পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়: সকাল থেকে বাড়িতে হুলুস্থুল কাণ্ড। অন্যদিন ঘুম ভাঙতে না ভাঙতে সবকিছুই কেমন যেন রুটিন মেনে চলতে থাকে। ছকে-বাঁধা, নড়চড় হওয়ার জো নেই। রোববার অবশ্যি অন্যরকম। তাড়াহুড়ো থাকে না। মা আলস্য করেই একটু বেশিক্ষণ শুয়ে থাকেন। ‘উঠব-উঠব’ করে আড়মোড়া ভাঙেন। ভাঙেন বটে, কিন্তু তখনই ওঠেন না। উঠতে আরও কিছুটা সময় চলে যায়। অন্যদিন নীলের উঠতে একটু দেরি হলে মা হইহই বাঁধিয়ে দেন। রোববার মানেই তো সব অন্যরকম। দৈনন্দিন রুটিনে শিথিলতা। একটু বকাঝকা দিয়ে বাবা বেশিরকম ডাকাডাকি করলে মা-ই বাধা দেন। বলেন, ‘সারা হপ্তা তো ছেলেটা দৌড়োদৌড়ি করে। আজ না হয় একটু বেশিই ঘুমোক।’
স্কুল, ছুটির পর কোচিং। সপ্তাহে দু’দিন বিকেলের দিকে কোচিং থাকে না, স্কুল ছুটির পর যেতে হয় ক্রিকেট প্র্যাকটিসে। ব্যাগ, ব্যাট নিয়ে মা আগেই মাঠে পৌঁছে যান। স্কুল-ছুটির পর পড়িমরি করে হাজির হয় নীল। ব্যস্ততার শেষ নেই তার। কতকিছু সামলাতে হয় তাকে! ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। অথচ নীল হাসিমুখেই সব করে। একটুও বিরক্ত হয় না। খুব একঘেয়ে লাগলে কানে হেডফোন দিয়ে গান শোনে। কী গান, তা অবশ্য মায়ের জানা নেই। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘কেন, রবীন্দ্রসংগীত।’
এইরকমই কায়দা করে কথা বলে প্রশ্নের উত্তর দেয় নীল। সবে এইটে উঠেছে, কে বলবে! বেশ ভারিক্কি চেহারা। ক’দিন আগে মোড়ের মাথার দোকানদার তাকে ‘আপনি’ বলেছে। বেশ গর্ব করেই সেকথা জানিয়েছে স্কুলের বন্ধু সোহাগকে। সোহাগ খুব হেসেছে। হাসতে হাসতে বলেছে, ‘কাকুটাকু কিছু বলেনি তো!’ সত্যিই সোহাগটা বড্ড ফক্কড়!
গতকাল ছিল রোববার। আজ সপ্তাহের শুরু। অথচ আজই স্কুল যাওয়া হল না। বন্ধুদের মিস করছে বলেই হয়তো স্কুলের কথা বেশি করে মনে পড়ছে। কত টুকরো টুকরো ছবি। সেসব চোখের সামনে ভেসে উঠছে। নীল সোফায় বসে স্কুলের কথাই ভাবছিল। কে কী পড়ালেন, তা জানার জন্য অন্য কাউকে নয়, সন্ধের পর সোহাগকেই ফোন করবে। স্যার-ম্যামরা কোনো টাস্ক দিয়ে থাকলে করে নিয়ে যেতে হবে। করে নিয়ে গেলে হয়তো কামাই করার জন্য বকুনি খেতে হবে না।
আজ বাড়িতে কী হইচই না হয়েছে! স্কুল যাওয়ার জন্য যখন তৈরি হওয়ার কথা, তখন যদি বাড়িতে হুলুস্থুল চলে, আশপাশের বাড়ির কেউ কেউ চলে আসে, তাহলে কি স্কুল যাওয়া হয়! সাতসকালে তেমনই তো ঘটল। উঠোনে ঝুলানো খাঁচা থেকে পাখি উধাও! পালিয়েছে। কী পাখি, টিয়া নাকি? ঘন সবুজ, টকটকে লাল ঠোঁট, নাম ধরে ডাকে— তেমন পাখিরই তো স্বপ্ন দেখেছিল নীল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন, জেগে স্বপ্ন। সারাক্ষণই মনে হত, আদর করে পোষা টিয়াকে লঙ্কা, পেয়ারা খাওয়াচ্ছে। এই মনে হওয়ার কথা মাকেও বলেছে সে। মায়ের থেকে বাবার কানে পৌঁছেছে। বাবা হঠাৎই একদিন কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই পাখি-পোষা নিয়ে নানা কথা বলেছিলেন । সেসব নীলের স্পষ্ট মনে আছে। বাবার কাছ থেকেই জেনেছিল, আগে নাকি বহু মানুষের জীবিকা ছিল পাখি-ধরা, পাখি-বিক্রি। শহরেও পাখিওয়ালাদের দেখা যেত। টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া— কত রকমের পাখি ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত।
বাবা যে তার ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেন, তা নীলের অজানা নয়। মুখ থেকে বের হতে না হতেই সে জিনিস চলে আসে। মা তো তাই রেগেটেগে গেলে বলেন, বাবা আশকারা দিয়ে তাকে মাথায় তুলেছে!
