Bartaman Logo
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বড়ো-মানুষ

‘বড়ো-মানুষ’ শব্দটি আজকাল আর বিশেষ ব্যবহৃত হয় না। সম্ভবত বাঙালি সমাজ যতই খর্বকায় মানুষে ভরেছে ততই ‘বড়ো-মানুষ’ শব্দটির ব্যবহার কমেছে।

বড়ো-মানুষ
  • ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘বড়ো-মানুষ’ শব্দটি আজকাল আর বিশেষ ব্যবহৃত হয় না। সম্ভবত বাঙালি সমাজ যতই খর্বকায় মানুষে ভরেছে ততই ‘বড়ো-মানুষ’ শব্দটির ব্যবহার কমেছে। এখন সকলেই ‘সম্মাননীয়’। তাঁরা লাখ লাখ টাকার সুট, বুট, কোট পরেন। দামি দামি গাড়িতে চলাফেরা করেন। সামান্য দানধ্যান করলেই ঢাক পিটিয়ে তা প্রচার করতে থাকেন। আমরাও এদেরই অনুসরণ করি, অনুকরণ করি এবং এদেরই মাথায় তুলে রাখি। আজ সেই বড়ো মানুষটির জন্মদিন, যিনি একদা বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন ‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিঙ্কিং’-এর মাহাত্ম্য। তিনি করুণাসাগর বিদ্যাসাগর। নিজে অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কিন্তু অন্যের উপকার করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর নিজের ঘটিবাটিটিও বিক্রি করে দিতে পিছপা হতেন না। তা করতে গিয়ে তিনি জীবনে বহুবার ঠকেছেন, কিন্তু নিজের স্বভাব বদলাননি। তিনি বলতেন, লোকের উপকার করতে গেলে ওরকম দু’-একবার ঠকতে হয়। সরকারি চাকরি করে এবং বই লিখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জীবনে বহু অর্থ রোজগার করেছেন। তার বেশিরভাগটাই তিনি খরচ করেছিলেন অন্যের উপকার করতে গিয়ে। পরোপকার করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর অন্যের কাছে হাত পাততেও পিছপা হননি। প্যারীচরণ সরকার ছিলেন বিদ্যাসাগরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একবার প্যারীচরণের হরিতকী বাগানের বাড়িতে এসে বিদ্যাসাগর তিন হাজার টাকা চেয়ে বসলেন। হঠাৎ ৩০০০ টাকা কী কাজে লাগবে জিজ্ঞেস করাতে বিদ্যাসাগর বললেন, একটি লোককে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তার জামিনদার হয়েছিলেন। কিন্তু লোকটি কোম্পানির ৩০০০ টাকা 

Advertisement

নিয়ে পালিয়েছে। সেই টাকা বিদ্যাসাগরকেই এখন দিতে হবে। কিন্তু এ সময় অত টাকা বিদ্যাসাগরের নিজের কাছে ছিল না। তাই বন্ধুর বাড়িতে আসা। প্যারীচরণ তার নায়েব মশাইকে ডেকে বললেন, তহবিলে কত টাকা আছে তা দেখতে। নায়েব মশাই দেখে বললেন, ২০০০ টাকা আছে। তখন বাকি হাজার টাকা প্যারীচরণ তাঁর মায়ের কাছ থেকে চেয়ে বিদ্যাসাগরকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। পরে নায়েব প্যারীচরণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই টাকাটা কোন খাতে খরচা দেখাবেন। জবাবে প্যারীচরণ বিন্দুমাত্র না ভেবে বললেন, ওই টাকা তাঁর নামে বাজে খরচের খাতায় লিখে রাখতে। 
