তন্ময় মল্লিক: এ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে প্রায় পাঁচ মাস। এরই মধ্যে ঘটনার এত ঘনঘটা যে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলছে। প্রায় প্রতিদিনই বিজেপি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা ঘটাচ্ছে, যা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধছে। জন্মাচ্ছে ক্ষোভ। সামনে বড়ো কোনো নির্বাচন নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাজুড়ে চলছে দখলদারির রাজনীতি। নির্বাচন না করেই একের পর এক পঞ্চায়েত, পুরসভা কব্জায় নিচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব কায়েম করার উদ্দেশ্যে কলেজের মাথায় বসাচ্ছে দলীয় নেতাদের। তাতে হয়তো বিজেপির ক্ষমতার বিস্তার ঘটছে। কিন্তু, দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে না। তারজন্য সমালোচিতও হচ্ছে। তাই উঠছে প্রশ্ন, কীসের এত তাড়া?
‘ভয় আউট ভরসা ইন’ স্লোগান দিয়ে বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বাড়বে। রাজ্যে কল-কারখানা হবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের। বেকাররা কাজ পাবে। পুলিশ কাজ করবে নিরপেক্ষভাবে। দলদাস হবে না। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া পুরসভাগুলিতে ভোট হবে। পুরসভা চালাবেন মনোনীত নয়, জনগণ দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ফের শুরু হবে বছরের পর বছর বন্ধ থাকা ছাত্রসংসদের নির্বাচন। কলেজগুলিতে ফিরবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ। অবসান ঘটবে শাসকের শাসনের। প্রত্যাশা ছিল এমনই। কিন্তু, দিন যত যাচ্ছে সেই ভরসার পাশে একটা প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হচ্ছে।
ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিজেপি এ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূলকে ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠল। চালু করে ‘ডিম থেরাপি’। হেনস্তা ও জেলযাত্রার ভয়ে বহু দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী হয়ে গেলেন বিজেপির হাতের পুতুল। শুরুতে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতারাই ডিম থেরাপির শিকার হচ্ছিলেন। এবার আক্রান্ত হলেন সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কী অপরাধ? আদালতে আইনি লড়াই লড়ে ভাঙড় কলেজে অশান্তির ঘটনায় ধৃত দুই এসএফআই কর্মীকে জামিন করিয়েছেন। তাঁর যুক্তি সরকারি আইনজীবীর চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ায় বিচারক জামিন দিয়েছেন। তারজন্য ডিম ছোড়া হবে? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ‘ডিম থেরাপি’র টার্গেট। বিজেপির বিরোধিতা করলেই সহ্য করতে হবে কাঁচা ডিমের গন্ধ।
শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার আশ্বাস ছিল বিজেপির। কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিজেপির অফিসিয়াল কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। কিন্তু, বিজেপির নীতি এবং আদর্শ মেনে ছাত্র রাজনীতি করে এভিবিপি।
রাজ্যে পালা বদলের পর কলেজে, কলেজে এভিবিপি শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে। কিন্তু বহু কলেজেই এসএফআই বা অন্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার জায়গায় নেই। প্রতিটি কলেজের মাথায় দলের নেতাদের বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে রাজ্যের শাসক দল।
বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার জন্যই এই পদক্ষেপ। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাথায় বসিয়েই কলেজগুলিকে রাজনীতিমুক্ত করা যাবে। রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁরাই জানবেন কলেজে কী ভাবে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়। বিজেপির এই নীতি মানতে গেলে তো এলাকার কুখ্যাত খুনি, আসামিদেরই থানার দারোগা, পুলিশ অফিসার করা উচিত। কারণ চুরি, ডাকাতি ও খুনের অভিজ্ঞতা থেকে তারাই ভালো জানবে, কী ভাবে ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেকে বলছেন, বিজেপির এই সিদ্ধান্ত বেড়ালকে মাছ পাহারার দায়িত্ব দেওয়ার শামিল।
তবে দলীয় নেতানেত্রীদের কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি করে বিজেপি নেতৃত্ব খুব একটা স্বস্তিতে নেই। সেই কারণেই দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রীতিমতো মিটিং করে সতর্ক করেছেন। তাঁর পরামর্শ, ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করা যাবে না। নিয়ম মেনে অর্থ ব্যয় করতে হবে। আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তার দায় নিতে হবে। ছাত্র ভরতি নিয়ে যাতে কোনো অনিয়ম না হয় সেব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেছেন। তাঁর কথা দলের সবাই শুনছেন, কিন্তু মানছেন ক’জন?
