Bartaman Logo
১৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তবে কি বন্ধ হবে অস্ট্রেলিয়ার দুয়ারও?

শুধু আমেরিকা নয়, বদলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়াও! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে সিডনির নীতিনির্ধারকরাও।

তবে কি বন্ধ হবে অস্ট্রেলিয়ার দুয়ারও?
  • ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: শুধু আমেরিকা নয়, বদলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়াও! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে সিডনির নীতিনির্ধারকরাও।

Advertisement

আসলে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থী দল ‘ওয়ান নেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা পলিন হ্যানসনের হঠাৎ উত্থান সকলকে চমকে দিয়েছে। ৩০ বছর আগে সংসদে প্রথম ভাষণেই এশীয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করে তিনি আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন তাঁর দল ছিল প্রান্তিক শক্তি। কিন্তু হঠাৎ ‘ওয়ান নেশন’ জনমত সমীক্ষায় দেশের প্রধান দলগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে এই দল মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে পরিচালিত ডেমোসএইউ সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, তাঁদের সমর্থন বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ২৬ শতাংশকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিরোধী জোট কোয়ালিশনকে পিছনে ফেলে দিয়েছে বহু আগেই। আরও চমকপ্রদ তথ্য, অভিবাসন প্রশ্নে ভোটাররা এখন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ ও বিরোধী নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর— এই দু’জনের থেকে হ্যানসনকেই বেশি বিশ্বাস করেন। সমীক্ষার গড় হিসাবে গত নির্বাচনের পর লেবারের প্রাথমিক ভোট সাড়ে ৩৪ শতাংশ থেকে প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে, কোয়ালিশনের কমেছে ১০ শতাংশ। এই ভোট গিয়েছে কোথায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
হ্যানসনের উত্থানের জ্বালানি জোগাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া আর জীবনযাত্রার ব্যয়। করোনা মহামারির পর রেকর্ডসংখ্যক মানুষ এ দেশের ক্ষুব্ধ ভোটারদের একটি বড়ো অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, দুর্মূল্য বাড়ি আর স্থবির মজুরির জন্য দায়ী এই অভিবাসনের জোয়ার। হ্যানসন সেই ক্ষোভে হাওয়া দিচ্ছেন। প্রতিদিন!
ইতিমধ্যে ভারতীয় পড়ুয়াদের ভিসা প্রদানে আরও কড়াকড়ি করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে যেতে চাইলে সহজে মিলবে না ভিসা! তবে সব দেশের জন্য নয়। ভারত ছাড়াও, দক্ষিণ এশিয়ার আরও তিন দেশ— নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশকে একই বন্ধনীতে রেখেছে অস্ট্রেলিয়া। গত ৮ জানুয়ারি থেকে নয়া বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। পড়ুয়াদের ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি নির্দিষ্ট স্তর রয়েছে, যাকে ‘এভিডেন্স লেভেল’ বলা হয়। অর্থাৎ, আবেদনকারীকে ভিসার জন্য কী কী প্রমাণপত্র বা নথি দিতে হবে, তা নির্ধারিত হয় এই স্তরের ভিত্তিতে। ভারত আগে দ্বিতীয় স্তরে ছিল। তবে নয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভারতকে তৃতীয় স্তরে আনা হয়েছে। যার অর্থ, আবেদনকারীকে তাঁর আবেদনপত্রের সঙ্গে আরও নথি দিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে সে দেশে ভারতীয় বংশোদ্ভূতের সংখ্যা ৮ লক্ষ ৪৫ হাজার ৮০০ জন, যা আগের দশকের দ্বিগুণ। এ ছাড়া, আরও হাজার হাজার মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো না কোনো ভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই ভারতীয়দের অভিবাসনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলীয়দের একাংশকে খেপিয়ে তুলছেন পলিন হ্যানসনের ‘ওয়ান নেশন’, অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার-রাইট লিবারাল পার্টির সেনেটর জেসিন্টা নামপিজিনপা প্রাইসের মতো নেতারা। গত বছর একটি রেডিয়ো চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে জেসিন্টা নামপিজিনপা বলেছিলেন, প্রচুর সংখ্যক ভারতীয়কে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ এবং থাকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ এবং তাঁর দলের সুবিধা হচ্ছে। কারণ, দেশের ভারতীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায় ওই দলকেই ভোট দিয়ে থাকে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের সমস্যা হচ্ছে। জীবনযাপনের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। চাকরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ। কিন্তু সরকারের ‘উদার’ অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক মিছিল ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির কপালে ভাঁজ ফেলেছে। সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানেবেরার মতো বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো শহরে প্রতিবাদ মিছিলের মূল নিশানায় এখন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় অভিবাসীরা। মিছিলে যে সব লিফলেট বিলি হয়েছিল, তার একটিতে লেখা ছিল, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে গ্রিক বা ইতালিয়ানদের ছাপিয়ে যাবেন ভারতীয়রা’। আর সেই প্রতিবাদের পথ হয়ে উঠেছে ‘ওয়ান নেশন’-এর ভোটবাক্স।