বিদ্যাসাগর অন্যের জন্য হাজার হাজার টাকা খরচা করতে পিছপা হতেন না। কিন্তু তাঁর নিজের জন্য খরচ ছিল খুবই সামান্য। একটি ঘটনার কথা বললে ভালো বোঝানো যাবে যে বিদ্যাসাগর নিজের পরিধেয়র জন্য কতটা কম খরচা করতেন। একবার হুগলি জেলার কোনো একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলে বিদ্যাসাগরের যাওয়ার কথা। তো সেখানে সকাল থেকেই গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছে বিদ্যাসাগরকে দেখার জন্য। এদিকে সময় পেরিয়ে যায় কিন্তু বিদ্যাসাগরের আর দেখা মেলে না। সূর্য মাথার ওপর উঠে গেল, লোকেরা দরদর করে ঘামছে, কিন্তু বিদ্যাসাগরকে দেখার আশা ত্যাগ করে কেউ ফিরে যাচ্ছে না। এমন সময় হঠাৎ শোনা গেল, ওই বিদ্যাসাগর আসছেন! এক বৃদ্ধা ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁগা, কোথায় তোমাদের বিদ্যাসাগর? জবাবে এক ভদ্রলোক বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে বললেন, এই তো ইনি বিদ্যাসাগর। বৃদ্ধা অবাক বিস্ময়ে খানিকক্ষণ বিদ্যাসাগরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন, হা আমার পোড়া কপাল। এই মোটা চাদর গায়ে উড়ে বেয়ারা দেখবার জন্য এতক্ষণ ধরে রোদে ভাজা ভাজা হলাম! না আছে গাড়ি, না আছে ঘোড়া, না আছে চোগা চাপকান! বিদ্যাসাগর এই পোশাকেই সারা জীবন কাটিয়েছেন। 
কবি নবীনচন্দ্র সেন বিদ্যাসাগরকে তাঁর প্রথম দেখার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ও হরি এই কি খ্যাতনামা বিদ্যাসাগর! এই খর্বাকৃতি, চক্রাকারে মুণ্ডিত মস্তক, নিমজ্জিত তীক্ষ্ণ নেত্র, দৃঢ় প্রতিজ্ঞাব্যাঞ্জক অধরভঙ্গি, গগনোপম উচ্চ প্রশস্ত ললাট, প্রশস্ত উড়স, বলিষ্ঠ শরীর, কৃষ্ণবর্ণ দরিদ্র ব্রাহ্মণ কি সেই বিদ্যাসাগর? চরণে চটি, পরিধানে সামান্য ধুতি, গলায় বিশদ অমল ধবল মুক্তাহার সন্নিভ যজ্ঞোপবিত, হাতে ক্ষুদ্র রজতনল সংযুক্ত একটি সামান্য হুঁকা, মুখে হাসি, মূর্তিতে শান্তি, হৃদয়ে অমৃতরাশি, আমাদের ন্যায় বালকের সঙ্গে পর্যন্ত সমানভাবে অতি পরিচিত আত্মীয়ের মতো স্নেহে আলাপ করিতেছেন, এই কি সেই বিদ্যাসাগর!’ স্বাভাবিক বিদ্যাসাগরের মতো অমন বিদ্বান মানুষের এমন সাধারণ জীবন যাপন, অত্যন্ত মার্জিত ও ভদ্র বব্যহার সবাইকে অবাক করত।
বিদ্যাসাগর অনেক দিনই শুধু নুন দিয়ে ভাত খেতেন। তার কারণ এই নয় যে, তাঁর অর্থ ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁকে নুন দিয়ে ভাত খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, বাল্যকালে বহুদিন নুন দিয়ে ভাত মেখে খেয়েছি। সে অভ্যাস এখনও আছে কি না দেখে নেওয়াটা জরুরি। মানুষের দশ দশা, আবার যদি আমার আগের দশা হয়, তবে অভ্যাস রাখলে শুধু ভাত খেতে কষ্ট হবে না। 
