আর কয়েক ঘণ্টা পর ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনাল। লড়াইয়ে নামছেন বার্সেলোনার ফুটবল অ্যাকাডেমি লা মাসিয়ার একঝাঁক ছাত্র। এই অ্যাকাডেমির উত্থানের কাহিনি শোনালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর কয়েক ঘণ্টা পর ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনাল। লড়াইয়ে নামছেন বার্সেলোনার ফুটবল অ্যাকাডেমি লা মাসিয়ার একঝাঁক ছাত্র। এই অ্যাকাডেমির উত্থানের কাহিনি শোনালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। মুখোমুখি মেসির আর্জেন্তিনা এবং ইয়ামালের স্পেন। তবে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধুমাত্র দু’টি দেশের মধ্যেই লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, একই স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতাও বটে। কারণ, আজ রাতে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামছেন লা মাসিয়ার বেশ কয়েকজন ছাত্র। একদিকে আছেন ফুটবল ইতিহাসের সেরা জাদুকর লাওনেল মেসি আর অন্যদিকে স্পেনের জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুত এই প্রজন্মের বিস্ময়বালকেরা— লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো ও পাউ কুবারসি। একই ফুটবল স্কুলের ছাত্রদের এই লড়াই বিশ্ব ফুটবল আগে কখনো দেখেছে কি?
বিশ্বকাপের মঞ্চে আমরা যে ট্রফি আর গোলের উৎসব দেখি, তার বীজ বোনা হয় অনেক আগে। কারও পথচলা শুরু হয় পাড়ার ছোট্ট মাঠে, কারও বা বাবার হাত ধরে স্থানীয় ক্লাবে। আবার অনেকের স্বপ্নের প্রথম ঠিকানা হয় স্পেনের বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ফুটবল অ্যাকাডেমি— লা মাসিয়া।
১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করে এই অ্যাকাডেমি। আজ তা সফলতম ফুটবলার গড়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে। লা মাসিয়া শুধু একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি নয়, এটি আসলে একটি দর্শন। এখানে শুধু ড্রিবলিং, পাসিং কিংবা গোল করার কৌশল শেখানো হয় না, সমান গুরুত্ব পায় শৃঙ্খলা, পড়াশোনা, দলগত চেতনা, বিনয় এবং অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা। বার্সেলোনার দর্শন একবাক্যেই ধরা পড়ে, ‘আমরা শুধু ফুটবলার নয়, মানুষও গড়ে তুলি।’
এই দর্শনের ফলেই বিশ্ব ফুটবল পেয়েছে লাওনেল মেসি, জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কার্লেস পুয়োল, সার্জিও বুসকেতস, জেরার্ড পিকে, ফাব্রেগাস, পেদ্রো ও ভিক্টর ভালদেসের মতো কিংবদন্তিদের। ২০০০ সালের কথা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্তিনার রোজারিও থেকে এক ছোটো ছেলে বার্সেলোনায় এসেছিল। শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর চিকিৎসার দরকার ছিল। বার্সেলোনা সেই দায়িত্ব নেয়। তারা কেবল ছেলেটির চিকিৎসাই করেনি, বিশ্ব ফুটবলকে উপহার দিয়েছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা শিল্পীকে। নাম তাঁর লাওনেল মেসি।
লা মাসিয়ার ছাত্রাবাসে মেসির শৈশব কেটেছে। একই ডাইনিং হলে খাওয়া, একই মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন, একই ছাদের নীচে শত শত কিশোরের সঙ্গে স্বপ্ন দেখা— এই পরিবেশই তাঁর ফুটবল-দর্শন গড়ে দেয়। সেখানেই তিনি শিখেছেন, ফুটবল শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের খেলা নয়; এটি দল, ধৈর্য, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বেরও খেলা। বার্সেলোনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া থেকে শুরু করে আর্জেন্তিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো— সবকিছুর বীজ যেন বোনা হয়েছিল লা মাসিয়ার ছাত্রাবাসেই।
মেসি-ইনিয়েস্তাদের সোনালি যুগের হাত ধরে লা মাসিয়ার জাদু আজও ফুরিয়ে যায়নি। তারই প্রমাণ স্পেনের এই তরুণ দল। ইয়ামাল বা কুবারসিরা প্রমাণ করেছেন, লা মাসিয়া এখনও সেরা প্রতিভা তৈরির সেরা বিদ্যালয়।
আজ ফাইনালে দুই ভিন্ন দেশের জার্সিতে মুখোমুখি দাঁড়াবেন একই স্কুলের ছাত্ররা। তাঁদের জাতীয় সংগীত আলাদা, গায়ের জার্সি আলাদা। কিন্তু বল পায়ে নিলেই বোঝা যাবে, তাঁদের ফুটবলের ভাষা এক। ছোটো ছোটো পাস, বলের প্রতি সম্মান, দ্রুত সিদ্ধান্ত আর দলগত খেলায় বিশ্বাস— এসবই লা মাসিয়ার শিক্ষা।
২০১০ সালের ব্যালন ডি’ওরের শেষ তিনজন মেসি, জাভি ও ইনিয়েস্তা— তিনজনই ছিলেন লা মাসিয়ার ছাত্র। আবার ২০১১ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বার্সেলোনার শুরুর একাদশের সাতজনই উঠে এসেছিলেন এই অ্যাকাডেমি থেকে। ফুটবল ইতিহাসে এমন নজির বিরল। একসময় এই অ্যাকাডেমি পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিল লাওনেল মেসিকে। আজ সেখান থেকেই উঠে আসছেন লামিনে ইয়ামাল।
কার মুখে ফুটবে শেষ হাসি?
লা মাসিয়ার পুরানো ছাত্র মেসির নাকি
নতুন শিষ্য ইয়ামালের?
উত্তর মিলবে আজ মাঝরাতেই।