Bartaman Logo
৮ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পরানসখা বন্ধু হে আমার

‘বর্ষাকাল তোমাকে তোমার বাঞ্ছিত হিত অর্পণ করুক। বর্ষাকাল তো সুখের জন্য নহে, ইহা মঙ্গলের জন্য। বর্ষাকালে উপভোগের বাসনা হয় না, ‘স্বয়ং’-এর মধ্যে একটা অভাব অনুভব হয়, একটা অনির্দ্দেশ্য বাঞ্ছা জন্মে।’

পরানসখা বন্ধু হে আমার
  • ৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্রাবণে অন্য এক বিষণ্ণতা নিয়ে আসে বাইশ তারিখটা। এত বছর পরে আলাদা করে শোক পাওয়ার কিছু থাকে না হয়তো, বিশেষত যে জীবন সদা জীবন্ত মানুষের মনে। তবু একবার যেন মনে পড়ে আজ বাইশ। শ্রাবণের বাইশ। বৃষ্টি পড়ুক বা না পড়ুক সেটা বৃষ্টি ভেজা, আকাশ কালো করে আসা দিন। লিখছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।

Advertisement

বহুগুণরমণীয়ো যোষিতাং চিত্তহারী
তরুবিটপলতানাং বান্ধবো নির্ব্বিকারঃ।
জলদসময় এষ প্রাণিনাং প্রাণহেতুর্‌-
দিশতু তব হিতানি প্রায়শো বাঞ্ছিতানি॥’

