নানা অলংকারে শোভিতা উমা। মর্তে তাঁর মেয়েরাই মায়ের জন্য গয়না তৈরি করেন। তেমনই দুই মেয়ে মুক্তি প্রামাণিক এবং মাধবী পাল। প্রতিমার গয়না তৈরির নেপথ্য কাহিনি ভাগ করে নিলেন।
নানা অলংকারে শোভিতা উমা। মর্তে তাঁর মেয়েরাই মায়ের জন্য গয়না তৈরি করেন। তেমনই দুই মেয়ে মুক্তি প্রামাণিক এবং মাধবী পাল। প্রতিমার গয়না তৈরির নেপথ্য কাহিনি ভাগ করে নিলেন।
কুমোরটুলির সরু গলিতে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে। শশব্যস্ত সকলে। কোথাও প্রতিমার কাঠামোয় লেগেছে মাটির প্রলেপ, আবার কোথাও রঙের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। এর মাঝে আচমকা বৃষ্টি। ব্যস্ততা দ্বিগুণ হল। দোকান ঢাকতে ব্যস্ত সকলে। সামান্য ধরল বৃষ্টিটা। নীল রঙের প্লাস্টিকটা সরিয়ে ঢুকে পড়া গেল একটা ছোট্ট ঘরে। সেখানে মন দিয়ে কাজ করছেন এক মহিলা। তাঁর আঙুলের সামান্য নড়াচড়ায় তৈরি হচ্ছে মুকুটের নকশা। একটু একটু করে ফুটে উঠছে মায়ের সাজ। বাইরে প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা বাড়ছে। ভিতরে নিঃশব্দে তৈরি হচ্ছে প্রতিমার সাজ, যা কয়েকদিনের মধ্যেই মণ্ডপের আলোয় ঝলমল করবে। কাজ থেকে সামান্য বিরতি নিয়ে হাতে চায়ের কাপ তুললেন শিল্পী। হেসে বললেন, ‘পুজোর আগে এটাই আমাদের বাড়ি-ঘর সবকিছু। কাজের মধ্যেই ডুবে থাকি সারাদিন।’
তিনি মুক্তি প্রামাণিক। বোলানের সাজ তৈরি করেন তিনি। কাগজের উপর বিশেষ ধরনের সুতো দিয়ে তৈরি হয় নকশা। সেই নকশার উপর বিভিন্ন পুঁতি, কাচ, রাংতা দিয়ে হয় কারুকার্য। মুকুট, বাজুবন্ধ, হার, ঝুমকো সহ নানা গয়নায় সালংকারা হয়ে ওঠেন দেবী। চা খেয়ে সেই গয়না তৈরির কাজেই আবার মনোনিবেশ করলেন মুক্তি দেবী। আঠা দিয়ে অত্যন্ত যত্নে পুঁতি বসাতে বসাতে প্রৌঢ়া বলে চললেন, ‘আমি কাটোয়ার মেয়ে। ছোটোবেলায় বাবাকে দেখতাম এই কাজ করতে। তখন তো অন্যরকম কাজ ছিল। এখনকার কাজের সঙ্গে তার কোনো মিলই নেই। এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে সবকিছু। গয়না, সাজের ধরনও বদলেছে।’ মুক্তি দেবী জানালেন, বাবার হাতের কাজ দেখতে দেখতেই শুরু হয়েছিল তাঁর কর্মশিক্ষার প্রথম ধাপ। পরে বিয়ে হয় এই কুমোরটুলির পাড়াতেই। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও যুক্ত ছিলেন মায়ের গয়না তৈরির কাজেই। মুক্তি দেবীর আগ্রহ ছিল কাজ শেখার। হাতেকলমে শিখতে শুরু করলেন দুই সন্তানের জন্মের পর। ধীরে ধীরে দক্ষতা তৈরি হল। প্রথম থেকেই পরিবার পাশে। ঝড়-ঝাপটা সামলেছেন প্রতিনিয়ত। স্বামী মারা গিয়েছেন। এক ছেলেকে হারিয়েছেন কয়েক বছর আগে। তবু তাঁর লড়াই থামেনি। প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ চলছে। এক ছেলে ও বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে নিয়ে জারি ও শোলাপিঠের গয়না তৈরি করেন তিনি। জারি কী? তিনি জানালেন, পোশাক সাজানোর জন্য যে সোনালি সুতোগুলি দেখা যায়, সেগুলি জারি। আর শোলাপিঠ জলে পাওয়া যায়। একধরনের গুল্ম। দুধের মতো দেখতে সাদা শাঁস জাতীয়। বাংলার কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম অলংকার তৈরিতে ব্যবহার করেন এই শোলাপিঠ। মুক্তি দেবীর হাতের কাজ শোভা পায় লন্ডনের প্রতিমার গায়েও। জানালেন, ‘আগস্টেই আমার তৈরি গয়না লন্ডনে গিয়েছে। খুব আনন্দ পেয়েছি।’ সারা বছরই তাঁর ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবে আষাঢ় মাস বিশেষ করে রথের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসে, তত বাড়তে থাকে অর্ডার। আগস্ট থেকে দুর্গাপুজোর জন্য অর্ডার নেওয়াই বন্ধ করে দেন। চতুর্থী পর্যন্ত চলে অর্ডার সাপ্লাই। এই সময় কাজের চাপ এতটাই বাড়ে যে ঘুমানোর সময়ও পান না অনেকদিন। এরপর শুরু হয় কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রস্তুতি। তবু ব্যস্ততা তাঁর কাছে মোটেই ক্লান্তির নয়, আনন্দের। কারণ কাজ শেষ করে নিজের হাতের গয়না যখন মায়ের শরীরে শোভা পায়, তখন সমস্ত পরিশ্রম যেন সার্থক হয়ে ওঠে। বললেন, ‘ছোটোবেলায় যে কাজ দেখতাম, এখন সেই কাজই আমার নিজের পরিচয়। ৩৮ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পরিবার এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মা যতদিন চাইবেন, এই কাজ করে যাব।’
গয়না তৈরির কাজ করেন মাধবী পালও। তাঁরও শেখা ছেলেবেলা থেকেই। বাবাকে দেখতেন প্রতিমার সাজের কাজ করতে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে সাহায্যও করতেন। শুরুতে গয়না তৈরির কাজ ছিল পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উপায়। পরে বাবার অসুস্থতার সময় সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর উপর। বাবা মারা যান ছোটোবেলাতেই। তখন বাধ্য হয়েই পুরোপুরি কাজটি শিখতে শুরু করেন। সহজ ছিল না সেই পথ। সূক্ষ্ম কাজের জন্য প্রয়োজন ছিল ধৈর্য। বিরামহীন অনুশীলন। তার সঙ্গে মাথার উপর সংসারের দায়িত্ব। মা, দুই বোন। প্রথমদিকে নানারকম ভুল হয়েছে। অর্ডার পেতে নানা সমস্যাতেও পড়তে হয়েছে। পুরুষ কারিগরদের ভিড়ে তাঁকে কাজে নিতেই চাইতেন না অনেকে। ভাবতেন, যদি ভুল হয়, সময় মতো অর্ডার সাপ্লাই করতে না পারেন— তাহলে কী হবে? কিন্তু সমালোচনা সত্ত্বেও থামেননি মাধবী দেবী। নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার। দিন গড়িয়ে রাত হয়েছে। পুরানো নকশা দেখে তৈরি করেছেন নতুন নকশা। হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘নকশা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালোলাগে আমার। আমার করা নকশাই এখন দেখি অনেকে অনুকরণ করেন।’ তাঁর এক্সপেরিমেন্টাল নকশা একসময় পছন্দ করেননি অনেকেই। তবে পরিস্থিতি বদলেছে। সংসার চালানোর তাগিদ থেকে শুরু হওয়া পেশা আত্মনির্ভর করে তুলেছে মাধবী দেবীকে। বিয়ের পর প্রথমদিকে সেভাবে কাজ করতে পারেননি। তাঁর পরিবারের অনুমতি ছিল না। তা অর্জন করেছেন অবশ্য। প্রথমে অন্যের স্টুডিয়োতে কাজ করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের জোয়াল টানতে নিজের দোকান খুলেছিলেন। প্রথমদিকে নিজেই কাজ করতেন। পরে অর্ডার বাড়ায় কর্মচারী রাখতে হয়েছে। এখন মেয়েকেও কাজ শেখাচ্ছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ‘এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পরের প্রজন্মকেও শেখাতে হবে।’
তবে করোনার পর থেকে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। আকাশছোঁয়া কাঁচামালের দাম। তা পাওয়াও যায় না অনেক সময়। তবে মুকুটের দাম সেই তুলনায় খুব বেশি বাড়ানো যায়নি। কেন? মাধবী দেবীর ব্যাখ্যা, ‘যাঁরা অর্ডার দেবেন, তাঁদের হাতে অত টাকা কোথায়?’ মুক্তি দেবীও বললেন, ‘করোনার আগে আমরা কর্মচারীর সঙ্গেও কাজ করেছি। এখন দু’জন রয়েছেন। সঙ্গে আমি আর আমার ছেলে। পুত্রবধূও সাহায্য করে।’ তাঁদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ মেশিন। গয়না তৈরি হচ্ছে আরও সহজে। আরও কম খরচে। ফলে অর্ডারের পরিমাণ কমেছে আগের তুলনায়। তবে মাধবী দেবী বললেন, ‘হাতের কাজের কাছে মেশিন কিচ্ছু নয়। অভিনবত্বই নেই। তাই আমাদের হাতের কাজের এখনও কদর রয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে।’ এতরকমের প্রতিকূলতা, কম মজুরি নিয়েও এই পেশাতেই কেন? একবাক্যে উত্তর, ‘মায়ের জন্য। তিনি তো সবই দিয়েছেন।’
শান্তনু দত্ত