বাবা একে-তাকে বলেও শেষ পর্যন্ত টিয়াপাখি জোগাড় করতে পারেননি। সকলেই ভয় দেখিয়েছে, টিয়া পুষলে, কেউ পুলিশকে খবর দিলে শুধু পাখিটাই নিয়ে যাবে, তা নয়, দিতে হবে অনেক টাকা ফাইন। বাবার অফিসের মুখার্জিবাবু বলেছেন, শুধু ফাইন নয়, পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, জেলখানার পোড়ারুটি খাওয়াবে। এসব শুনে বাবা একটু ভয়ই পেয়েছিলেন। নীলও টিয়ার কথা আর বলেনি।
বাবা যে ভেতরে ভেতরে ভাবছিলেন, কীভাবে ছেলের স্বপ্ন পূরণ করবেন, তা অবশ্য নীল বুঝতে পারেনি। কিছুদিন আগের কথা। সেদিন ছিল রোববার। সকালে বেরিয়ে দুপুরের দিকে বাবা ফিরলেন হাতে একটা খাঁচা দুলিয়ে। তখন বিস্ময়ের শেষ থাকেনি। নীলের তো প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি, বাবা তার জন্য পাখি কিনে এনেছেন। টিয়া নয়, খাঁচার ভেতর অন্যরকম এক পাখি। কী পাখি, বাবাই জানিয়েছিলেন, ‘ককাটিয়েল।’
ককাটিয়েলটাকে দেখতে অনেকটাই কাকাতুয়ার মতো। ‘হাসিখুশি’তে পড়া ‘কাকুতুয়ার মাথায় ঝুঁটি’-র মতো ‘ঝুঁটি’ও আছে। কী সুন্দর, সাদা আর হলুদের আশ্চর্য কম্বিনেশন। মুগ্ধ চোখে নীল পাখিটাকেই দেখছিল। বাবা বলে যাচ্ছিলেন কত কথা। ওদিকে কান ছিল না তার। বাবার কথা থেকেই জানা গেল, ককাটিয়েল আসলে সেই দূর-অস্ট্রেলিয়ার পাখি, এখন বুঝি এদেশেরই হয়ে গেছে। পোষা নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। অনেকেই পোষে। ককাটিয়েল ভালো পোষও মানে। মানুষের কথায় সাড়া দেয়। গলা নকল করে।
এসব বাবা-ই বলছিলেন। খানিকটা নিজের মনেই বলছিলেন। ক’দিনেই ককাটিয়েল শুধু নীলের নয়, মা-বাবা দু’জনেরই বড়ো নেওটা হয়ে ওঠে। বাবা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে শিস দেন। ককাটিয়েল কান পেতে শোনে, আবার নিজেও চেষ্টা করে। মা তো পাখিটার সব ব্যাপারেই খুব কেয়ারিং হয়ে উঠলেন। কী খাবে, কী খাওয়াবেন, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ‘ককাটিয়েলের খাদ্যখাবার’ — গুগল সার্চ করে দেখলেন। নীল তো সুযোগ পেলেই পাখিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, কথা বলানোর চেষ্টা করে। কখনো নীল শিস দেয়। পাখিটাও দেয়। নীল কিছু বললে মনোযোগী ছাত্রের মতো চুপ করে শোনে।
বেশ চলছিল। এমন যে হতে পারে, তা কেউই ভাবেনি। সাতসকালেই অঘটন। এই অঘটনের জেরে বাড়িতে হুলুস্থুল। চেঁচামেচি। দোষারোপ। রোববার ছাড়া সব দিনই মা ওঠেন কাকভোরে। চলে অফিসে, স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি। সবার আগে বের হয় নীল। স্কুল শুরুর ঢের আগে বাস চলে আসে। ছাত্র তুলতে তুলতে যায়, এভাবে অনেক সময় নষ্ট করে শেষে পৌঁছায় স্কুলে। নীলের পরে বের হন মা। অনেক দূরে কলেজ। হাতে সময় নিয়ে বের হতে হয়। একেবারে শেষে বাবা। বাবার অফিস হেঁটেই যাওয়া যায়। বাবা অবশ্য যান বাইকে।