‘বর্ষাকাল তোমাকে তোমার বাঞ্ছিত হিত অর্পণ করুক। বর্ষাকাল তো  সুখের জন্য নহে, ইহা মঙ্গলের জন্য। বর্ষাকালে উপভোগের বাসনা হয় না, ‘স্বয়ং’-এর মধ্যে একটা অভাব অনুভব হয়, একটা অনির্দ্দেশ্য বাঞ্ছা জন্মে।’ 
বিবিধ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ এইভাবে বর্ষাকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর গানে, কবিতায়, গল্পে সেই নিবিড় ঘন আঁধারে শ্রাবণের ধারাপাতকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে ব্যক্ত করেছেন। আর আমরা দিনগত পাপক্ষয়ের ভিতরে ছুটতে থাকা মানুষ, আষাঢ়-শ্রাবণের ধারাবাহিকতার ভিতর ভিজে ভিজে এই ধারা শ্রাবণের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিরাটত্ব খুঁজতে চেষ্টা করতে থাকি। এই জলে জলাকার রাস্তা, ভিজে ছাতার ঘ্যানঘ্যানে আর্দ্রতা  হাঁটুজলের ভিতর দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষায় থাকা বাঙালি কেন যে গুনগুন করে—‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে দুয়ার কাঁপে/ ক্ষণে ক্ষণে ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে।’ সে জানে ঘরের বাঁধন তার কোনোদিন ছুটবে না, মাঝেসাঝে একটু পাহাড় সমুদ্রের ডাক ছাড়া এই অনন্ত মাসের মাইনে শেষ আর মাসের শুরুর মাইনে পাওয়া ঋতুচক্রে আটকা পড়ে থাকা জীবন একমুঠো শান্তির পরশ পাবে হয়তো এই বর্ষায়। সেই শান্তি  তাকে এনে দেবে জোড়াসাঁকোর কবি। যা যা বলতে চাইবে, গাইতে চাইবে মন, সব তৈরি করে হাতে দিয়ে গিয়েছেন তিনি। 
মন  ভালো? আছে। মন খারাপ হয়েছে? সে গানও আছে। এমন মেঘও আছে যে না জানিয়ে আচমকা এসে যায়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘর সংসার, সেই উন্মত্ত শ্রাবণ ঘন গহন মোহের নীচে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষ কার কাছে হাত পাতবে? 
 কিছু মানুষের কাছে বর্ষা কালান্তক হয়ে দাঁড়ায়, তা  বানভাসি মানুষের খবরে জানান দেয়। তবু ঘর ভেসে গেলেও, প্রকৃতি সেই ভেঙে পড়া মানুষের মানসলোকের অবলম্বন হয়ে থাকে। আর এই ভাঙন আর সৃষ্টির যে চিরকালীন উৎসব, রবীন্দ্রনাথ তো তারই ঋত্বিক। আর বাঙালি, রাজনীতির কু-আবর্তে, সমাজমাধ্যমের নিত্যদিনের অসহ্য ঝগড়া থেকে এই ভদ্রলোকের হাত ধরে একটু মানুষের মতো বাঁচে। একটু গুনগুন করে, একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে কালো মেঘের আকাশ দেখতে দেখতে বলে ওঠে—আমার  প্রিয়ার ছায়া আকাশে  আজ ভাসে। 
শুধুই রোমান্টিকতা নয়, শুধু  অধ্যাত্মবাদ নয়, এক অন্য মগ্নতা খেলা করে এই বর্ষায়। যাবতীয় অনুভুতির জাদু কলমে মাত করে দেন যিনি, তিনি তো প্রাণের ঠাকুর। এহেন বর্ষার বাস্তবতা প্রথম বালক রবির দুশ্চিন্তার কারণ হয়েও তো এসেছে। অঘোর মাস্টারের কালো ছাতা সেই বৃষ্টির দ্যোতনাকে ধূলিসাৎ করে দেখা দিয়েছে বালক রবির মনে। জোড়াসাঁকোর রবি,  শিলাইদহ, সাজাদপুরে জমিদারির কাজে থাকাকালীন গ্রামবাংলার যে বর্ষাকে যেমন  দেখেছিলেন সেই ছবি বারবার ফিরে এসেছে লেখা, গানে, কবিতায় আর সেই অনবদ্য ছন্দ বাণী সুরের ধারায় স্নাত হয়েছে মন। 
কীভাবে প্রতিদিন পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ কে? —উত্তর হল কীভাবে পাইনি? কোন  ঋতু, কোন দিন তাঁকে ছাড়া কাটানো যায়? বর্ষা মানেই তো রবীন্দ্রনাথ?   বহুবিধ ধারায় তিনি  আসেন মনে। বর্ষার গানের সংখ্যা  শতাধিক।  আষাঢ়  শুরু হয় দেবব্রত বিশ্বাসের অননুকরণীয়, ‘আবার এসেছে আষাঢ়’  দিয়ে। সেই ‘ঢ়’-এর উচ্চারণ শুনলে বুকের ভিতর মেঘ ডেকে ওঠে— বাদল দিনের প্রথম কদম  ফুল থেকে যে আবাহন গীতি শুরু হয়, তা একেবারে গিয়ে থামে ‘আকাশ পারে সুধায় ভরে আষাঢ় মেঘের ফাঁক আজি’ ওই গানে...। হৃদয় মাঝে আশ্বিন কার্তিকের ডাকে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দিয়ে সেই গহন ঘন ছাইল বিদায় নেয়। মনে আছে নাটকের দলে বর্ষার আলেখ্য নির্মাণের সময় সেটা, সদ্য স্কুল পেরিয়ে কলেজে তখন, ঠিক হল , শ্রাবণগাথা নৃত্যনাট্যের ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে’ গান তুলতে হবে। গাইতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম,  গানের প্রথম অংশের যে ধীর চলন সেই চলন আচমকা যেন ঝেঁপে বৃষ্টি আসার মতো দারুণ গতিতে বেড়ে গেল—
এসেছে বরষা, এসেছে নবীন বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা, 
দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,
গীতময় তরুলতিকা।
শতেক যুগের কবিদলে মিলি আকাশে
ধ্বনিয়া তুলিছে গন্ধমদির বাতাসে
শতেক যুগের গীতিকা,
শত-শত গীত-মুখরিত বনবীথিকা॥