বিদ্যাসাগর নিজের জন্য খরচ অত্যন্ত অল্প করলেও তাঁর দান ধানের হাত ছিল লম্বা। একবার বিদ্যাসাগর তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে হেদুয়ার কাছে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, একজন ব্রাহ্মণ গঙ্গাস্নান সেরে কাঁদতে কাঁদতে ফিরছেন। বিদ্যাসাগর সেই ব্রাহ্মণকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? বিদ্যাসাগরের গায়ে মোটা চাদর, পায়ে চটি আর চেহারা দেখে ব্রাহ্মণ কোনো জবাব দিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন, একে বলে আর কী হবে! কিন্তু বিদ্যাসাগরও ছাড়ার লোক নন। 
তাঁর বারবার প্রশ্নে অবশেষে সেই ব্রাহ্মণ জানালেন, আমি একজনের থেকে টাকা ধার নিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেই টাকা শোধ করার মতো উপায় নেই। এদিকে পাওনাদার আদালতে আমার নামে নালিশ করেছে। বিদ্যাসাগর জিজ্ঞেস করলেন, মোকদ্দমা কবে? ব্রাহ্মণ জানালেন, পরশু। বিদ্যাসাগর মোকদ্দমার নম্বর, ব্রাহ্মণের নাম ঠিকানা, সবই কথায় কথায় জেনে নিলেন। ব্রাহ্মণ চলে যাওয়ার পর বিদ্যাসাগর সঙ্গের বন্ধুটিকে মামলার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে বলে দিলেন। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, সুদে আসলে ব্রাহ্মণের দেনা প্রায় আড়াই হাজার টাকা। সেই টাকা বিদ্যাসাগর নিজের গ্যাঁট থেকে আদালতে জমা দিলেন। আর আদালতের উকিল আমলাদের বলে দিলেন, তাঁর নাম যেন ওই ব্রাহ্মণ জানতে না পারেন। 
বিদ্যাসাগর কখনোই ধর্ম, বর্ণ বা জাতি দেখে পরোপকার করার কথা ভাবেননি। বর্ধমানে একবার ম্যালেরিয়ার ধুম পড়েছিল। সে সময় বিদ্যাসাগর নিজের খরচে ডাক্তার নিয়ে গিয়ে মানুষের শুশ্রূষা করেছেন। ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে একইসঙ্গে হাড়ি, শুড়ি, জেলে, মালো, মুসলিম, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলকে চিকিৎসা করেছেন। এমনকি এও দেখা গিয়েছে যে, বিদ্যাসাগর গাড়িতে বসে আছেন আর একটি মুসলমান বালক তাঁর কোলে খেলা করছে। 
রাজনীতি নিয়ে বিদ্যাসাগরের মনোভাব ছিল সম্পূর্ণ আপসহীন, তাঁর চরিত্রের মতোই। কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনের পর একদল প্রতিনিধি যখন বিদ্যাসাগরকে কংগ্রেসে যোগদানের অনুরোধ করেন, তখন তিনি সপাটে বলেছিলেন, তোমরা প্রয়োজনে তলোয়ার ধরতে পারবে তো? বিদ্যাসাগরের এই প্রশ্নের জন্য তাঁরা কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। স্বভাবতই তাঁরা মাথা নীচু করে চুপ করেছিলেন। তখন বিদ্যাসাগর তাঁদের বলেন, আমাকে বাদ দিয়েই তোমরা এই কাজে এগোও।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে শিবনাথ শাস্ত্রী বলেছিলেন, ‘তাঁহার মনুষ্যত্বের প্রভাব এত অধিক ছিল যে, তিনি সেই প্রভাবে স্বদেশ ও স্বজাতির অনেক উপরে উঠিয়াছিলেন। যেমন ক্ষুদ্রকায় বনজ গুল্ম সকলের মধ্যে দীর্ঘ দেহ শালবৃক্ষ দণ্ডায়মান থাকে, তেমনি সেই পুরুষ-সিংহ নিজ মহৎ মনুষ্যত্বে স্বসমকালীন জনগণকে বহু নিম্নে ফেলিয়া ঊর্ধ্ব-শিরা হইয়া দণ্ডায়মান ছিলেন।’ বস্তুতই বিদ্যাসাগরের কাছে বাকি সবাই তৃণসম।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