বাবার দেরিতে অফিস, তাই সকালের টুকিটাকি দু-চারটে কাজ নিজের হাতে করেন। সেই কাজের তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে পাখি-খাওয়ানো। বড়ো আদরে, যত্নে ককাটিয়েলকে খাওয়ান। প্রথমে দানা, তারপর পানি। দানাপানি পেয়ে হয় আহ্লাদিত, ককাটিয়েল দুলে দুলে নাচে। হাবেভাবে বুঝিয়ে দেয়, খুব আনন্দ হয়েছে তার। সেই আনন্দ বাড়িয়ে দিতেই বোধহয় বাবা শিস দেন। শিসের উত্তরে সেও শিস দেয়।
এসব প্রতিদিনের চেনা ছবি। স্কুলে যাওয়ার ব্যস্ততার মধ্যেও তা নীলের নজর এড়িয়ে যায় না। বাবাকে শিস দিতে দেখে মিটিমিটি হাসে। পাখি-খাওয়ানোর সময়ই আজ যত গন্ডগোল! বাবা খাঁচার দরজা না খুলেই প্রায় দিন খাবার দেন। কখনোসখনো ইচ্ছে হলে খোলেনও। পাখিটাকে একটু স্পর্শ করেন। সেই ছোঁয়ায় ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে। হয়তো ককাটিয়েলও বোঝে। চুপ করে থাকে, আদর খায়।
আজ বাবা ওই রকমই খাঁচা খুলেছিলেন। খাবার দিচ্ছিলেন। হয়তো মুহূর্তের জন্য হলেও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। সেই সুযোগটিকে কাজে লাগায় ককাটিয়েল। খোলা দরজা দিয়ে চোখের নিমেষে বেরিয়ে ফুড়ুৎ করে পালায়। প্রথমে পাশের বাড়ির ছাদে। একটু পরেই ছাদ-লাগোয়া আমগাছে।
খাঁচার দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়া মাত্র বাবা আদর করে কত ডেকেছেন। নির্বিকার, শুনেও যেন শোনেনি। শেষে বাবা দিশেহারা হয়ে মাকে ডেকেছেন। নীলকে ডেকেছেন। রীতিমতো হইহই বেঁধে গেছে। পাশের বাড়ির সুপর্ণাজেঠিমা ছুটে এসেছেন। সদর দরজার কাছেও কেউ কেউ ভিড় করেছে।
ককাটিয়েলটা গেল কোথায়! একটু আগেও তো আমগাছে ছিল। ভালো করে উড়তে পারে না। ডানা ঝাপটালেই বোঝা যায়, ওড়াউড়িতে কতখানি আনাড়ি। এ তো পোষার পাখি, খাঁচাতেই থাকতে অভ্যস্ত, কেন যে পালাল— ভেবে পায় না নীল! উড়তে না পারার কথা বলে মা বললেন, ‘শেষে আবার বেড়ালের পেটে যাবে না তো?’ পাশের বাড়িতেই বিদঘুটে চেহারার এক বেড়াল আছে। কালো কুচকুচে। রাতের অন্ধকারে বাগানে শুধু চোখদুটো জ্বলজ্বল করে, আর কিছুই দেখা যায় না।