মনে হল, গানের শুরুতে শ্রাবণের ধারা যেন কিছু মন্দগতি,  কিন্তু ধীরে ধীরে সেই লয় বেড়ে গেল আচমকা  আকাশভাঙা বৃষ্টিতে, আরও চমৎকৃত হতে হল ওই পঙ্‌ক্তিতে শতেক যুগের কবিদল, শতেক যুগের গীতিকা নিয়ে এসে দাঁড়াল যেন। সেই গানে যেন বনবীথিকা মুখরিত হয়ে উঠল। এক মুহূর্তে, সে কোন সময়ের পটভূমিকে ব্যাপক করে, উত্তর কলকাতার রিহার্সাল রুমের স্পেস থেকে কোন মহাশূন্যের মেঘে মিলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন রবি ঠাকুর। গানটা এখনও শুনলে একরকম অনুভূতি হয়। আর  শ্রাবণগাথা তো শুরুই হয় বর্ষাকে অভ্যর্থনা জানিয়েই। 
বর্ষার গানে রবীন্দ্রনাথ তীব্র, তাঁর আবেগ, অনুভূতি প্রেম ভালোবাসা বিরহ সবকিছু যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায় গানগুলোতে। একান্ত শহরবাসী মানুষও পেয়ে যায় মাঠের ওপর থেকে ছুটে আসা বৃষ্টির ঘ্রাণ, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া, আষাঢ়? বিপুল দ্যোতনায় যখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যায় দিগন্ত তখন আপন মনেই গেয়ে উঠি, ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জ ছায়ায় সম্বৃত অম্বর’। ব্যক্তি মানুষের এই আষাঢ় শ্রাবণের অনুভূতিকে শব্দে সুরে রূপ দিয়েছেন যিনি, একে একটা পঙ্‌ক্তিতে হাত খুলে এমন খেলেছেন অবাক লাগে। বৃষ্টির ধারাপাতে মিলিয়ে দিয়েছেন নতুনের আবির্ভাব। ‘বুঝি বা এই বজ্ররবে নতুন পথে বার্তা কবে, কোন পুরীতে গিয়ে তবে প্রভাত হবে রাতি’। আবার অনবদ্য প্রেমের ছটায় ভাস্বর হয়ে উঠেছেন পদাবলিতে,
 
দমকত বিদ্যুত, পথতরু লুন্ঠিত, থরহর কম্পিত দেহ
ঘন ঘন রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌ বরখত নীরদপুঞ্জ।
শাল-পিয়ালে তাল-তমালে নিবিড়তিমিরময় কুঞ্জ।
কহ রে সজনী, এ দুরুযোগে কুঞ্জে নিরদয় কান
দারুণ বাঁশী কাহ বজায়ত সকরুণ রাধা নাম।

