আসলে তিনিই আছেন, মন্ত্র ও আমি নেই, কিন্তু বাস্তবে দেখি তার উল্টো—আমি তো অতি প্রত্যক্ষ প্রকটিত রূপে আছি, মন্ত্রকে না- হয় যোগাড় করলাম, কিন্তু ঈশ্বর তো আমাদের কাছে নিতান্তই বেপাত্তা নস্যাৎ। মন্ত্রের আবৃত্তি আমাদের এই বিকারের ঘোর থেকে উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করে। মন্ত্রের সাধনার প্রভাবে আমি ক্রমে মন্ত্রে পরিণত হই, মন্ত্র ক্রমশ পরমেশ্বরে পর্যবসিত হয়। তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমি বা মন্ত্র কোনটাই থাকি না, থাকেন শুধু তিনি—একমেবদ্বিতীয়ম্—‘ঘর ভরা মোর শূন্যতারই বুকের পরে।’ মন্ত্র এভাবেই আমাকে ত্রাণ করতে সাহায্য করে। মৃন্ময়ের আশ্রয়ে এভাবে আমরা চিন্ময়ের সাক্ষাৎকার পাই।
সকল মন্ত্রকে যে শব্দই হতে হবে, তার মানে নেই। যদিও আমরা সাধারণত শব্দাত্মক মন্ত্রই ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু শব্দ বা ধ্বনি না হয়েও মন্ত্র হওয়া সম্ভব, কারণ যেটি আবশ্যিক সেটি হ’ল কম্পন বা স্পন্দন। বস্তুত আমরা, যাকে বলি শব্দ তা স্পন্দনের এক বিশেষ অভিব্যক্তি মাত্র। উপাংশু জপে বা মানস জপে শব্দ থাকে না, কিন্তু স্পন্দন বা গতি অব্যাহত থাকে। তাই স্পন্দন বা গতিই হ’ল মন্ত্রের মূলীভূত উপাদান।
বস্তুত স্পন্দনই হল সৃষ্টির আদিমূল। এই স্পন্দনকে অবলম্বন করে জপের সূচনা, তা সেই স্পন্দন শব্দরূপে ব্যক্ত হ’ক বা অন্য কোনও প্রকারে প্রকটিত হ’ক। স্পন্দনই গতির মূল, জগতের মূল। পরিপূর্ণ নিষ্পন্দ অবস্থা হ’ল গতির শেষ, জগতের ইতি, ব্রহ্মাণ্ডের যাত্রার বিরতি। তাই স্পন্দন যতক্ষণ আছে ততকাল ব্যক্ত জগদব্রহ্মাণ্ড আছে, ততকাল জপবৃত্ত ভূমিকা আছে। স্পন্দনের অভিব্যক্তি যবে শেষ, সেদিন জগদ্ব্রহ্মাণ্ড হয় সুপ্ত, লুপ্ত এক জপেরও আর কোন প্রাসঙ্গিকতা তখন থাকে না। যতকিছু জড় বস্তু ও বিষয় দুনিয়ায় আমরা দেখি, তা স্পন্দনেরই রকমফের মাত্র।
অণুপরমাণুর বিন্যাসের রকমফের যেমন পৃথিবীর যাবতীয় দ্রব্য সামগ্রী, তেমনিই বলা চলে স্পন্দনের রকমফের ঘটিয়ে পৃথিবীর সকল বিষয়বস্তু আমাদের চেতনাগ্রাহ্য। চোখ, কান, জিহ্বা, ত্বক, নাক যে রূপ শব্দ, রস, স্পর্শ এবং গন্ধ গ্রহণ করে তা স্পন্দনেরই রকমফের মাত্র। আলোক-তরঙ্গের কম বেশী বা রকমফেরই রূপের সৃষ্টি করে। স্পন্দনের রকমফের দ্বারাই জিহ্বা একটির থেকে অপরটির রসাস্বাদ পৃথক করে।
স্পন্দনই ক্রমশ শব্দ এক মন্ত্ররূপে বিকাশ লাভ করে। স্পন্দনই ক্রমশ রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ স্পন্দন থেকে মন্ত্র এবং রূপ এই উভয়েরই আবির্ভাব। মন্ত্রই ক্রমশ দেবরূপ পরিগ্রহ করে। স্পন্দনেরই এক চূড়ান্ত প্রকাশ দেবতার জ্যোর্তিময় মূর্ত্তিতে নামের সঙ্গে রূপের এভাবে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। নাম ধরে রূপে ভাটিয়ে যাওয়া যায় আবার রূপ ধরে নামে উজিয়ে আসা চলে।
ধ্বনি মাত্রেরই একটি রূপ আছে, আবার রূপ মাত্রেরই একটি নির্দিষ্ট ধ্বনি আছে। প্রত্যেক মানুষের যেমন একটি নির্দিষ্ট রূপ আছে তেমনই তাঁর একটি নির্দিষ্ট ধ্বনি বা নামও আছে।
অযাচকের ‘জপ’ (২য় খণ্ড) থেকে