অনেকদিন এক জায়গায় থেকে ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন, গতানুগতিক কাজ করতে করতে একঘেয়ে লাগছে? তাহলে চলুন ক’দিনের জন্য ঘুরে আসা যাক কলকাতার কাছেই উত্তর পশ্চিম বাঁকুড়ার পাহাড় জঙ্গল উপজাতি অধ্যুষিত বিহারীনাথ। এই অঞ্চলে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতের বিখ্যাত ও পরিচিত শিবমন্দির। সারা বছর বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, এমনকী, পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া ঝাড়খণ্ড থেকেও তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন। মন্দিরের পিছনেই প্রায় গা দিয়ে উঠেছে বাঁকুড়ার সর্বোচ্চ পাহাড় বিহারীনাথ। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ মন্দিরের পিছনে ঘন জঙ্গলের পথ ধরে কষ্টসাধ্য ট্রেকিং করে বিহারীনাথ পাহাড়ে চড়েন। এই অঞ্চলে কেবল বিহারীনাথ পাহাড়ই নয়, চারদিকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় অজস্র টিলা। গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গাড়ি যাওয়ার রাস্তা। দিনের বেলা গভীর জঙ্গলের ভিতরে যেতে গা ছমছম করে। হঠাৎই দেখা মিলতে পারে বুনো হাতি, ভল্লুক, বন্য শূকর বা হরিণের। আর আছে শজারু। রাতে শজারুর দল বেরলে শোনা যায় তাদের কাঁটার ঝমঝম আওয়াজ।
সোম ও শুক্রবার এই মন্দিরে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হয়। এছাড়া শিবরাত্রিতে বিশাল মেলা বসে। শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে চারদিক থেকে আসেন তীর্থযাত্রী। শিবলিঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য দেবদেবীর মন্দিরও আছে। সামনে বিশাল জলাশয়। পুরো অঞ্চলটাই উপজাতি অধ্যুষিত। সাঁওতাল, শবর, ঘেড়িয়া, মাহাতোদের বাস। উৎসব পরবে বা চাঁদনি রাতে উপজাতি গ্রামে আনন্দ উৎসব হয়। দূর থেকে ভেসে আসে ধামসা-মাদলের আওয়াজ। উপজাতিরা মাদলের মৃদু তালে তালে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী নাচ করতে করতে মনে করিয়ে দেন সত্যজিৎ রায়ের সাড়া জাগানো ছায়াছবি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র কথা।
বিহারীনাথের চারদিকে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কোলিয়ারি। ট্রাক ও ওয়াগন বোঝাই হয়ে কয়লা চলেছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে, ইস্পাত ও রাসায়নিক কারখানায়। এই অঞ্চলের মাটির নীচে কয়লার ভাণ্ডার রয়েছে চারপাশে। অদূরেই আরও দু’টি সুন্দর জায়গা বড়ন্তি ও জয়চণ্ডী পাহাড়। প্রকৃতিপ্রেমীরা ইচ্ছা করলে বড়ন্তি ও জয়চণ্ডী পাহাড় অথবা শুশুনিয়া পাহাড় ঘুরে আসতে পারেন। পথের সৌন্দর্য মনোরম। জঙ্গলময় এই রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শাল, পলাশ, মহুয়া ও আকাশমণি গাছের জঙ্গল। বসন্তে এই অঞ্চলের সৌন্দর্য আলাদা। পত্রশূন্য পলাশ গাছের শাখায় শাখায় ফুটে ওঠে আগুনরাঙানো পলাশ। দূর থেকে তার দৃশ্য নয়নাভিরাম। মনে হয় জঙ্গলে আগুনরঙা ঢেউ উঠেছে। আর আছে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খেজুর ও তাল গাছের সমারোহ। শীতের শুরুতে শিউলিরা খেজুর গাছে দা দিয়ে চেঁছে চোঙা লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেন কলসি। সংগৃহীত রস খড়ে আর কাঠের আগুনের আঁচে জাল দিয়ে তৈরি করে নলেন গুড়, যা গন্ধ ও স্বাদে অপূর্ব।
সকালে উঠে শুকনো পাতা মাড়িয়ে জঙ্গলের পথে হাঁটার আনন্দই আলাদা। হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাই। ফেরার পথে ছোট চায়ের দোকানে অতিরিক্ত পাওনা গরম শিঙাড়া, জিলিপি আর চা। উষ্ণ চায়ে চুমুক দিয়ে পাহাড় অরণ্যকে উপলব্ধি করার অনুভূতি অনন্য। দূরের তীর্থযাত্রীরা পুজো দেওয়ার পর
এইসব ছোট দোকানেই মধ্যাহ্নভোজ সারেন। বছরের যে কোনও সময়ই বিহারীনাথ চলে আসা যায়। তবে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস বিহারীনাথ যেন অপূর্ব!
যাবেন কীভাবে: রানিগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে আসা সুবিধাজনক। দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। এছাড়া আসানসোল আদ্রা রেলপথে মধুকুণ্ডা স্টেশনে নেমে গাড়ি বুক করে আসা যায়।
থাকার জায়গা: বিহারীনাথে দু’তিনটে থাকার জায়গা আছে। পশ্চিমবঙ্গ ট্যুরিজম-এর ওয়েবসাইটে সব খবরাখবর পাবেন।
সোমনাথ মজুমদার