নয়াদিল্লি: পাঁচ টাকা আয় হলে তিন টাকা ব্যয়, আর দু’টাকা সঞ্চয়। এটাই চিরকালীন থিয়োরি মধ্যবিত্তের। তারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, সংসার চালায়, নিজের শখে কাটছাঁট করে, আর তিলে তিলে সঞ্চয় করে সম্পত্তির দিকে ঝাঁপায়। তা সে স্থাবর বা অস্থাবর, দুই-ই হতে পারে। নরেন্দ্র মোদির নতুন ভারতে ব্যাংক লোন নেওয়া অনেক সহজ হলেও ডাউন পেমেন্ট করতেই হয়। আর সেখানেও এবার টান পড়ে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের। ঠিক এই কারণে, সম্পত্তি তৈরির অনুপাতে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে এক একটি পরিবারের উপর দেনার বার্ষিক গড় পরিমাণ। সবচেয়ে বড় কথা, এ কোনও বিরোধী দাবি নয়, পরিসংখ্যান খোদ রিজার্ভ ব্যাংকের। আরবিআইয়ের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কোভিড পূর্ববর্তী সময়কালের নিরিখে দেশবাসীর আর্থিক দায় বা ধারদেনার হার বেড়েছে ১০২ শতাংশ! সেখানে সম্পদ তৈরির হার কতটা বেড়েছে? ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ধারদেনা তুলনায় দ্বিগুণ। এই গোটা পরিসংখ্যান গত ছ’বছরের—২০১৯ থেকে ২০২৫। নজর করার মতো বিষয় হল, দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) নিরিখেও সম্পদ বৃদ্ধির হার কিন্তু কমেছে। এবং লাফিয়ে বেড়েছে আর্থিক দায়।
বিশেষজ্ঞরা সর্বদা ক্রেডিট ইকনমির পক্ষে সওয়াল করেন। অর্থাৎ, মানুষ যত ভোগ্যপণ্যে খরচ করবে, ততই জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়বে। আর সেই নিরিখে বাড়বে উৎপাদন। তখনই বাজার অর্থনীতিতে টাকা ঘুরবে। প্রায় দেড়শো কোটির ভারতে এই অঙ্কের উত্তর মেলানোটা মুশকিল। প্রধান কারণ দু’টি। প্রথমত, সমাজের মাত্র ৫ শতাংশের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৯৫ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষার অভাব। একজন মধ্যবিত্ত সামান্য বেতনের চাকরিজীবন শেষ করার পর খুব বেশি অর্থ বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন না। তাই তাঁরা সারা জীবন ধীরে ধীরে সঞ্চয় করেন। যাতে অবসরের পর অসুবিধায় পড়তে না হয়। কিন্তু বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির জ্বালা যেখানে পৌঁছেছে, সঞ্চয়ের সুযোগ ক্ষীণ। অর্থাৎ, সঞ্চয় হচ্ছে না, সম্পদ তৈরি হচ্ছে না, অথচ দেনা বাড়ছে। আরবিআইয়ের আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের পারিবারিক ঋণের বহর ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে জিডিপির ৪২ শতাংশ। ২০১৫ সালে সেটাই ছিল জিডিপির মাত্র ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় আয় বৃদ্ধির তুলনায় গড় ঋণ বেড়েছে দ্বিগুণ। ২০২৩ সালের ৩.৯ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের মার্চে হয়েছে ৪.৮ লক্ষ টাকা। আর এই ধারের বোঝার ৫৫ শতাংশই ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, পার্সোনাল লোন, গাড়ি ও গোল্ড লোন। আর গৃহঋণ? মোট পারিবারিক ঋণের ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ, ঋণ বাড়লেও তা সম্পদ সৃষ্টিতে নয়, সংসার চালাতেই খরচ করা হচ্ছে। উপরন্তু আরবিআই বলছে, ২০১৯-২০’তে পারিবারিক আর্থিক সম্পদে ২৪.১ লক্ষ কোটি টাকা যুক্ত হয়েছিল। তা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে ৩৫.৬ লক্ষ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধির হার ৪৮ শতাংশ। সেখানে ২০২৪-২৫ সালে আর্থিক দায় বেড়েছে ১৫.৭ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ সালে তা ছিল ৭.৫ লক্ষ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ১০২ শতাংশ। বোঝা যাচ্ছে, মহামারী পরবর্তী সময়ে ঋণের বোঝা বিপুল হারে বেড়েছে আম জনতার। অথচ সেই নিরিখে সম্পদ সৃষ্টি হয়নি। ব্যাংকের নামমাত্র নিশ্চিত সুদের বদলে মানুষ মরিয়া হয়ে ঝুঁকেছে শেয়ার বাজারে। উৎপাদন সেক্টর কিন্তু এরপরও উন্নতির মুখ দেখেনি। তার মানে, ভোগ্যপণ্যের চাহিদা খুব বেড়েছে, এমনটাও নয়।