শমীকবাবু প্রথম থেকেই ডিম ছোড়ার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছেন। এমনকি, ডিমের অভিমুখ ঘুরে যেতে পারে বলেও দলীয় নেতা কর্মীদের সাবধান করেছেন। তারপরেও ডিম থেরাপি বন্ধ হয়নি। শমীকবাবু তোলাবাজি নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। তোলাবাজি বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, তৃণমূলকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। এই দাবি খোদ বিজেপি বিধায়কের। তোলাবাজি ইস্যুতে প্রায় প্রতিটি জায়গায় বিজেপির একাধিক গ্রুপ। একে অন্যের দিকে আঙুল তুলছে। এবার শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের দরজা হাট করে খুলে দিয়ে ‘গৃহস্থ’কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিজেপি ক্ষমতায় বসার কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হল হকার উচ্ছেদ অভিযান। দিকে দিকে নামানো হল বুলডোজার। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল বেআইনি দোকানঘর। ফাঁকা করা হল ব্যস্ত রাস্তা, ফুটপাত, স্টেশন চত্বর। উদ্দেশ্য, যানজট থেকে শহরকে মুক্ত করা। কিছুদিন ফাঁকা থাকার পর আবার সেই সব জায়গা ভরতে শুরু করেছে। গজিয়ে উঠছে অস্থায়ী দোকান। তাতে মানুষ সরকারি অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছে। অনেকে জানতে চাইছেন, জমি ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নাকি পছন্দের লোকজনকে সেখানে বসানোই ছিল অভিযানের আসল উদ্দেশ্য!
রাজ্যে দু’টি আসনে উপনির্বাচন হতে চলেছে। প্রায় গুরুত্বহীন এই উপনির্বাচন নিয়ে বিজেপি যা করছে তাতে রাজনীতির হাওয়া কিঞ্চিৎ গরম। নন্দীগ্রামে মমতা তৃণমূলের প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তা নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি কটাক্ষ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘটনায় তিনি যে খুশি নন, সেটা স্পষ্ট করেছেন। তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, এসব কি রাজ্য সভাপতিকে অন্ধকারে রেখেই হচ্ছে? নাকি ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ নীতি নিয়েছেন শমীকবাবু?
উপনির্বাচনের প্রতীক বিলি নিয়েও জলঘোলা কম হয়নি। এতদিন ‘খাম’ ছিল আইএসএফ এর নির্বাচনি প্রতীক। তারা এবার নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিয়েছে। সাধারণভাবে এই প্রতীক এবার তাদেরই পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘খাম’ প্রতীক পেল ‘ভালো তৃণমূল’ অর্থাৎ গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস। অনেকে বলছেন, ‘ভালো তৃণমূল’কে খাম প্রতীক দেওয়ার পিছনে আছে অভিসন্ধি। আইএসএফের সৌজন্যে ‘খাম’ প্রতীকটি সংখ্যালঘুদের অত্যন্ত পরিচিত। সেই সুবাদে অক্ষরজ্ঞানহীন সংখ্যালঘুদের কিছু ভোট ‘ভালো তৃণমূল’ পেতে পারে। ঋত তৃণমূলের ভোট বাড়লে চাপে পড়বে মমতা তৃণমূল। বিজেপির সেটাই লাভ। অভিযোগ, সেই উদ্দেশ্যেই বিজেপি অনুগত জ্ঞানেশ কুমার উপনির্বাচনের মুখে তৃণমূলের ঘাসফুল প্রতীক ফ্রিজ করেছেন। একই সঙ্গে অন্য দলের প্রতীকও বদলে দিয়েছেন।
উপনির্বাচনে দু’টি আসনে বিজেপি জয়ী হলেও এ রাজ্যে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের কোনো পরিবর্তন হবে না। তা সত্ত্বেও বিজেপি দু’টি আসনই জিততে কেন এত মরিয়া? অনেকে বলছেন, বিজেপি বোঝাতে চাইছে, নতুন রাজ্য সরকারের কাজে হিন্দুরা তো বটেই সংখ্যালঘুরাও খুশি। সেই কারণেই ৭২শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগরেও তারা জিতেছে। সংখ্যালঘুরাও তাদের ভোট দিচ্ছে, এই ন্যারেটিভটা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। তবে মাত্র চার মাসের মধ্যে এই ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাওয়াটা একটু বেশিই তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
তাড়াহুড়ো করলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। সেটা জ্ঞানেশ কুমার এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। নির্বাচনের মুখে বাংলায় এসআইআর হয়েছে। দু’বছরের কাজ করেছেন মাত্র আড়াই মাসে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য। কিন্তু, রাজনৈতিক প্রভুদের খুশি করতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন। শোনেননি তাঁর দুই সহকারীর আপত্তি। ভেবেছিলেন, ‘রক্ষাকবচ’ এর জোরে উতরে যাবেন। কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। কিন্ত কথায় আছে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এসআইআর করে তিনি লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের চোখের জল ফেলিয়েছেন। সেই চোখের জলের হিসাব তাঁকে চোকাতেই হবে।
নিটের প্রশ্ন কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে স্রেফ আন্দোলন করে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করিয়ে দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। এবার ভোটার লিস্ট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে রাস্তায় নামছে সেই ‘আরশোলার দল’। যে জ্ঞানেশ কুমার লক্ষ লক্ষ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন, এবার তাঁর নিদ্রাহীন নিশিযাপনের পালা। টাইম স্টার্টস নাউ।