সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে সাহেব চট্টোপাধ্যায়।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে সাহেব চট্টোপাধ্যায়।
আমার মা! কী যে বলি মাকে নিয়ে? যা-ই বলি, তা-ই তো কম পড়ে যাবে। মাকে নিয়ে কারও বলাই শেষ হয় না। মা নিজেই যেন আস্ত একটা পৃথিবী। খবরের কাগজের নির্ধারিত শব্দসংখ্যার ভিতর তাঁকে ধরে রাখা যায় না। তবু মায়ের কথা ভাবতে বসলে প্রথমেই একটা অনাবিল আনন্দ হচ্ছে ইদানীং। কারণটা আর কিছুই নয়, সামনের বছরই আমি ৫০-এ পা দেব। আর আমার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কও পঞ্চাশ বছরে পড়বে। গোল্ডেন জুবিলি একেবারে! আমার এই ধেড়ে বয়সে এখনও আমার নানা কাজে মায়ের নজর। শ্যুট শেষ করে ভোরে ফিরি বা গভীর রাতে, মা এখনও জেগে বসে থাকেন। আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে, আমার গাল ধরে পাওনা আদরটুকু করে তবে তিনি ঘুমোতে যাবেন। ছোট থেকেই দেখেছি, আর পাঁচজন মায়ের মতো আমার মায়েরও কোনও চাহিদা নেই। আলাদা করে নেই কোনও অভিযোগ। আমার পরিবারের সব কালো ব্লটিং পেপারের মতো শুষে, সব আলো শুধু আমাদের জন্য রাখেন মা। আর বেশিরভাগ বাঙালি মাকেই দেখি, মাল্টিটাস্কার হতে। আমার মাও তার ব্যতিক্রম নন।
লিখতে বসে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। বছর কয়েক আগে মায়ের ডান হাতটি ভয়ানক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। কয়েক টুকরো হয়ে যায়। সেই হাতের অপারেশন দুর্ভাগ্যবশত সফল হয়নি। চিকিৎসকের ভুলেই একপ্রকার মায়ের ওই হাতটিতে আজও মাঝে মাঝেই অসহ্য যন্ত্রণা হয়। বয়সজনিত নানা জটিলতা থাকায় প্যারাসিট্যামল ছাড়া ব্যথার ওষুধও খাওয়া যায় না বিশেষ। তা সত্ত্বেও আমার প্রতি জন্মদিনে ওই হাত নিয়েও মা পোলাও, পায়েস রান্না করেন। কতবার বারণ করি! কিছুতেই শোনেন না। উল্টে রাগ করেন বেশি বারণ করলে। এমনিতে আমার মা কিন্তু রাগী নন একটুও। ছোট থেকেই আমার ভুলত্রুটির সময় দেখেছি, আমার মা ও বাবা দু’জনেই দুমদাম বকুনি বা মারের চেয়ে এই অন্যায়ের ফলে কী হবে, হলে কী ক্ষতি হবে এগুলো বেশি বুঝিয়ে বলতেন। তারপরেও কথা না শুনলে মা কিন্তু চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দিতেন আচ্ছা করে। আজকাল সেটা খুব মিস করি!
একটু আগে বলছিলাম না, মা ব্লটিং পেপার? তাহলে কেন এই ভাবনা এল, জানাই। বছর খানেকের মধ্যে আমার দুই তুতো বোন মারা যান। তার মধ্যে একজন আমার চেয়ে বয়সে বড়, আর একজন ছোট। আমার ছোট যে বোনটি সে প্রায় আমার নিজের বোনের মতোই, কারণ সে ছোটবেলায় বহু বছর আমাদের বাড়িতে থেকেছে। আমরা ভাই-বোনের মতোই বড় হয়েছি। বড়দিদিও আমাদের খুব প্রিয় ছিল। তাদের মৃত্যু আমি আজও হজম করতে পারিনি। সহজেই ভেঙে পড়ি। কিন্তু মাকে দেখেছি সন্তানসম মেয়েদের মৃত্যুশোকেও আমাদের সামলে যাচ্ছেন। নিজে কাঁদছেন আড়ালে! এই মায়ের ছেলে বলে শুধু গর্বই হয় না, বরং চাই যদি পুনর্জন্ম আসে, যতবার জন্মাব, ততবার যেন এই মাকেই ‘মা’ হিসেবে পাই। মা নেই এই পৃথিবীতে, আর আমি আছি এ আমার কাছে এক অবাস্তব ভাবনা। আমি ও আমার স্ত্রী— দু’জনের কাছেই মা বড় আদরের। সদ্য দুর্গাপুজো মিটল বটে, কিন্তু আমার মা রাখী চট্টোপাধ্যায় আমার কাছে আজীবনের দশভুজা!