বেড়ালটার কথা মায়েরই প্রথম মনে পড়ে। একটু আতঙ্কিত হয়েই তিনি ছাদে উঠলেন। উঁচু থেকে যদি দেখা যায়, পাখিটা কোথায় রয়েছে, কী করছে! মায়ের পিছু পিছু ছাদে গেলেন বাবাও। ছাদে গিয়ে ছলছলে চোখে মা এদিক ওদিক কত দেখলেন! কোনো হদিশ না পেয়ে শেষে কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, ককাটিয়েলটা বাবার গাফিলতির জন্যই পালিয়েছে! বাবা-ই বা ছেড়ে দেবেন কেন! হইহই করে প্রতিবাদ করলেন। কথায় কথায় কথা বাড়ে। নীল বুঝতে পারে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, আজকে আর স্কুলে যাওয়া হবে না। শুধু নীলের যাওয়া হল না, তা নয়, যাওয়া হল না বাবা-মায়েরও।
কথার পিঠে কথা। পরস্পরকে দোষারোপ। এসব করতে গিয়ে ঘড়ির সঙ্গে আর পাল্লা দেওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত তিনজনই রয়ে গেল বাড়িতে। দুটো বাড়ির পরে থাকেন মনোতোষ হাজরা। কী হয়েছে, দেখতে এসে কেমন যেন ভয় পাইয়ে দিলেন। মা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাখিটা আবার আপনার বাড়ির দিকে যায়নি তো?’
মনোতোষদাদু হাসলেন। হেসে যা বললেন, তা সত্যিই ভয় পাওয়ার মতো! পাখিটা নাকি আমগাছের ওপরের দিকে ডালে বসেছিল। সেই ডালের নীচেই বেড়ালটাকে ওত পেতে বসে থাকতে দেখেছেন তিনি। বয়স্ক মানুষ, বাজে কথা বলবেন কেন! নিশ্চয়ই দেখেছেন, এমনই মনে হল নীলের। মা আর বাবা দু’জনের মুখই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আশপাশের বাড়ির আরও কেউ কেউ জড়ো হয়েছিলেন। নানা কথা বলাবলি, কথা চালাচালি। আস্তে আস্তে সে ভিড়ও পাতলা হতে হতে ফাঁকা হয়ে গেল। বাবা হয়তো নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার জন্যে টিভি চালিয়ে নিউজ দেখতে শুরু করলেন। মা রান্নাঘরে ঢুকলেন, সকাল থেকে হই-হট্টগোলে রান্না তো দূরের কথা ভাত বসানোই হয়নি। নীল কাউকে কিছু না বলে ছাদে উঠে গেল। ওঠার সময় সিঁড়ির নীচে রাখা খাঁচাটাও যে সঙ্গে নিল, তা বাবা-মা কেউই খেয়াল করেননি। ছাদে উঠে একটু শস্যদানা ছড়িয়ে খাঁচার দরজা খুলে রেখে চিলেকোঠায় বসে রইল। বসে থাকতে থাকতে ঢুলুনি এসে গিয়েছিল। ঠিক তখনই সেই চেনা ডাক শোনা গেল। সেই চেনা শিস। বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে খাঁচার দিকে তাকাতেই পৃথিবীর সব আনন্দই যেন নীলের চোখে মুখে জড়ো হল। নজরে পড়ল, খাঁচার দরজার আশপাশে যে শস্যদানা ছড়িয়েছিল, তা আর নেই! খাঁচার ভেতরে বাটিতে দেওয়া খাবার কোনোদিকে না তাকিয়ে মাথা নীচু করে ককাটিয়েল খেয়ে চলেছে। পা টিপেটিপে গিয়ে নীল খাঁচার দরজা বন্ধ করে দিল। আহা রে, কী খিদেই না পেয়েছে! এমনটি ভেবে নিয়ে খুশি-খুশি গলায় মাকে ডাকল, ডাকল বাবাকে । দু’জনেই শুনতে পেয়েছেন নীলের ডাক। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ, আসছেন তাঁরা। এসে কী বলবেন, পাখিটাকে নীল বেশি ভালোবাসে, না পাখিটা নীলকে বেশি ভালোবাসে!