এখানে একটি বৃহত্তর সত্য লুকিয়ে আছে, যা শুধু অস্ট্রেলিয়ার নয়, গোটা পশ্চিমি বিশ্বের রাজনীতির ছবি। যখন মানুষ মনে করে প্রতিষ্ঠিত দলগুলি তাদের কথা শুনছে না, তখন তারা প্রতিবাদ হিসেবে এমন দলকে ভোট দেয়, যারা সরল ভাষায় ক্ষোভের কথা বলে। এই প্রবণতা আমেরিকায় ট্রাম্পের উত্থানে দেখা গিয়েছে, ইউরোপে দেশে দেশে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দলগুলির উত্থানেও দেখা গিয়েছে। জনগণের মৌলিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার সংকট দূর করতে না পারলে রাজনীতির চাবিকাঠি যেকোনো সময় চরমপন্থীদের হাতে চলে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়া এখন সেই ধৈর্যের পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।
ভাবুন একবার, যে ভাষণটি দেওয়াই হয়নি, সেটিই এখন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বিষয়। ক্যানবেরার জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের ঘোষণা করার কথা ছিল দেশের অভিবাসনব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা। শেষ মুহূর্তে ভাষণ স্থগিত করা হয়। সরকারের ব্যাখ্যা, প্রস্তাবিত নীতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব হিসাব করতে আরও সময় প্রয়োজন। ব্যাখ্যাটি যত সরল, ভিতরের গল্প তত জটিল।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নীতিগুলি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। মন্ত্রীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ডান-বাম দুই দিকের সমালোচনার মুখে এই কড়াকড়ির যুক্তি জনগণের সামনে কীভাবে দাঁড় করানো হবে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন লেবার সরকার নিজেই জানে না, সে ঠিক কী চায়। আর এই দ্বিধার পিছনে রয়েছেন পলিন হ্যানসনের অভিবাসন বিরোধী রাজনীতি।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবের ভাষণে হ্যানসন খোলাখুলি ‘এক সংস্কৃতির অস্ট্রেলিয়া’র পক্ষে সওয়াল করেছেন। দম্ভ করে বলছেন, তিনি নাকি ক্ষমতায় এলে কুকুর-হাঁটানো, নখ পরিচর্যা আর ভাড়ায় গাড়ি চালানোর কাজে আসা অভিবাসীদের ঢোকাই বন্ধ করে দেবেন। এই বাগাড়ম্বরের মূল্য দিচ্ছে সমাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী মন্তব্যের স্রোত বইছে। যার প্রধান শিকার ভারতীয় উপমহাদেশের অস্ট্রেলীয়রা।
এই চাপের মুখেই সরকারকে নতুন কঠোর নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করতে হচ্ছে। মূল লক্ষ্য, নিট অভিবাসন সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। যেখানে স্থায়ী অভিবাসনের বার্ষিক কোটা নির্ধারিত থাকছে ১ লাখ ৮৫ হাজারে। প্রস্তাবগুলির মধ্যে এমন কিছু কথা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন— পর্যটক ভিসায় এসে দেশের ভিতরে থেকে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া বা পারিবারিক ভিসার আবেদন বন্ধ করা, ভ্রমণ-কর্ম ভিসায় আসা তরুণদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আপিলের অধিকার সংকুচিত করা।
কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই ঘোষণা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। পয়লা জুলাই থেকে ভিসা আবেদনের 
ফি এক ধাক্কায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। ২৪ জুলাই মন্ত্রী নীরবে একটি নির্দেশ জারি করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, দক্ষ কর্মীদের ভিসা প্রক্রিয়ায় দেশের অভ্যন্তরে আবেদনকারী ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে আবেদনকারীরা তালিকার শেষ প্রান্তে থাকবেন। সংসদে এই নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি, জনসমক্ষে কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু অফিসের ওয়েবসাইটে একটি নিঃশব্দ বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে গিয়েছে।
লেবার পার্টির দ্বিধা বোঝা কঠিন নয়। ডান দিকে ঝুঁকলে হারাতে হবে নিজের ভিত্তি। হারাতে হবে সেই ভোটারদের সমর্থন যাঁরা পলিন হ্যানসনের ‘এক সংস্কৃতি’র বক্তব্যে বিরক্ত। অথচ না ঝুঁকলে হ্যানসনের পালে আরও হাওয়া লাগবে। লেবার পার্টির সামনে ব্রিটেনের সতর্কবার্তাও রয়েছে। অভিবাসন প্রশ্নে ব্যর্থতার কারণে ব্রিটিশ নেতা কিয়ার স্টারমারের পতন এখনও টাটকা। কিন্তু প্রশাসনিক ফাঁক বন্ধ করা এক বিষয় আর সমাজে বিভাজনের বিষ ছড়ানো আরেক বিষয়। প্রকৃত সমস্যা নিয়মের অভাব নয়, প্রয়োগের ব্যর্থতা। জমে থাকা আবেদনের পাহাড় আর সিদ্ধান্তহীনতা। সেই পাহাড় না সরিয়ে নতুন দেওয়াল তুললে জট কমবে না, কেবল দুর্ভোগের ঠিকানা বদলাবে।কোনো রাজনৈতিক দল এটা ভাবছে না, অভিবাসীদের শ্রম আর স্বপ্নের উপর ভর করেই আজকের অস্ট্রেলিয়া। ভয়ের রাজনীতিকে নীতি দিয়ে জবাব দেওয়া যায়, নকল করে নয়। পলিন হ্যানসনের রাজনীতির জবাবে যদি থাকে হ্যানসনেরই সুর, তবে ভোটার আসলটাকেই বেছে নেবেন। এই সহজ সত্য লেবার যত দ্রুত বুঝবে, ততই মঙ্গল। ভারসাম্য হারালে ক্ষতিটা শুধু অভিবাসীর হবে না, হবে গোটা অস্ট্রেলিয়ারও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