গানের ধারায় কোথাও  তিনি সচেতন, শ্রাবণের আমন্ত্রণে তাঁর দুয়ার কেঁপে ওঠে ছুটে যেতে চান বাইরে। আবার কখনো গভীর মগ্নতায় ঘুমের ঘোরে জেগে ওঠেন, ‘আমি তখনও ছিলাম মগন গহন ঘুমের ঘোরে, যখন বৃষ্টি নামল।’ কবিতায় গানে যেভাবে  ধারণ করেছেন, তা নিয়ে লেখার মতো ধৃষ্টতা  লেখকের নেই। কিন্তু তাঁর  গান কবিতার পাশাপাশি ছোটো গল্পে, উপন্যাসেও বর্ষা ধরা দিয়েছে। মনে হয়, যেন প্রকৃতির এই অকৃপণ দানের মুগ্ধতায় নিজেকে জারিত করে নিতেন তিনি। শান্তিদেব ঘোষের একটা গানের ক্যাসেট ছিল বাড়িতে, বিভিন্ন রবীন্দ্রসংগীত সৃষ্টি হয়ে ওঠার ইতিহাস ছিল তাতে, সেখানে শুনেছি, বর্ষার মুখরিত সখ্যে গান বাঁধা হলে সেই গানে সুর দিয়ে বৃষ্টির ভিতর গান গাইতে গাইতে  ছুটে আসতেন দীনু ঠাকুরের কাছে, যদি সুর ভুলে যান তাই শ্রাবণ ধারার মাঝে ওয়াটার প্রুফ গায়ে ভিজতে ভিজতে মাঠ ভেঙে গান গাইতে গাইতে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ— এ ছবি যেন চিরকাল মনে গেঁথে থাকে। 
গান ছাড়াও ছোটো গল্পে অনেকবার খুঁজে পেয়েছি সেই প্রকৃতি সাধককে— ‘সমাপ্তি’, ‘পোস্ট মাস্টার’ এই গল্পগুলোতে গ্রামবাংলার বর্ষা ছবির মতো স্পষ্ট করে এঁকেছেন। সবথেকে ছুঁয়ে যায় খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনে— পদ্মার সেই ভয়াল পাড়ভাঙা রূপ। পাঠক পড়তে পড়তে আগাম বুঝে নেন কী ঘটতে  চলেছে। সেরকম একটা ছোটো গল্প ‘একরাত্রি’। সুরবালা আর গ্রামের সেই শৈশবের সঙ্গীর পুতুল খেলার মতো বিয়ে। তারপর ছেড়ে আসা। আবার এক প্রলয়ের রাতে দু’জনের সামনাসামনি এসে দাঁড়ানো। চারদিকে বন্যার প্রলয়ঙ্কর রূপ, একটি উঁচু ডাঙায় দাঁড়িয়ে মুখোমুখি। এমন দিনে তারে বলা যায় কি? কে জানে, সেখানেও তো মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরে তপন হীন ঘন তমসা। 
‘আজ সমস্ত বিশ্বসংসার ছাড়িয়া সুরবালা আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। আজ আমি ছাড়া সুরবালার আর কেহ নাই। কবেকার সেই শৈশবে সুরবালা, কোন্‌-এক জন্মান্তর, কোন্‌-এক পুরাতন রহস্যান্ধকার হইতে ভাসিয়া, এই সূর্যচন্দ্রালোকিত লোকপরিপূর্ণ পৃথিবীর উপরে আমারই পার্শ্বে আসিয়া সংলগ্ন হইয়াছিল; আর, আজ কতদিন পরে সেই আলোকময় লোকময় পৃথিবী ছাড়িয়া এই ভয়ংকর জনশূন্য প্রলয়ান্ধকারের মধ্যে সুরবালা একাকিনী আমারই পার্শ্বে আসিয়া উপনীত হইয়াছে। জন্মস্রোতে সেই নবকলিকাকে আমার কাছে আনিয়া ফেলিয়াছিল, মৃত্যুস্রোতে সেই বিকশিত পুষ্পটিকে আমারই কাছে আনিয়া ফেলিয়াছে— এখন কেবল আর-একটা ঢেউ আসিলেই পৃথিবীর এই প্রান্তটুকু হইতে বিচ্ছেদের এই বৃন্তটুকু হইতে, খসিয়া আমরা দুজনে এক হইয়া যাই।’ 
আজীবন নতুন আনন্দে জাগিয়ে যাওয়ার, ভাবিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব তাঁর , নির্মম আঘাতের ঢেউ বহুবার লেগেছে তাঁর নৌকোর ডাইনে বাঁয়ে। তবু  সামলে নেবার অমোঘ প্রাণ সুধা দিয়ে গেছেন তিনি। বর্ষা বহুবার সেই আঘাত নিয়েও এসেছে যাকে, গ্রহণ করে নৈবেদ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সৃজনের মহিমায়। এই শ্রাবণের শুরুতে চলে গিয়েছিলেন। দীনু ঠাকুর যাঁর জন্য লিখেছিলেন— ‘আজি বরিষণ মুখরিত শ্রাবণ রাতি’। শুনতে শুনতে আচমকা মনে হতে পারে শ্রাবণের গানগুলো যেন সেই নির্মম আঘাত থেকে উঠে আসা এক একটি মহাকাব্য। এভাবেই তো মানুষ বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পায়। জীবন, প্রকৃতি, তার রুক্ষতা, পরক্ষণেই মেঘ মেদুর জলছবি হয়ে যাওয়া চারপাশ, এভাবেই মানুষও তো 
এগিয়ে যায়। 
তবু, শ্রাবণে অন্য এক বিষণ্ণতা নিয়ে আসে বাইশ তারিখটা। এত বছর পরে আলাদা করে শোক পাওয়ার কিছু থাকে না হয়তো, বিশেষত যে জীবন সদা জীবন্ত মানুষের মনে। তবু একবার যেন মনে পড়ে আজ শ্রাবণের বাইশ। বৃষ্টি পড়ুক বা না পড়ুক সেটা বৃষ্টি ভেজা, আকাশ কালো করে আসা দিন। 

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার 
পরানসখা বন্ধু হে আমার 
আর তারপর...

... সুদূর কোন্ নদীর পারে, গহন কোন্ বনের ধারে 
গভীর কোন্ অন্ধকারে হতেছ তুমি পার। 

চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীর দিকে। বৃষ্টি নামছে। 
ছবি: সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