতেই আসেন। ঠিক আপনাদের মতোই। কিন্তু বাচ্চাদের আনলেই বিপদ। রিমলি খেলার ছলে তাদের অনেক সময় নিয়ে যায় ওই জলাশয়ে...!’ কথাটা শেষ করল না রেম্পো। সোম দেখল গাড়ির সামনে রেম্পোর পাশের সিটে ঠিক যেন একটি বাচ্চা মেয়ে বসে। তুতুলের দিকে তাকিয়ে। জ্বরে আচ্ছন্ন তুতুল ঘোরের মধ্যেই ওইভাবে হেসে উঠল, প্রকট, ভয়ংকর আওয়াজ তার। রেম্পো কি শুনতে পাচ্ছে না? কারণ রেম্পো বলে চলেছে, ‘পারিবারিক ব্যবসার জন্য এই রাজবাড়ি ভাড়া দেওয়া হলেও বাচ্চাদের না আনাই ভালো! তবু যে কেন আপনারা আসেন!’ এখনও হাসছে তুতুল! একা সোম শুনছে শুধু? কারণ রেম্পো জঙ্গলের বুক চিরে গাড়ি নিয়ে দৌড়চ্ছে সামনের দিকে। কোনো দিকে তাকাচ্ছে না সে। সোম একবার পিছনে ফিরে তাকাল। রাজবাড়ির পশ্চিমের জানলাটা খোলা! দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে যেন তুতুল! মুখে করুণ হাসি। তাহলে এখানে কে এমনভাবে হাসছে? সোম গাড়ির ভেতরে তুতুলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল! তুতুল তখনও হাসছে! বীভৎস, ভয়ংকর সে হাসি! তুতুলের নরম হাসির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই!

সম্পর্কিত সংবাদ