জেরুজালেম, দুবাই ও ওয়াশিংটন: টার্গেট একজনই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। রাখঢাক না করে এবার সরাসরি ঘোষণা ইজরায়েলের। বৃহস্পতিবার ভোরেই দক্ষিণ ইজরায়েলের বিরশেবায় ১ হাজার বেডের সোরোকা মেডিক্যাল সেন্টারে আছড়ে পড়েছে ইরানি মিসাইল। জখম অন্তত ৪০ জন। হাসপাতালে হামলার পরই ইহুদি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হুঙ্কার— ‘সহ্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। আর রেয়াত নয়। তেহরানকে এর মূল্য চোকাতে হবে।’ একধাপ এগিয়ে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘মডার্ন হিটলার’ আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘খামেনেইকে খতম করাই এই যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। এমন একটা লোককে আর জীবিত ছেড়ে দেওয়া যায় না।’ এই পরিস্থিতিতে সবথেকে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র উদ্ধৃত করে তাদের খবর, ইরানে মার্কিন হামলার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি। ‘অপারেশন ইরান’ নিয়ে সায়ও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ঠিক কবে থেকে সেই ‘অপারেশন ইরান’ শুরু হবে, সেবিষয়ে তিনি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। এপ্রসঙ্গে সরাসরি কিছু জানাতে চাননি ট্রাম্প। রহস্য জিইয়ে রেখে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘আমেরিকা যুদ্ধে যেতেও পারে, নাও পারে। সব কিছু নিয়েই আমার প্ল্যান প্রস্তুত। সম্প্রতি আমি ওয়ার রুমে বৈঠকও করেছি। আমি কী করব তা কারও জানা নেই। ঠিক এক সেকেন্ড আগে সব কিছু চূড়ান্ত করব।’ যদিও পাশে দাঁড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
যুদ্ধের সপ্তম দিনে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলা আরও জোরালো হয়েছে। তেল আভিভের কাছে একটি বহুতল ও কিছু বাড়িতেও আছড়ে পড়েছে মিসাইল। ইজরায়েলি বাহিনীরও দাবি, ইরানের আরও একটি পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। এই কেন্দ্রটিতেই রয়েছে হেভি ওয়াটার পরমাণু চুল্লি। সংঘাতের মধ্যেই ভারতীয়দের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। এদিনই দিল্লি এসে পৌঁছেছেন কাশ্মীরের শ’খানেক পড়ুয়া। ইরানে এখনও আটকে প্রায় চার হাজার ভারতীয়। তাদের ফেরাতে জারি রয়েছে ‘অপারেশন সিন্ধু’।
ইজরায়েল ও আমেরিকার প্রবল চাপের মুখে পড়ে এদিন অনড় অবস্থান থেকে সরে এসেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অবশেষে জানিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের সঙ্গে শুক্রবার জেনিভায় বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি। ফলে কূটনৈতিক স্তরে সমাধানের নয়া এক প্রচেষ্টার ইঙ্গিতও মিলছে। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে, জেনিভার বৈঠকে থাকবেন ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির বিদেশমন্ত্রীরা। বৈঠকে অংশ নেবেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকরাও। তবে বৈঠকের এই তোড়জোড়ের মধ্যেই অবশ্য হামলা ও পাল্টা হামলার পর্ব অব্যাহত। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়া সোরোকা মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎকরা জানিয়েছেন, এয়ার রেড সাইরেন সবে মাত্র থেমেছিল। তা সত্ত্বেও কান ফাটা শব্দে আচমকা মিসাইল আড়ছে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মূলত পুরনো সার্জারি বিল্ডিংটি। যুদ্ধের আবহেই সম্প্রতি এই ভবনটি খালি করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো গিয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদ মাধ্যমের যদিও দাবি, হাসপাতাল নয় বরং পাশেই ইজরায়েল সেনার দপ্তরকে নিশানা করা হয়েছিল।
ইজরায়েলি সেনা আবার নিশানা বানিয়েছে তেহরান থেকে ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আরাক পরমাণু কেন্দ্রের হেভি ওয়াটার পরমাণু চুল্লিকে। সাধারণত পরমাণু চুল্লিকে ঠান্ডা করার কাজে হেভি ওয়াটার ব্যবহার করা হয়। সেই প্রক্রিয়ার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে উৎপন্ন হয় প্লুটোনিয়াম। পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাজে তা ব্যবহার করা সম্ভব। সেই চুল্লিতে ইজরায়েলের এই হামলা সত্ত্বেও কোনও রকম তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি বলে দাবি ইরানের সরকারি টিভি চ্যানেলের। এর আগে হামলার মুখে পড়েছে ইরানের নাতানজ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, একটি সেন্ট্রিফিউজ ওয়ার্কশপও।