ভাল পথে এগোতে গেলে দেখা যায়, অনেক রকম জটিল বাধার সৃষ্টি হয়। এর সবটাই জানবে ঠাকুরের পরীক্ষা। তিনিই প্রত্যেক মানুষকে এরকম বিভিন্ন বাধার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করেন। দেখেন যে, কে কতখানি প্রস্তুত আছে তাঁর দিকে এগিয়ে আসার জন্য। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রত্যেকের জোরালো মনের পরিচয় পাওয়া যায়। যদি আমাদের প্রত্যেকেরই তাঁকে পাবার জন্য ব্যাকুলতা থাকে এবং দৃঢ় ইচ্ছা থাকে তবেই আমরা চলার পথের সব বাধাকেই নিমেষে অতিক্রম করতে সক্ষম হব।
আমি তোমাদের একটা practical উদাহরণ দিই। ধর, তুমি মন্দিরে যেতে চাইছ, কিন্তু মন্দিরের পথে ভীষণ ভিড়। তখন তোমায় সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হলে প্রথমে simply বলতে হবে—দেখি বাবা, একটু পথ দাও। এই বলতে বলতে তুমি যথাস্থানে পৌঁছে যাবে। কিন্তু যদি কেউ মন্দিরের পথে যেতে তোমাকে ইচ্ছে ক’রে বাধা দেয় বা তোমাকে যেতে না দেয়, তখন তোমার পথকে clear করার জন্যে একটু জোর করতে হবে, প্রয়োজন হলে অবস্থা বুঝে হয়তো বলপ্রয়োগও করতে হবে এবং সেটাতে কোনও অপরাধ হয় না। পূর্ণ ব্রহ্মচর্য্যটাই আসল। সেটা ঠিক ঠিক হলে পরে গেরুয়া। আগে গেরুয়া নিলে গেরুয়ার কোনও মর্যাদাই থাকে না। মহামায়া মেয়েদের রূপ ধরে ছেলেদের চোখের সামনে দাঁড়ান। প্রত্যেকটি মানুষকে এইভাবে প্রলোভন দেখান। মহামায়ার সেই ররূপটিকেই মা বলে প্রণাম করবে। তখন তিনি নিজেই লজ্জা পেয়ে চলে যাবেন। মেয়েদের বেলায় এর ঠিক উল্টো। মেয়েদের সামনে মহামায়া আসেন ছেলের রূপ ধরে। তখন মাতৃভাব আশ্রয় ক’রে তাকে সন্তান বলে মনে করবে। একটা কিছু point পেলেই মন নীচে নেমে যায়। ক্ষুদ্র থেকেও ক্ষুদ্র বাসনা আছে। তাই গেরুয়া পরলেই যে ভাল সাধু হয়ে গেল তা নাও হতে পারে। ওদেরও মনে মহামায়ার সাথে যুদ্ধ চলে। সকলের জীবনেই এটা হয়। আজীবন এই যুদ্ধ ক’রে যেতে হয়। এমনকি ঠাকুর রামকৃষ্ণও নজিরের জন্য এ অবস্থা দেখিয়েছেন। তাই প্রার্থনা ক’রে যেতে হবে। এই যুগটা প্রার্থনার যুগ। শরণাগত হয়ে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
অন্তরে শুভবুদ্ধির গৈরিকটি পরলে পরে আর বাইরে গেরুয়া না পরলেও ঠাকুরের কাজ করা যায়, গৃহে থেকেও কর্মযোগী হওয়া যায়।
নিত্যলীলা সব সময় চলছে। ভগবানের যে লীলা স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, সেটাই নিত্যলীলা। এ লীলা স্থূল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা দেখা যায় না, শোনা যায় না, আস্বাদন করা যায় না। সাধনার দ্বারা যদি কোনও সাধক চিন্ময় দেহ লাভ করেন, তবে নরদেহে থেকেই তিনি ইচ্ছা করলে যখন খুশি। ভগবানকে দর্শন করতে পারেন। আধ্যাত্মিক জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে একটি প্রধান শুণ সহাশক্তি। সহ্যশক্তি অর্থাৎ অহংকে নত ক’রে তাঁর চরণে সঁপে দেওয়া। আমি সহ্য করছি, তার অর্থ হল এই যে, আমি আমার অহংকে বিলুপ্ত ক’রে তাঁর চরণে নিজেকে নিবেদিত করছি। ভগবান পরীক্ষা করেন—আমরা কতখানি তাঁর আপন হতে পেরেছি। যতই ঝড়ঝঞ্ঝা বিপদ আসুক না কেন, কতখানি নীরবে সেটি সহ্য করতে পারি। সুখ দুঃখ সবই ঈশ্বরের দান বলে ভাবতে চেষ্টা করতে হয়। কোনও রকমে বহিঃপ্রকাশ ঘটবে না আমার অন্তরের ভাবের।
প্রত্যেক মহাপুরুষের জীবনেই দেখি, কত দুঃখ আঘাত তাঁরা সহ্য করেছেন নীরবে, বিনা প্রতিবাদে। কোনও সত্য বা আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রথমে নিজে সহ্যশক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অপরকে শিক্ষা দিতে গেলে বা অসৎ কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও তা সফল হবে না, যদি না, নিজের জীবনে এই সহ্যগুণটিকে আয়ত্ত করা যায়। যে যেটি চিন্তা করে সে সেটি হয়ে যায়। পরিবেশটা গৌণ, মনটাই আসল।
শ্রীঅর্চনাপুরী মায়ের বাণী ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে